ওপেক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরে যাওয়ার ঘোষণা কেন বড় ঘটনা?

    • Author, ফয়সাল ইসলাম
    • Role, ইকোনমিকস্ এডিটর
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

হঠাৎ করে অর্গানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ বা ওপেক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা একটি বড় ঘটনা। ১৯৭১ সালে একক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশেরও আগে থেকে আমিরাতগুলো ওপেকের সদস্য ছিল।

ওপেক মূলত উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর একটি জোট। বহু দশক ধরে এই সংস্থাটি তেল উৎপাদন বাড়ানো বা কমানোর মাধ্যমে এবং সদস্য দেশগুলোর উৎপাদন কোটা নির্ধারণ করে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।

১৯৭০–এর দশকের তেল সংকটের সময় ওপেকের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা পরবর্তীকালে বৈশ্বিক জ্বালানি নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে আসে।

ওপেকের উৎপাদনে ক্ষেত্রে আধিপত্য মূলত সৌদি আরবের হাতে থাকলেও, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা ইউএই ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতাসম্পন্ন দেশ। অর্থাৎ, তেলের দাম সামাল দিতে হলে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষমতা যাদের ছিল, সেই তালিকায় সৌদি আরবের পরেই ছিল ইউএই।

এই বিষয়টিই আরব আমিরাতকে দীর্ঘমেয়াদে ওপেকের ভেতরে নিজেদের অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। দেশটি উৎপাদন সক্ষমতায় যে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে, সেটির পুরোপুরি ব্যবহার করতে চেয়েছিল তারা।

ওপেকের কোটা ব্যবস্থার কারণে ইউএই'র তেল উৎপাদন দৈনিক প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ ব্যারেলে সীমাবদ্ধ ছিল। এর ফলে দেশগুলোকে যে রাজস্ব হারাতে হয়েছে, তা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ইউএই'র ওপরই বেশি পড়ছিল।

যদিও এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়টা ইঙ্গিত দিচ্ছে ইরান যুদ্ধের প্রভাবের দিকে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা আমিরাতের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে এবং সৌদি আরবের সঙ্গে আগে থেকেই টানাপোড়েনে থাকা সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ওপেকের জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা। বিশেষ করে, এমন সময়ে ঘোষণাটি এল যখন দীর্ঘমেয়াদে সংস্থাটির ঐক্য ও কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

একদিকে, নিজেদের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে ইউএই দৈনিক ৫০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করতে পারে।

অন্যদিকে, সৌদি আরব এর জবাবে তেলের দামের যুদ্ধ শুরু করতে পারে। যা তুলনামূলকভাবে বৈচিত্র্যময় অর্থনীতির দেশ ইউএই হয়তো সামাল দিতে পারবে। কিন্তু ওপেকের অন্য সদস্য, বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোর পক্ষে তা সহ্য করা কঠিন হবে।

বেশিরভাগ বিষয়ই শেষ পর্যন্ত নির্ভর করছে সৌদি আরব কী প্রতিক্রিয়া জানায় তার ওপর।

আবুধাবির তেলক্ষেত্রগুলো থেকে নতুন পাইপলাইন নির্মাণের কথা বলছেন ইউএই'র শীর্ষ কর্মকর্তারা।

যে পাইপলাইনগুলো হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সরাসরি ফুজাইরাহ বন্দরের দিকে যাবে। এই বন্দরটি কম ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

বর্তমানে একটি পাইপলাইন পূর্ণমাত্রায় ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে উৎপাদন বাড়লে সেই অতিরিক্ত তেলের সরবরাহ সামাল দিতে আরো বেশি সক্ষমতার প্রয়োজন হবে।

তাছাড়া, উপসাগরীয় অঞ্চলে তেলবাহী জাহাজের যাতায়াত এবং ব্যয়ে স্থায়ী পরিবর্তন আসবে। এর খাপ খাইয়ে নিতেও সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

অবশ্য আপাতত সংযুক্ত আরব আমিরাতের সিদ্ধান্তটি তেলের বাজারে সবচেয়ে গুরুতর বিষয় নয়। কারণ, হরমুজ প্রণালিতে কার্যত দ্বিমুখী অবরোধ চলছে। যার ব্যাপক প্রভাব দেখা যাচ্ছে, তেল, গ্যাস, পেট্রোল, প্লাস্টিক ও খাদ্যপণ্যের দামে।

সারাবিশ্বের নজর এখন স্বাভাবিকভাবেই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছুঁয়ে ফেলার ঘটনার দিকে। তবে আগামী বছর কোনো এক সময়ে তেলের দাম আবার ৫০ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

যদি চলতি বছরের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে হরমুজ প্রণালির জটিলতার সমাধান হয়ে যায়, তাহলে তেলবাজারের চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে।

১৯৭০ এর দশকের তুলনায় বিশ্ব তেলবাজারে ওপেকের গুরুত্ব আজ অনেকটাই কমেছে। সে সময় আন্তর্জাতিকভাবে কেনাবেচা হওয়া মোট তেলের প্রায় ৮৫ শতাংশ ওপেকের নিয়ন্ত্রণে ছিল, এখন সেই অংশ নেমে এসেছে প্রায় ৫০ শতাংশে।

একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য তেলও এখন আর সেই সত্তরের দশকের মতো অতটা গুরুত্ব বহন করে না।

ওপেকের হাতে এখনো প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা আছে ঠিকই, কিন্তু একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ আর নেই। অর্থাৎ, সংস্থাটি আর আগের মতো গোটা বিশ্বকে কার্যত 'জিম্মি' করে রাখার অবস্থানে নেই।

ওপেকের এক সময়ের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং সাবেক সৌদি তেলমন্ত্রী শেখ ইয়ামানি একবার একটি কথা বলেছিলেন, যা আজও প্রাসঙ্গিক।

তিনি বলেছিলেন, "প্রস্তর যুগের অবসান হওয়ার কারণ যেমন পৃথিবী থেকে পাথর ফুরিয়ে যাওয়া নয়। তেমনি তেল যুগের অবসানের জন্যও তেল ফুরিয়ে যাওয়ার মতো কারণের দরকার হবে না।"

এই কথাটি এমন এক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে হাইড্রোকার্বনভিত্তিক জ্বালানির জায়গা ধীরে ধীরে দখল করে নেবে অন্য ধরনের জ্বালানি উৎস।

এই প্রেক্ষাপটে আরব আমিরাতে পদক্ষেপকে এভাবেও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে – এটি এমন এক পৃথিবীর আভাস দেয় যেখানে তেলের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমে আসছে। চলমান অস্থিরতার মধ্যেও আরো কিছু ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।

বিদ্যুতায়নে চীনের বিপুল বিনিয়োগকে উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে। এর ফলে তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি অর্থনীতিতে যে চাপ সৃষ্টি করেছে, তা অনেকটাই সামাল দিতে পেরেছে দেশটি।

কিছু হিসাব অনুযায়ী, চীনে গাড়ি, লরি ও রেলপথে বিদ্যুতায়নের প্রসার বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিতে তেলের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল কমিয়ে দিয়েছে।

এই প্রবণতা যদি বিশ্বজুড়ে আরও জোরদার হয়, তাহলে বৈশ্বিক তেলের চাহিদা একসময় এমন স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে যাতে আর দাম বাড়বে না।

এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, চাহিদায় হঠাৎ করে বড় ধস নামার আগেই তেলের মজুদ থেকে যতটা সম্ভব দ্রুত অর্থ তুলে নেওয়াটাই যৌক্তিক বলে মনে হতে পারে।

এই কৌশল বাস্তবায়নের মতো আর্থিক সক্ষমতা আরব আমিরাতের রয়েছে, আর্থিক পরিষেবা ও পর্যটন খাতের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই আংশিকভাবে বহুমুখী একটি অর্থনীতিও গড়ে তুলেছে তারা।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত যখন বন্ধ হবে, যদি সেটি হয়, তারপর যে নতুন বাস্তবতার আবির্ভাব ঘটবে সেটার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।

ইউএই'র ওপেক ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ধারাবাহিকভাবে আরও পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। যা অন্য দেশগুলোকেও একের পর এক প্রভাবিত করতে পারে। তাহলে, সৌদি আরবের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে অথবা ইউএই যদি নতুন পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ আরও জোরালোভাবে এগিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে ওপেকের কোনো বাধ্যবাধকতা ছাড়াই আমিরাতি তেল সরবরাহ হবে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গতিতে ও পরিমাণে।

বর্তমান অবরোধ পরিস্থিতিতে এর প্রভাব খুবই সীমিত থাকবে। কিন্তু অবরোধ উঠে যাওয়ার পর পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে দিতে পারে এই পদক্ষেপ।