এনসিপিআই নামের কোন অজানা দলে যোগ দিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের 'বিদ্রোহীরা'?

    • Author, প্রচেতা পাঁজা
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

পশ্চিমবঙ্গের সদ্য পরাজিত তৃণমূল কংগ্রেসের হেভিওয়েট 'বিদ্রোহী' সংসদ সদস্যরা এমন একটি দলে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, যে দলটির অস্তিত্বই কেউ জানত না।

এনসিপিআই নামের ওই দলটি যে ভারতের নির্বাচন কমিশনের নথিভুক্ত একটি দল, সেটাও অজানা ছিল। তবে এখন ওই দলটিরই পশ্চিমবঙ্গের সবথেকে বেশি সংসদ সদস্য রয়েছেন বলে খাতায় কলমে দাবি করা হয়েছে দলটির ফেসবুক পেজে।

রোববার তৃণমূল কংগ্রেসের 'বিদ্রোহী' সংসদ সদস্যরা ওই অজানা দলটিতে যোগ দেওয়ার পরেই এনসিপিআই দলটির ফেসবুক পেজ বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

যদিও দলটির নথিভুক্ত সভাপতি বলে যার নাম আছে, সেই শিউলি কুন্ডু নামে এক নারী নিজেই বিবিসি বাংলাকে বলেছেন যে, তিনি কিছুদিন আগে দল থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। সেই নারী এবং তার স্বামীর দল ছিল সেটি।

তার নামে নথিভুক্ত হওয়া দলে সদ্য যোগ দেওয়া 'হাই প্রোফাইল' তৃণমূল কংগ্রেসের 'বিদ্রোহী' সংসদ সদস্যদের কারো সঙ্গেই যে মিজ. কুন্ডুর কথা হয় নি, সেটাও তিনি জানিয়েছেন বিবিসিকে।

কলকাতা লাগোয়া হাওড়াতে দলটির প্রধান কার্যালয় বলে নির্বাচন কমিশনে নথিভুক্ত রয়েছে।

অজানা, অচেনা এরকম একটি দলে কেন যোগ দিলেন সুদীপ ব্যানার্জী, কাকলি ঘোষ দস্তিদার বা পার্থ ভৌমিকের মতো পরিচিত তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-নেত্রী বা চলচ্চিত্র জগতের খ্যাতনামা দেব বা শতাব্দী রায়েদের মতো তৃণমূল কংগ্রেস এমপিরা, তা স্পষ্ট নয়।

তবে মনে করা হচ্ছে, ভারতের দলত্যাগ বিরোধী আইন বাঁচিয়ে, তৃণমূল কংগ্রেসের থেকে পৃথক একটি ব্লক গড়তেই তাদের এরকম একটি অজানা দলে যোগদান।

কারা এই এনসিপিআই?

ফেসবুকে এই দলটির যে পেজ রয়েছে, তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি 'সমাজসেবামূলক দল' যার পুরনো বিবৃতিতে লেখা, "দল বদলানো রাজনৈতিক মুখ নয়, আপনি এগিয়ে আসুন জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা নির্বিশেষে"।

সাত রশ্মি দেওয়া কলমের নিব তাদের প্রতীক। দলটি প্রতিষ্ঠা হয় ত্রিপুরায়।

২০২৩ সালে এই দলটি নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃতি পায়। নির্বাচন কমিশনের নথি অনুযায়ী এই পার্টির সদর দফতর পশ্চিমবঙ্গে হাওড়ার সাঁকরাইলে।

সোমবার সকাল থেকেই এই দলের নথিভুক্ত ঠিকানা 'জাগো বিশ্ব, হোল্ডিং নম্বর ৪৭১৯, গ্রাম হাটগাছা, ডাকঘর বাণীপুর' এলাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনীকে টহল দিতেও দেখা যায়।

ত্রিপুরার তিনটি আসনে এই দলের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন ২০২৩ সালে সে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে।

কৈলাশহরে এনসিপিআই প্রার্থী জাহাঙ্গির আলি ভোট পেয়েছিলেন মাত্র ২৮৬টি। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তিনি একজন সমাজসেবী।

রাজনৈতিক ভাবে বিশেষ পরিচিত প্রার্থীও ছিলেন না তিনি।

ছামনু আসনে এই দলের প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট ছিল ৫৩৬টি।

আমবাসায় জামানত জব্দ হয় এনসিপিআই প্রার্থীর। এছাড়া কোনও নির্বাচনী সাফল্য আপাতত এই দলের নেই।

তৃণমূল ত্যাগ করে ২০ জন এমপি যোগ দেওয়ার পরেই নতুন করে সক্রিয় হয়েছে এনসিপিআই-এর সমাজমাধ্যমের পেজটি।

তারা দাবি করেছে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে লোকসভায় সর্বোচ্চ সংখ্যক সংসদ সদস্যের অধিকারী এই মূহুর্তে তাদের দল।

অপরিচিত দলে তৃণমূলের কোন কোন পরিচিত মুখ?

তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে জেতা মোট ২০জন সংসদ সদস্য অজানা এক দল এনসিপিআই তে যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন লোকসভার স্পিকারকে।

যারা ওই চিঠিতে সই করেছেন, তাদের মধ্যে আছেন মমতা ব্যানার্জীর প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক সহকর্মী ও বারাসাতের এমপি কাকলি ঘোষ দস্তিদার, ২০০৯ সাল থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে জিতে আসা চলচ্চিত্র নায়িকা এমপি শতাব্দী রায় এবং কখনো মমতা-বিরোধী, কখনো বা মমতা-পন্থী প্রবীন রাজনীতিবিদ ও উত্তর কলকাতা কেন্দ্রের বর্তমান সংসদ সদস্য সুদীপ ব্যানার্জী।

আবার বাংলা চলচ্চিত্র জগতের নায়ক দেব, যার আসল নাম দীপক অধিকারীও যেমন ওই ২০ জনের তালিকায় আছেন, তেমনই আছেন কলকাতা পৌর সংস্থার চেয়ারপার্সন, দক্ষিণ কলকাতার এমপি ও প্রবীন রাজনীতিবিদ মালা রায়, এবং বোলপুরের সংসদ সদস্য অসিত মাল ও পার্থ ভৌমিকদের মতো এমপিরাও।

কদিন আগে পর্যন্ত মমতা ব্যানার্জীর অতি বড়ো সমর্থক বলে নিজেরা যাদের জাহির করতেন, সেই অভিনেত্রী ও এমপি সায়নী ঘোষ, জুন মালিয়া ও রচনা ব্যানার্জীরা যেমন চিঠিতে সই করা সংসদ সদস্যদের তালিকায় আছেন, তেমনই আছেন মমতা ব্যানার্জীর 'ভাইপো' অভিষেক ব্যানার্জীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত মথুরাপুরের এমপি বাপি হালাদারও।

বর্তমান লোকসভার এই ২০ জন সদস্য তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়াতে (এনসিপিআই) যোগ দেওয়ার কথা জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে।

তৃণমূলের বিদ্রোহীরা কেন এনসিপিআই-তে?

এনডিএ-কে সরাসরি সর্মথনের কথা আগেই জানিয়েছিলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদারেররা। তবে 'বিজেপি তাদের দলে নেবে না' বলে তৃণমূলেরই আরেক সংসদ সদস্য কল্যাণ ব্যানার্জী কটাক্ষ করে প্রশ্ন তোলেন।

সত্যিই বিজেপি তাদের দলে নেয়নি। তবে ভাঙনের নেপথ্যে যে বিজেপি তা স্পষ্টই বোঝা গিয়েছিল ভূপেন্দ্র যাদবের মধ্যস্থতায় আয়োজিত বৈঠকে।

দিল্লিতে সে বৈঠকে যোগ দেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। এমনকি এনসিপিআই দলের সভাপতি উত্তীয় কুন্ডুর সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর ছবিও রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।

মি কুন্ডু নিজেই সেই ছবি পোস্ট করে নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে সম্প্রতি শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন।

তাই তৃণমূলের সংসদীয় দলে ভাঙন ও নতুন একটি ব্লক তৈরিতে যে বিজেপির হাত রয়েছে তা বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হওয়ার কথা নয় বলেই জানাচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

আসলে তারা অনেকেই মনে করছেন, আইনি জটিলতা এড়াতেই এনসিপিআই-কে সামনে রেখে 'খুঁটি' করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিদ্রোহী সংসদ সদস্যরা।

তাদের অন্যতম শতাব্দী রায় অবশ্য জানাচ্ছেন, "এই দল বেছে নেওয়ার নেপথ্যে কোনও আলাদা কারণ নেই। আইনগত বিষয় এটা। আমরা এনডিএ-র শরিক হবো বলেই নতুন দলে যোগ দিয়েছি। মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল। মানুষও খুশি।"

আরেকজন বিদ্রোহী সংসদ সদস্য অসিত মাল জানান, "মানুষের স্বার্থে, উন্নয়নের স্বার্থে আমরা আলাদা ব্লক তৈরি করেছি।"

তৃণমূলকে 'বাঁচাতে' সক্রিয় মমতা-অভিষেকও

বিধানসভায় দল আগেই ভেঙেছে। ঋতব্রত ব্যানার্জীর নেতৃত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ক তৃণমূল থেকে ছিন্ন হয়ে 'আসল তৃণমূল' হিসাবে নিজেদের দাবি করেছেন।

লোকসভাতেও যাতে সেই পথে না হাঁটতে পারেন কাকলি ঘোষ দোস্তিদার বা সুদীপ ব্যানার্জীরা, সেই জন্য রোববার দুপুরেই লোকসভা স্পিকার ওম বিড়লার কাছে চিঠি পাঠান তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জী।

তিন পাতার একটি চিঠিতে মি. ব্যানার্জী লেখেন, "তৃণমূল একটি অখণ্ড রাজনৈতিক দল। লোকসভায় যে সংসদীয় দল রয়েছে, সেটিও মূল রাজনৈতিক দলের উপরেই নির্ভরশীল এবং তা ওই রাজনৈতিক দলেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আইনত তৃণমূল একটিই।"

কোনও পৃথক গোষ্ঠীকে যাতে স্বীকৃতি না-দেওয়া হয়, স্পিকারকে সেই আর্জিও জানান তিনি।

সেই চিঠি স্পিকারের কাছে পৌঁছে দেন রাজ্যসভার সংসদ সদস্য এবং মমতা ব্যানার্জীর ঘনিষ্ঠ সাগরিকা ঘোষ এবং লোকসভার সংসদ সদস্য কীর্তি আজাদ। মহারাষ্ট্রে একই পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের একটি মামলার রায়ও তিনি উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে দল হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতেই সব সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন করে কমিটি তৈরি করেছেন মমতা ব্যানার্জী।

তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে নির্বাচিত সাবেক রাজ্যসভা সদস্য জহর সরকার বিবিসিকে বলছিলেন, "এনসিপিআই বিজেপির একটি শেল কোম্পানি। মানে দলটি বিজেপির হয়ে কাজ করলেও তাদের অস্তিত্ত্ব রয়েছে শুধু কাগজেই।"

এমপি-র পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া সাবেক এই শীর্ষ আমলা ও সংসদ সদস্য বলছিলেন, "বিধানসভায় তৃণমূলের টিকিটে জয়ী বিধায়কদের মতো তৃণমূলের প্রতীক বা দলের অর্থ সম্পত্তি দাবি না করে বিদ্রোহী এমপি-রা কিন্তু সরাসরি বিজেপির পক্ষে গিয়েই যোগ দিয়েছে। তাই মমতা ব্যানার্জীকে তার দলের প্রতীক বা সম্পত্তি হারাতে হবে না।"

দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। এনডিএ-র ছোট ছোট পার্টির সমর্থনে নরেন্দ্র মোদি সরকার গঠন করেছেন।

এই সুযোগে তৃণমূলের ২০ জন সংসদ সদস্য এনডিএ-র শরিক দলে ভিড়ে গিয়ে বিজেপিকে আরও সুবিধা করে দিল বলেই জহর সরকার মনে করেন।