এলপিজির দাম বাড়তে বাড়তে কোথায় গিয়ে ঠেকবে?

    • Author, মরিয়ম সুলতানা
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

লিকুফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস কিংবা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, যা এলপিজি নামে পরিচিত – এই জ্বালানির দাম এক মাসের মধ্যেই দুই দফায় বাড়ানো হয়েছে।

বাংলাদেশে ডিজেল, অকটেন, পেট্টল, কেরোসিনসহ সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির দিনেই দ্বিতীয় দফায় এলপিজিরও দাম বাড়ানো হয়েছে।

এর আগে এপ্রিলের শুরুতে এক দফা দাম বাড়ানোর পর গতকাল আবারও প্রতি কেজি এলপিজি'র দাম ১৭ টাকা ৬২ পয়সা বৃদ্ধি করেছে বিইআরসি। গতকাল ১৯শে এপ্রিল সন্ধ্যা থেকেই নতুন এই দাম কার্যকর করা হয়েছে।

নতুন দামে বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য এক হাজার ৭২৮ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে এক হাজার ৯৪০ টাকা।

অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে শুধু ১২ কেজির সিলিন্ডারেই দাম বেড়েছে ২১২ টাকা। এর আগে, এপ্রিলের শুরুতে প্রতি কেজিতে ৩২ টাকা ৩০ পয়সা বাড়ানো হয়েছিল। এ নিয়ে এই বছর পাঁচ দফায় এলপিজির দাম সমন্বয় করা হলো। যদিও অভিযোগ রয়েছে যে, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বাজারে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে এভাবে দফায় দফায় এলপিজির দাম বাড়ার কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বলছে, এলপিজি'র দাম সহসা কমার সম্ভাবনা কম; বরং, আরও বাড়তে পারে।

দাম বাড়ায় ভোক্তাদের ভোগান্তি

২০২১ সালের এপ্রিল থেকে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি। যদিও বিইআরসি'র বেঁধে দেওয়া দামে বাজারে এলপিজি বিক্রি হয় না, এমন অভিযোগ রয়েছে ভোক্তাদের।

বিবিসি বাংলা আজ সোমবার ঢাকা'র বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে এমন তথ্যই পেয়েছে। দেখা গেছে, বাজারে বরাবরই নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০-৩০০ টাকা বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে বিইআরসি পরিচালক (গ্যাস) মো. হেলাল উদ্দিন তালুকদার বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমরা জানি যে এটা হচ্ছে। আমাদেরও তো কিনে খেতে হয়। সবসময় না হলেও গত দুই তিন মাস ধরে এটা হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি (নজরদারির)...স্থানীয় প্রশাসনকে জানানোর।"

এলপিজির ১২ কেজি সিলিন্ডার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালির কাজে এবং একসময় এগুলোর শহরাঞ্চলে বেশি ব্যবহৃত হলেও এখন এর বিচরণ শহরতলী বা গ্রামে-গঞ্জেও।

বাংলাদেশের দক্ষিণের জেলা পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার এক নারী সেলিনা আক্তার বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "বৃষ্টিবাদলার দিন। সবসময় লাকড়ির চুলায় (মাটির চুলা) রান্নাবান্না করা যায় না। সেজন্য অনেক বছর হইলো গ্যাসের চুলাও আছে আমার ঘরে। যখন সময় থাকে না, উপায় থাকে না, তখন গ্যাসে চড়াই (রান্না করি)। কিন্তু এখন যেভাবে দাম বাড়তেছে, তাতে মনে হয় না আপাতত গ্যাসের সিলিন্ডারের খরচ আমি কুলায়ে (সামলে) উঠতে পারবো।"

এর বাইরে, ছোট ছোট গার্মেন্টস এবং রেস্টুরেন্টেও এখন এলপিজি গ্যাস ব্যবহার করা হয়।

বিবিসি বাংলা সরেজমিনে যাওয়ার পর বিভিন্ন রেস্টরেন্টসহ ফুটপাতের বিভিন্ন ভাসমান দোকানে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাসের দাম বাড়ায় তারা এখন খাবারের দাম বাড়ানোর চিন্তা করছে।

পরিবহন খাতেও এখন এলপিজি'র জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা অনেক।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "রান্নায় এলপিজি'র অবস্থান স্যাচুরেশনে চলে গেছে।"

অর্থাৎ, ইতোমধ্যে অনেক মানুষ এলপিজি ব্যবহার করছে। পরিবহনে, শিল্পেও এলপিজির ব্যবহার বাড়ছে বলে তিনি জানান।

এক মাসে দুইবার দাম বাড়ার বিষয়টা "ভয়াবহ" উল্লেখ করে তিনি বলেন, এভাবে দাম বাড়লে ভোক্তারা দীর্ঘমেয়াদে সামাল দিতে পারবে না এবং নির্দিষ্ট কোনো পণ্য বা সেবার দাম এভাবে বাড়লে ভোক্তা তখন অন্য সেবা বা পণ্য কেনা থেকে বিরত রাখে।''

সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ে বলে তিনি বলছেন।

"সে তার ভোগ ব্যয় কমিয়ে অবস্থার মোকাবিলা করে। তখন পণ্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। পণ্য সরবরাহ কমে গেলে ব্যবসা কমে যায়। ব্যবসা কমলে ভ্যাট-ট্যাক্স কমে যায়, সরকারের আয় কমে যায়। তখন সরকার ব্যাংক থেকে লোন করে তার বাজেট সমন্বয় করে। আর লোন বেশি হলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো লোনের সংকটে পড়ে ও তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাটা পড়ে।"

"তারপর যখন সরকার কুলাতে পারে না, তখন টাকা ছাপায় এবং টাকার মান তখন কমে যায়। তখন আপনি ভোক্তা হিসেবে দ্রব্যমূল্যের স্ফীতির স্বীকার হন। অপরদিকে মান কমার কারণে আয় সংকুচিত হয়ে যায়, ক্রয় ক্ষমতা কমে। তখন সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা নেমে আসে। অর্থনীতি বিপন্ন হয় ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে যায়," ব্যাখ্যা করেন তিনি।

কী কারণে দাম বাড়াতে হলো?

বিইআরসি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় বিকল্প পথে আমদানি করতে সময় ও খরচ বেড়েছে, পাশাপাশি বেড়েছে বিমা ও নিরাপত্তা ব্যয়। এ কারণে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রতি মেট্রিকটনে ২৫০ ডলার অতিরিক্ত খরচ ধরে সাময়িকভাবে বেসরকারি এলপিজি ও অটোগ্যাসের ভোক্তা পর্যায়ের দাম সমন্বয় করা হয়েছে।

বিইআরসি পরিচালক (গ্যাস) মো. হেলাল উদ্দিন তালুকদার বিবিসিকে বলছিলেন, সুনির্দিষ্ট কোনো নিয়ম না থাকলেও আগে সাধারণত মাসে একবার দাম সমন্বয় করা হতো। কিন্তু এখন "সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে" এপ্রিল মাসে দুই দফায় দাম বাড়াতে হয়েছে।

তিনি জানান, "এখন জাহাজের ভাড়া বেড়ে গেছে। মাঝখানে আমরা এলপিজি'র দাম না বাড়ানোর কারণে আমদানি করা হয় নাই । তখন ঝামেলা হয়ে গেছে।"

"আমরা যদি আগাম দাম ধরে না দেই, তাহলে ওরা (ইম্পোর্টাররা) নতুন করে এলপিজি ইম্পোর্ট করবে না। তাই আমরা বর্তমানে কার্গোর যে ভাড়া, সেটা সমন্বয় করছি শুধু। যেহেতু ডিজেলের দাম বাড়ছে, তাই পরিবহন খরচও বাড়ছে। আবার ডলারের সাথেও এডজাস্ট হইছে।"

যদিও ক্যাব-এর জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মনে করেন, দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে বিইআরসি যে যুক্তি দিচ্ছে, তা সঠিক না। তার ভাষায়, "এ যুক্তি একতরফা।"

তিনি মনে করেন, "যে পণ্য আসেনি এখনো বাজারে, সেই পণ্যের মূল্য আগাম ধরে নির্ধারণ করে দেওয়া, এটা কী করে সম্ভব? আপনি আমদানি করলেন না, কিন্তু আগেই দাম ধরে দিলেন।"

"গণশুনানি" হলে দাম বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা বা যৌক্তিকতা বোঝা যেত উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন করেন, "তারাই বলছে মাসে একবার দাম নির্ধারণ করবে, তারাই তাহলে দুইবার কেন করছে?"

তবে বিইআরসি পরিচালক (গ্যাস) মো. হেলাল উদ্দিন তালুকদার বলেছেন, "এলপিজি গ্যাসে দাম নির্ধারণ গণশুনানির মাধ্যমে হয় না। গণশুনানি হয় দেশীয় গ্যাসের ক্ষেত্রে। এলপিজি'র ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ডেটা নিয়ে ইম্পোর্ট দাম দেখা হয়। তারপর নির্ধারণ হয়।"

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের তৎকালীন সহকারী পরিচালক শাহাদত হোসেন ২০২১ সালে বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, গণ শুনানি এবং দাম সমন্বয়ের বিষয়টি একটু ভিন্ন।

প্রতিমাসেই এলপিজির দাম সমন্বয় করা হয়। আর গণশুনানি হয় বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে।

প্রতিমাসে দাম সমন্বয়ের বিষয়ে মি. হোসেন বলেছিলেন, এলপিজি এমন একটি পণ্য যেটি বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। আর এ কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম উঠা-নামা করলে সে হিসেবে বাংলাদেশেও পণ্যটির দাম সমন্বয় করা হয়। এটি বিইআরসি করে থাকে।

আর গণশুনানিতে এলপিজির মজুদ ও বোতলজাতকরণের সাথে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স রয়েছে এমন ব্যবসায়ী এবং ভোক্তাদের প্রতিনিধিরা থাকেন।

সেখানে দুই পক্ষের যুক্তি ও পাল্টা যুক্তি-দুটোই আমলে নিয়ে মাঝামাঝি একটি দাম নির্ধারণ করা হয়। এই কাজটিও করে থাকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন।

এর মধ্যে এলপিজির দাম বৃদ্ধি নয়, বরং বেসরকারি এলপিজির মজুদ ও বোতলজাত করার চার্জ, পরিবহন খরচ, বিতরণ খরচ, রিটেইলার চার্জ ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে দাম নির্ধারণ করা হয়।

এলপিজির দাম কোথায় গিয়ে থামবে?

এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, এলপিজির এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা কোথায় গিয়ে থামবে এবং এরপর নতুন করে যে এলপিজি আমদানি করা হবে, সেগুলোর দামও কি আরও বাড়বে?

এ বিষয়ে বিইআরসি পরিচালক (গ্যাস) মো. হেলাল উদ্দিন তালুকদার বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এরপর যেগুলা আসবে, সেগুলোর দাম যুদ্ধের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। পরিস্থিতি খারাপ হলে বাড়তেও পারে। দোসরা মে আবার দাম সম্বয়ন করা হবে।"

বিইআরসি থেকে জানা যায়, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বা জটিলতা থাকায় ইরান বা রাশিয়া থেকে এলপিজি আমদানি করে না বাংলাদেশ। মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে সৌদি আরব ও কাতার থেকে এলপিজি গ্যাস আমদানি করা হয় বাংলাদেশে। কিন্তু ইরানি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের অনেকগুলো প্লান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা মেরামতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হতে পারে।

"তাই, এলপিজি'র সমস্যা সামনে আরও বাড়বে। এখন তো তাও পাওয়া যাচ্ছে। আমরা চাই, যে করেই হোক দেশে মাল আসুক," বলছিলেন মি. তালুকদার।

উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশে বছরে এলপিজির চাহিদা প্রায় ২০ মিলয়ন টন।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বিবিসি বাংলাকে বলেন, এলপিজির বাজার এখন কোন পর্যায়ে আছে তা পরিসংখ্যানগত বলা না গেলেও এটি স্পষ্ট যে অন্য যেকোনো জ্বালানির তুলনায় এলপিজির বাজার ব্যাপক।

"গ্যাসের ক্ষেত্রে এটি সিএনজি'র বিকল্প হয়ে উঠেছে। পরিবহনে পেট্রোল-ডিজেলের বিকল্প হয়েছে। এখন এলপিজি যদি নিয়ন্ত্রিত দামে থাকে, তাহলে বাজার দ্রুত সম্প্রসারণ হতে পারে এবং অর্থনীতিতে জ্বালানি তেলের যে ভূমিকা, সেখানে এলপিজি চলে আসতে পারে," বলেন মি. শামসুল আলম।