যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে কী প্রভাব ফেলবে?

বাংলাদেশের একটি গার্মেন্ট কারখানার ছবি যেখানে পোশাকের স্তূপের পাশে কাজ করছেন নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা, তাদের মুখে মাস্ক

ছবির উৎস, Corbis via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের রপ্তানির সবচেয়ে বড় খাত তৈরি পোশাক রপ্তানিতে এই শুল্কের প্রভাব কী হবে সে নিয়েই চলছে আলোচনা
    • Author, মুকিমুল আহসান
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

জোরপূর্বক শ্রমে পণ্য উৎপাদন যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার অভিযোগে বাংলাদেশ থেকে থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে নতুন করে শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই শুল্ক বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কেমন প্রভাব ফেলবে- সেই প্রশ্ন সামনে আসছে।

এর আগেও দুই দফায় বাংলাদেশের ওপর শুল্ক আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। গত শুক্রবার রাত ১২টা থেকে নতুন শুল্কহার কার্যকর হয়েছে।

যদিও বাংলাদেশের বর্তমান সরকার মনে করছে, এই শুল্ক আরোপের খুব একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না রফতানি খাতে।

শুক্রবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পোশাক রপ্তানিকারক দেশ চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডকে সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্কস্তরে রাখা হয়েছে। ফলে এসব দেশের তুলনায় মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

যদিও সরকারের এই বক্তব্যের সাথে পুরোপুরি একমত নন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্ক আরোপের বেশ কিছু প্রভাব তৈরি হতে পারে।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, এই শুল্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা কমতে পারে।

তবে নতুন শুল্কের কারণে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে তাৎক্ষণিক বড় কোনো পরিবর্তন হবে না বলে মনে করছেন রফতানিকারকরা।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্ততকারক ও রফতানিকারক সমিতি বা বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ট্যারিফের হার যেহেতু বাড়ছে না, ফলে এর খুব একটা প্রভাব পড়বে না বাংলাদেশের ওপর।

শুক্রবার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও একই যুক্তি তুলে ধরে বলেছেন, "এটি নতুন শুল্ক আরোপ নয়, রিপ্লেসমেন্ট বা প্রতিস্থাপন। নতুন কোনো অতিরিক্ত শুল্ক চাপানো হয়নি। ফলে শুল্ক পরিস্থিতিতে বাস্তবে কোনো পরিবর্তন আসছে না।"

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

কোন দেশের ওপর শুল্কহার কত?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বাজারে যে সব পণ্য রফতানি করা হয় তার মধ্যে ৮৫ শতাংশই তৈরি পোশাক।

তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশ হচ্ছে, ভিয়েতনাম, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, কম্বোডিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান ও হন্ডুরাস।

শুক্রবার রাত থেকে যে ৬০টি দেশের ওপর ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার ঘোষণা এসেছে, এর মধ্যে ১৭টি দেশের জন্য ১০ শতাংশ এবং বাকি দেশগুলোর জন্য সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

১০ শতাংশ শুল্কহার আরোপ করা হয়েছে যে দেশগুলোর ওপর সেগুলো হচ্ছে- বাংলাদেশ, ভারত, আর্জেন্টিনা, যুক্তরাজ্য, কম্বোডিয়া, কানাডা, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো।

রফতানিকারকরা বলছেন, নতুন ঘোষণায় বাংলাদেশের জন্য কার্যকর ট্যারিফে বাস্তবে কোনো পরিবর্তন হয়নি।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এতদিন সেকশন ১২২-এর আওতায় ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর ছিল। সেই ব্যবস্থার মেয়াদ শেষ হয়েছে। এখন সেকশন ৩০১-এর আওতায় নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হচ্ছে। সুতারং শতাংশের হিসেবে এটি অপরিবর্তিতই থাকছে"।

বাংলাদেশসহ ১৭টি দেশের ওপর ১০ শতাংশ শুল্কের বাইরে চীন, ভিয়েতনাম, তুরস্ক, ব্রাজিল, মিসরসহ ৩৮টি দেশের পণ্যে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।

মার্কিন শুল্কের ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা
ছবির ক্যাপশান, মার্কিন শুল্কের ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা

কী প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশে?

এই শুল্ক আরোপের ঘোষণা আসার পর বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতিতে বলেছে, বাংলাদেশ ১৭টি দেশের একটি, যাদের জন্য সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অক্ষুণ্ণ থাকবে।

একই সঙ্গে চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো প্রধান প্রতিযোগী দেশের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করায় বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা আরো জোরালো হবে বলে মনে করছে সরকার।

যদিও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যে শুল্কগুলো আরোপ করা হয়েছে, তার নেতিবাচক প্রভাব এরই মধ্যে পড়ছে। কেননা ইউরোপের বাজারের বাংলাদেশের পণ্য রফতানির ধারায় কিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

দীর্ঘমেয়াদে একটি প্রভাব পড়তে পারে উল্লেখ করে অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে শুল্ক একই রকম থাকছে এবং শর্তগুলোও আগের মতোই থাকছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে। সুতরাং বর্তমানে যে দুর্বল পরিস্থিতি আছে সেটিরই ধারাবাহিকতাই থাকবে বলে সহজেই অনুমান করা যায়।"

"নতুন শুল্ক যেটি দেওয়া হলো শ্রমমানের কারণে, বাণিজ্য শর্তের সেই জায়গাগুলোতে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না হলে চ্যালেঞ্জটা কন্টিনিউ করবে সামনের দিনগুলোতে"।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, হয়তো বাংলাদেশে জোরপূর্বক শ্রমের বিষয়টি বড় আকারে নাও থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ তৃতীয় যে দেশ (বিশেষ করে চীন) থেকে কাঁচামাল আমদানি করে থাকে, সেখানে জোরপূর্বক শ্রমের বিষয়টি থাকলে তার প্রভাব পড়তে নতুন এই শুল্ক ঘোষণার ফলে।

মি. মোয়াজ্জেম বলছিলেন, "তৃতীয় দেশ হিসেবে আমরা চীন থেকে কাঁচামাল আমদানি করে থাকি। সেই জায়গায় থেকে সরে আসার মতো অবস্থায় নেই। সেখান থেকে বাংলাদেশকে বাজার বহুমুখী করার বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে ভাবা দরকার। কেননা আগামীতে ট্র্যাডিশনাল বাজার অব্যহতভাবে ওঠানামার মধ্যে থাকবে বলে মনে হচ্ছে। সেখানে মেরুকরণেরও ইঙ্গিত রয়েছে"।

তবে, কাঁচামাল আমদানিকারক তৃতীয় দেশ চীন যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর সেটি মানছে তৈরি পোশাক ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজিএমইএ।

সংগঠনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "আমাদের ক্ষেত্রে কোনো ফোর্সড লেবার পায়নি। আমরা এই চ্যালেঞ্জে গেছি। এখন তারা বলতেছে, যেখানে ফোর্সড লেবার (জোরপূর্বক শ্রম) ইউজড হয় সেখান থেকে আমরা 'র মেটেরিয়ালস' (কাঁচামাল) আমদানি করি... ইনডাইরেক্টলি অথবা ডাইরেক্টলি তারা চীনের কথা বলেছে"।

অর্থাৎ নতুন ঘোষণার পর সরাসরি রফতানিতে প্রভাব না পড়লেও কাঁচামাল আমদানিতে যে সংকট তৈরি হতে পারে তার একটা ইঙ্গিত স্পষ্ট পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ সহ ৬০টি দেশে নতুন করে শুল্ক আরোপ করেছে ইউএসটিআর

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশ সহ ৬০টি দেশে নতুন করে শুল্ক আরোপ করেছে ইউএসটিআর, প্রতীকী ছবি

শুল্ক আরোপ নিয়ে দরকষাকষি

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে এমন দেশগুলোর পণ্য আমদানিতে উচ্চ হারে শুল্ক আরোপে তৎপরতা শুরু করেন।

গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের দোসরা এপ্রিল পাল্টা শুল্ক বা রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপ করা হয়। বিশ্বের ৫৭টি দেশের বিভিন্ন হারে এই শুল্ক আরোপ করা হয়।

শুরুতে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক ছিল ৩৭ শতাংশ। পরে তা কমিয়ে ৩৫ শতাংশ এবং একপর্যায়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।

গত ৯ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেডের বা এআরটি'র পর শুল্ক ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। তবে ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ১৯ শতাংশ শুল্ক পরে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দেন।

সুপ্রিম কোর্টের ওই সিদ্ধান্তের কয়েক দিনের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নির্বাহী ক্ষমতাবলে ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ১২২-এর আওতায় ১০ শতাংশ অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করেন। আইন অনুযায়ী, এ শুল্ক সর্বোচ্চ ১৫০ দিন বহাল রাখা যায়।

ওই মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এখন ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১-এর আওতায় নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়েছে।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এই শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া প্রায় ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ পণ্যের ওপর প্রযোজ্য হবে। তবে তেল, গ্যাস, সার ও কিছু খাদ্যপণ্যসহ কয়েকটি পণ্য এ শুল্কের বাইরে রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে পণ্য রফতানিতে আগে থেকে গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক ছিল। তার সাথে জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগে ১০ শতাংশ শুল্কের বিষয়টি যুক্ত হয়েছে। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রে এখন থেকে পণ্য রফতানিতে শুল্ক দাঁড়াবে ২৫ শতাংশ।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমাদের জন্য এখন থেকে ডিউটি ও ট্যারিফ সব মিলিয়ে দাঁড়াবে ২৬ থেকে ২৭ শতাংশ। কারো কারো জন্য এই পরিমাণ আরো বেশি। যাদের অনেকেই আমাদের প্রতিযোগীও"।