লন্ডনে অক্সফোর্ড ইউনিয়নের অনুষ্ঠান ও হাসনাত আব্দুল্লাহকে ঘিরে কী হয়েছে?

ছবির উৎস, Nurun Nabi
জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ লন্ডন সফরে যাওয়ার পর তাকে ঘিরে বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ওই সফরে অক্সফোর্ড ইউনিয়নের এক অনুষ্ঠানে তার সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, সাবেক গুম কমিশন সদস্য নাবিলা ইদ্রিস এবং বিএনপির সঙ্গে যুক্ত যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আলিয়ার হোসেন যোগ দিয়েছিলেন।
অক্সফোর্ড ইউনিয়নের ওই অনুষ্ঠানের সময় অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে।একই সঙ্গে এই অনুষ্ঠানটি নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখা গেছে।
অক্সফোর্ড ইউনিয়ন ই-মেইলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছে, হাসনাত আব্দুল্লাহদের নিয়ে যেই অনুষ্ঠানটি হয়েছে সেটি অক্সফোর্ড বাংলা সোসাইটির সহযোগিতায় আয়োজিত হয়েছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বা সেখানকার কর্মী হিসেবে যারা নিবন্ধিত তারা এই সংগঠনের সদস্য হতে পারেন।
ওদিকে দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিতে লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল এলাকায় হাসনাত আব্দুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন এমন একটি জমায়েতকে ঘিরে সোমবার বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বিক্ষোভের সময় ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে এবং ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ কয়েকজনকে আটক করেছে।
তবে যুক্তরাজ্য এনসিপির সদস্য সচিব মো. এম এ হিমেল বলছেন, "হাসনাত আব্দুল্লাহকে ঘিরে লন্ডনে আওয়ামী লীগ সহিংসতার চেষ্টা করছে, কারণ আওয়ামী লীগের পতন ও নিষিদ্ধে তিনি ভূমিকা রেখেছেন। যুক্তরাজ্যে সহিংসতার জায়গা নেই। তাই তারা ব্যর্থ হয়েছে। হাসনাত আব্দুল্লাহর সব অনুষ্ঠান সফল হয়েছে"।
হাসনাত আব্দুল্লাহর লন্ডন সফর ও অক্সফোর্ড ইউনিয়নের অনুষ্ঠানে যোগদানের প্রতিবাদ করে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বিক্ষোভের একজন সংগঠক সুশান্ত দাস গুপ্ত বিবিসি বাংলাকে বলছেন, "হাসনাত যুক্তরাজ্যের যেখানেই যাবেন সেখানেই প্রতিবাদ হবে, কারণ বাংলাদেশে মবের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত তিনি"।

ছবির উৎস, Nurun Nabi
হাসনাতকে ঘিরে বিক্ষোভ
অক্সফোর্ড ইউনিয়ন গত ১৪ই জুন 'দ্য স্টুডেন্ট লেড আপরাইজিং অ্যান্ড দ্য ফিউচার অফ পোস্ট-রিভল্যিউশনারি বাংলাদেশ' শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
এই অনুষ্ঠানেই বক্তব্য রেখেছেন হাসনাত আব্দুল্লাহ, ডাকসুর ভিপি ও ইসলামী ছাত্রশিবির নেতা সাদিক কায়েম, যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আলিয়ার হোসেন ও বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত গুম কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস।
এই অনুষ্ঠানের ঘোষণার পর থেকেই যুক্তরাজ্যে আওয়ামী লীগের একদল সমর্থক সামাজিক মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করে এবং তারা ১৪ই জুন অনুষ্ঠান চলাকালে অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে প্রতিবাদের কর্মসূচি ঘোষণা করে।
"আমরা ৭১ জন নিয়ে সেখানে গিয়ে বিক্ষোভের কর্মসূচি দিয়েছিলাম এবং তাই করেছি," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন সুশান্ত দাশ গুপ্ত।
তবে অনুষ্ঠানে অন্যতম বক্তা হিসেবে যোগ দেওয়া নাবিলা ইদ্রিস বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে একদল প্রটেস্ট করেছে। কিন্তু অনুষ্ঠানস্থলে তার কোনো প্রভাব ছিল না। শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই অক্সফোর্ড ইউনিয়নের ওই অনুষ্ঠানে কথা বলেছি আমরা"।
ওই অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে বিক্ষোভকারীদের অবস্থান ও কর্মসূচি ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে। বিক্ষোভকারীরা হাসনাত আব্দুল্লাহকে উদ্দেশ্য করে নানা বক্তব্য ও শ্লোগান দিয়েছেন সেখানে।
এরপর গত ১৫ই জুন সোমবার হোয়াইটচ্যাপেল এলাকার একটি রেস্তোরায় হাসনাত আব্দুল্লাহর উপস্থিতি ঘিরে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি ঘটনায় ডিম নিক্ষেপ ও কয়েকজনকে আটকের ঘটনা ঘটে।
এই ঘটনার ভিডিওতে লন্ডন পুলিশকে কয়েকজনকে আটক করতে দেখা গেছে।
এর আগে শনিবার হাসনাত আব্দুল্লাহ লন্ডনে বিমানবন্দরে নামার পর যারা তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন তার মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নুরুন্নবী।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেছেন, "অক্সফোর্ডের অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে রাস্তায় এনসিপি এবং জামায়াত শিবিরের অনেকেই ছিলেন। সেই তুলনায় বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা ছিল কম। তবে সোমবার হোয়াইটচ্যাপেলে হাসনাত তার দলীয় কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন; সেখানে আওয়ামী লীগের লোকজন গিয়েছিল, ডিম মারামারি করেছে। তবে হাসনাত আসার আগেই পুলিশ তাদের সরিয়ে দিয়েছে"।
সুশান্ত দাশ গুপ্ত বলছেন, "এখানে জামায়াত বা শিবিরের সাদিক কায়েমসহ আরও কয়েকজন এসেছেন। তাদের বিষয়ে তো আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। তারা তাদের রাজনীতি করছেন"।
এনসিপির যুক্তরাজ্য শাখার সদস্য সচিব এম এ হিমেল বলছেন, "হোয়াইট চ্যাপেলে আমরা হাসনাত আব্দুল্লাহকে গণসংবর্ধনা দিয়েছি। সেখানে আওয়ামী লীগের তিন গ্রুপ এক হয়ে আমাদের ওপর ভ্যান্ডালিজম করার চেষ্টা করেছে। কয়েকজন আটক হয়েছে। তারা যুক্তরাজ্যের আইন ভঙ্গ করেছে। সহিংসতার সুযোগ সেখানে নেই। আমাদের কর্মসূচি সফল হয়েছে"।

ছবির উৎস, instagram/Oxford Union
অক্সফোর্ড ইউনিয়ন কী বলছে
ওদিকে হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সাদিক কায়েম অক্সফোর্ড ইউনিয়নের আমন্ত্রণে লন্ডনে যাচ্ছেন এমন খবরে আগে থেকেই সামাজিক মাধ্যমে পাল্টাপাল্টি প্রচার প্রচারণা চলছিল।
এরপর একপক্ষ এটিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠান, আর অন্য পক্ষ এর সাথে অক্সফোর্ডের কোনো সম্পর্ক নেই- এমন সব প্রচার শুরু করে। ফলে বিতর্ক শুরু হয় অক্সফোর্ড ইউনিয়ন নিয়েও।
যদিও অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত থাকা নাবিলা ইদ্রিস বিবিসি বাংলাকে বলেছেন যে, তাদের অক্সফোর্ড ইউনিয়ন থেকেই আমন্ত্রণ করা হয়েছিলো।
"অক্সফোর্ড ইউনিয়নের আমন্ত্রণেই আমরা এসেছি," বলেছেন তিনি।
অনুষ্ঠানটি নিয়ে বিবিসি বাংলার প্রশ্নের জবাবে অক্সফোর্ড ইউনিয়ন নিজেই জানিয়েছে, "অক্সফোর্ড ইউনিয়ন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সংযুক্ত নয়। তবে অক্সফোর্ড ইউনিয়নের সদস্য হতে হলে কোনো না কোনো সময়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বা কর্মী হিসেবে নিবন্ধিত থাকতে হয়। এই অনুষ্ঠানটির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না; এটি শিক্ষার্থীদের দ্বারাই আয়োজিত হয়েছিল"।
অক্সফোর্ড ইউনিয়নের ডিরেক্টর অফ প্রেস তার ই-মেইলে জানান, "১৪ই জুনের অনুষ্ঠানটি অক্সফোর্ড বাংলা সোসাইটির সহযোগিতায় আয়োজিত হয়, যা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙালি শিক্ষার্থীদের একটি সংগঠন"।
অক্সফোর্ড বাংলা সোসাইটির সাবেক সভাপতি আহমেদ মুহতাদি অক্সফোর্ড ইউনিয়নের সদস্য। তিনি ওই অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
"যখন আমার এক বন্ধু প্রথম আমাকে জানায় যে অক্সফোর্ড ইউনিয়ন জুলাই বিপ্লব নিয়ে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করতে আগ্রহী এবং আন্দোলনের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে আমন্ত্রণ জানাতে চায়, তখন আমি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী খুবই উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম। একই সঙ্গে আমরা আনন্দিত হয়েছিলাম যে সাধারণ শিক্ষার্থীসমাজও এই বিষয়টির প্রতি ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. মুহতাদি।
"তাই আমি উদ্যোগ নিয়ে অনুষ্ঠানটিকে অক্সফোর্ড বাংলা সোসাইটির সহযোগিতায় আয়োজনের ব্যবস্থা করি, যাতে এর সদস্যরা- অর্থাৎ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বা কর্মরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থী ও শিক্ষাবিদরা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন এবং জুলাই বিপ্লব ও তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পান।"
যদিও এই অনুষ্ঠানটিকে একপক্ষীয় দাবি করে আগেই অক্সফোর্ড ইউনিয়নের সাথে কথা বলে আলোচনায় তাদেরও অংশ নেওয়ার সুযোগ দাবি করেছিলেন বলে জানিয়েছেন নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ কমিটির একজন সদস্য সুশান্ত দাশ গুপ্ত।
"আমরা তাদের বৈঠকও করেছিলাম। আমরা বলেছিলাম তোমরা রিভিউ করো কিংবা আমাদের অন্তর্ভুক্ত করো যাতে সবাই কথা বলার সুযোগ পায়। তারপরেও তারা একপক্ষীয় অনুষ্ঠান করায় আমরা যুক্তরাজ্যের চ্যারিটি কমিশনে আপত্তি জানিয়ে আবেদন করেছি। ২৮ দিনের মধ্যে তাদের এটি নিষ্পত্তি করার কথা রয়েছে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মি. গুপ্ত।
অক্সফোর্ড ইউনিয়ন অবশ্য বিবিসি বাংলাকে ই-মেইলে জানিয়েছে, "মূল উদ্দেশ্য ছিল ২০২৪ সালের বিপ্লবকে বিশ্লেষণধর্মী ও ভবিষ্যতমুখী দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করা। এ লক্ষ্যে, রাজপথে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ছাত্রনেতাদের পাশাপাশি বর্তমান শাসক দলের নীতি প্রণয়ন এবং পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডে অবদান রাখা খ্যাতিমান শিক্ষাবিদদের একত্রিত করা হয়। এর মাধ্যমে আলোচনায় যেমন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তেমনি কঠোর বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণও স্থান পেয়েছে"।








