স্বর্ণের দাম কমছে কেন এবং আরো কমার সম্ভাবনা কতটুকু?

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
- Author, জান্নাতুল তানভী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
এ বছরের জানুয়ারিতেই বাংলাদেশসহ বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। সেসময় দেশে ভরি প্রতি সোনার গহনার দাম প্রায় তিন লাখ টাকার কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। তবে এরপরই সোনার দাম ধাপে ধাপে কমতে শুরু করে।
মঙ্গলবার দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম ভরিতে দুই হাজার টাকার বেশি কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বাজুস। গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই স্বর্ণের দামে এই নিম্নগতি লক্ষ্য করা গেছে।
নির্ধারিত নতুন দাম অনুযায়ী, এখন ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ভ্যাটসহ দুই লাখ ১৯ হাজার ৮০৮ টাকা।
এছাড়া প্রতি ভরি ২১ ক্যারেট স্বর্ণ দুই লাখ নয় হাজার ৮৯৪ টাকা, ১৮ ক্যারেট এক লাখ ৮০ হাজার ২৬৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম এক লাখ ৪৭ হাজার ৩১৬ টাকা নির্ধারণ করেছে বাজুস।
স্বর্ণের এই দাম আরো কমবে নাকি আবার বেড়ে যেতে পারে এমন আগ্রহ রয়েছে অনেকের মনেই।
গুগলে সার্চ করে অনেকেই স্বর্ণের দাম সম্পর্কে জানতে চান। এমনই একজন গাজীপুরের বাসিন্দা জান্নাতুল মাওয়া।
মিজ মাওয়া বলছিলেন, তিন লাখ টাকা হলে স্বর্ণের গহনা কেনা একেবারেই অসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। ভরি দুই লাখ টাকার ওপরে হলেও এখন অনেক কমেছে। সেই কারণেই দাম আরো কমবে কি না জানতে চান তিনি।
"খুব বেশি কিনতে পারবো না, কিন্তু আমার তিন মেয়ে। তাই যখনই দাম কমে, সাধ্য অনুযায়ী অল্প অল্প করেই কেনার চেষ্টা করি। মাঝে মাঝেই দেখি কত কমলো। এখন যদি আরো কমে তাহলে হয়তো একটা ছোট দুল হলেও কিনবো। কিন্তু দাম বেড়ে যদি তিন লাখ হয়ে যায় তাহলে তো হাতই দিতে পারবো না," বলেন মিজ মাওয়া।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
তবে, অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন বলছে, স্বর্ণের দাম পূর্বানুমান করা বেশ কঠিন। কারণ এই বাজার খুবই নাজুক।
তবে, বুধবার সকালেও আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে বেশ ওঠানামা ছিল বলে উল্লেখ করেন বাজুসের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং-এর চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন।
এই নিম্নগতি থাকলে আগামী কয়েকদিন হয়তো দেশে ভরি প্রতি স্বর্ণের দামও কম থাকতে পারে; তবে এটিও নিশ্চিত নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
কিন্তু এখন দাম কম থাকলেও কিছুদিনের মধ্যেই বেড়ে যেতে পারে বলে আশা করছেন মি. ইসলাম।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "দাম কমবে কি না এটা কেউ বলতে পারবে না। তবে পিউর গোল্ডের ইন্টারন্যাশনাল মার্কেট ও লোকাল মার্কেট একটু ডাউনওয়ার্ড ট্রেন্ড বা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আজ আন্তর্জাতিক বাজার খুব ওঠানামা করছে, এটার প্রভাব আমাদের এখানে কাল বা পরশু এসে হয়তো পড়বে। তখন হয়তো দাম কমতে পারে।"
বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, আন্তর্জাতিক বাজার, চাহিদা, ডলারের মূল্য এরকম অনেকগুলো সূচকের ওপর নির্ভর করে দেশের বাজারে স্বর্ণের মূল্যের তারতম্য হয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এখন স্বর্ণের দাম কমলেও হয়তো কিছুদিনের মধ্যে আবার বেড়ে যেতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, "যুদ্ধটা যদি আরো তীব্র আকার ধারণ করে, যুদ্ধ বাড়া মানে বৈশ্বিক আর্থিক ঝুঁকিটা বেড়ে যায়। তাহলে কিন্তু আবার স্বর্ণের দাম বাড়বে। আমার ধারণা এই দাম কমাটা খুব একটা স্থায়ী হবে না।"
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য সংবাদ

ছবির উৎস, Getty Images
স্বর্ণের দাম কমছে কেন?
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম লাখের ঘরে পৌঁছায়।
মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এ বছরের জানুয়ারিতে সেটি বেড়ে হয়েছিল দুই লাখ ৮৬ হাজার টাকা।
জানুয়ারিতে স্বর্ণের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ৯১ বার দাম সমন্বয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বাজুস।
এর মধ্যে ৪৪ বার দাম বেড়েছে এবং ৪৬ বার কমেছে স্বর্ণের দাম। আর ভ্যাট সমন্বয় করা হয়েছে একবার।
ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সোনার দাম নিম্নমুখী হয়।
২৮শে জানুয়ারি প্রতি ট্রয় আউন্স (৩১ দশমিক ১ গ্রাম) সোনার দাম সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ৩০৩ ডলারে ছিল। যেটি গত শুক্রবারে কমে চার হাজার ২৩৫ ডলার হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এই বাজারটা চাপে রয়েছে।
এই যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় তেল ও গ্যাসের দাম ছিল ঊর্ধ্বগতির। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মূল্যস্ফীতিতে।
অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন বলেন, "যুদ্ধের কারণে অর্থনীতি যখন চাপে পড়ে তখন বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির চাপটা বাড়ে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় অর্থনীতির কথাই বলছি।"
একইসঙ্গে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বর্তমানে স্বর্ণের দামের ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন তিনি।
সুদের হার বাড়লে সাধারণত বন্ড ও মার্কিন ডলারের চাহিদা বাড়ে, ফলে স্বর্ণের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। কেননা স্বর্ণ থেকে কোনো সুদ পাওয়া যায় না।
অর্থনীতিবিদ মিজ খাতুন বলছিলেন, "যখন সুদের হার বেশি হয় তখন ট্রেজারি বন্ড বা সুদ স্বর্ণের বিনিয়োগ বেশি আকর্ষণীয় হয়। কিন্তু স্বর্ণ থেকে তো কোনো ইন্টারেস্ট পাওয়া যায় না। এটা কিনলেন, রেখে দিলেন, দাম হয়তো বাড়বে কিন্তু সুদ পাবেন না। এজন্য বন্ডের ইনভেস্টমেন্টের চাইতে স্বর্ণে বিনিয়োগ বেশি আকর্ষণীয় হবে না।"
যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ডলারে নির্ধারিত হয়, তখন এর দাম বাড়লে স্বর্ণ এমনিতেই "এক্সপেন্সিভ হয়", ফলে স্বর্ণের চাহিদা এমনিতেই কমে যায় বলেন মিজ খাতুন।
এছাড়া, মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, ডলারের দামও স্বর্ণের দাম কমার পেছনে কারণ হিসেবে কাজ করে বলে জানান ফাহমিদা খাতুন।
বাজুসের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং এর চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধ বা এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে আগে স্বর্ণের দামে ঊর্ধ্বগতি থাকতো। যুদ্ধ চলমান থাকলেও "এখন উল্টো কমে যাচ্ছে"।
একইসঙ্গে, চীনা ব্যাংকগুলোর নেওয়া একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত স্বর্ণের দাম কমার পেছনে অন্যতম কারণ বলে মনে করেন এই ব্যবসায়ী।
মি. ইসলাম বলেন, "চাইনিজ ব্যাংকগুলো বলছে, পেপার ট্রেডিং গোল্ড তারা রাখতে দেবে না। সবাইকে ২৬শে জুলাইয়ের মধ্যে এগুলো এনক্যাশ বা টাকায় রূপান্তর করতে হবে। একইসময়ে এতগুলো জিনিস সেল হওয়ায় তার প্রেসার অনেকটা ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে পড়ছে- এটা আমার ব্যক্তিগত ধারণা।"
আন্তর্জাতিক বাজারে এটি ব্যাপক প্রভাব ফেলে বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, পেপার ট্রেডিং গোল্ড বলতে বোঝায়, শেয়ার বা কমোডিটি মার্কেটে যেখানে স্বর্ণ, তেল ইত্যাদির কেনা-বেচা করা হয়, সেখানে একটি ঝুঁকিমুক্ত প্রক্রিয়া হলো পেপার ট্রেডিং গোল্ড।অর্থাৎ, আসল সোনা হাতে না রেখে, কাগজের ডকুমেন্ট বা ডিজিটাল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সোনার মালিকানা বা মূল্যের ওপর বিনিয়োগ করাকে বোঝায়।
তবে, বুধবারের আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের ওঠা-নামা দুটিই ছিল।
স্বর্ণের দাম পূর্বানুমান করে এরকম কয়েকটি আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইটে দাম কবে নাকি বাড়বে এ বিষয়ে অনুমান করা হয়েছে বলে জানান মি. ইসলাম।
"ওয়ার্ল্ড ফেমাস বেশ কয়েকটা ওয়েবসাইটে যারা প্রেডিক্ট করে তাদের বক্তব্য হলো, ২০২৬ সালের মধ্যে স্বর্ণের দাম আবার হয়তোবা ৫৮০০ বা ৯০০ বা ছয় হাজার ডলার পার আউন্স হতে পারে।"
"আমরা আশা করছি, কিছুদিনের মধ্যেই এটা আরেকবার বেড়ে যেতে পারে। দামটা বাড়বে। যে নিম্নমুখী প্রবণতা, এর একটা টাইম থাকে," বিনিয়োগকারীরা আবার বিনিয়োগ শুরু করলে তখন দাম বেড়ে যাবে বলে জানান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম।
তবে স্বর্ণের দাম ঠিক কবে নাগাদ বাড়তে পারে সেটা বলা মুশকিল বলেও জানান তিনি।

ছবির উৎস, Getty Images
এখন কি তবে স্বর্ণে বিনিয়োগের সময়?
বাংলাদেশে ভরি হিসেবে স্বর্ণ বিক্রি করা হয়। ভরি, রতি, আনা স্বর্ণের ওজন পরিমাপের এই এককগুলো দেশে প্রচলিত হলেও বৈশ্বিকভাবে স্বর্ণের ওজন পরিমাপের একক হলো ট্রয়, আউন্স ও গ্রাম।
সাধারণত বাংলাদেশে নারীরা সৌন্দর্য চর্চার অংশ হিসেবে স্বর্ণের অলংকার ব্যবহার করে থাকেন। তবে অনেকের কাছে সহজে স্থানান্তরযোগ্য সম্পদ হিসেবেও বিবেচিত হয় স্বর্ণ।
এই লেখার শুরুতেই মিজ মাওয়ার কথা বলেছিলাম, যিনি তার তিন কন্যা সন্তানের জন্য স্বর্ণ কেনার কথা বলছিলেন। তার মেয়েদের সবারই বয়স ছয় বছরের নিচে।
মিজ মাওয়া বলেন, "আম্মার বিয়ের গলার হার আমার বিয়েতে দিয়েছে। কিছুদিন আগে সেই সোয়া তিন ভরির হারটির দাম যাচাই করি। খাঁটি সোনা হওয়ায় ভালো দাম দেওয়ার কথা বলেছিল, যদিও বিক্রি করিনি।"
মিজ মাওয়ার কথাতেও ফুটে উঠেছে, স্বর্ণের অলংকারের ক্ষেত্রে অন্যান্য বিনিয়োগের মতো সুদ না এলেও এটিও নিরাপদ বিনিয়োগের একটি উৎস।
বাজুসের দেওয়ান আমিনুল ইসলামও নিজের পরিবারের উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন।
"আমার আম্মার ১৯৬৩ সালে যখন বিয়ে হয়েছিল তখন ৮০ টাকা স্বর্ণের ভরি ছিল। এখন যখন আমার মেয়ের বিয়ে দেওয়ার সময় এলো, দাম তখন দুই লাখ প্লাস। এই যে পার্থক্য, এতে পারিবারিক ঐতিহ্যও থাকলো, আবার এই খাতে বিনিয়োগও নিরাপদ।"
কিন্তু কেউ যদি বাণিজ্যিকভাবে শুধু স্বর্ণে বিনিয়োগ করতে চান সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও লোকাল মার্কেটের বাজারদর দেখেই বিনিয়োগ করার পরামর্শ দেন মি. ইসলাম।








