হরমুজ প্রণালি: বিকল্প কোনো রুট কি উপসাগরীয় তেল ও গ্যাসের সরবরাহ সচল রাখতে পারবে?

আরব উপদ্বীপের একটি মানচিত্রের সামনে সমুদ্রে থাকা দুটি তেলবাহী ট্যাংকারের সমন্বয়ে তৈরি গ্রাফিক। মানচিত্রের ওপর সাদা রেখা দিয়ে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাবশান-ফুজাইরাহ পাইপলাইনের রুট দেখানো হয়েছে, যা হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ডান পাশে সামনে একটি বড় ট্যাংকার এবং বাম পাশে দূরে একটি ছোট ট্যাংকার দেখা যাচ্ছে। মানচিত্রে পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরের আশপাশের দেশ ও উপকূলরেখা দেখানো হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিকল্প রুট থাকলেও বৈশ্বিক সমুদ্রপথে তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বহনকারী হরমুজ প্রণালির সঙ্গে কোনো রুট বর্তমানে পাল্লা দিতে পারে না
    • Author, লুইস বারুচো
    • Role, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
  • Published
  • পড়ার সময়: ৭ মিনিট

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি আবারও বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।

স্থায়ীভাবে সংঘাত অবসানের পথ সুগম করার উদ্দেশ্যে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি সইয়ের মাত্র এক মাস পরই দুই দেশ আবারও একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করেছে।

নতুন করে উত্তেজনা বাড়ায় তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে।

যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে উপসাগরীয় রপ্তানিকারকরা তাদের তেল ও গ্যাস বাজারে পৌঁছাতে কি বিকল্প রুট ব্যবহার করতে পারবেন?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে, তবে বর্তমানে এর কোনোটিই এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হতে পারবে না।

মাথা ঢেকে রাখা দুইজন নারী একটি দেয়ালচিত্রের সামনে ফুটপাথে হাঁটছেন। দেয়ালচিত্রে ইরানের পতাকা, অলংকৃত ক্যালিগ্রাফি এবং একটি বড় প্রতিকৃতি রয়েছে। একজন কালো ঢিলেঢালা পোশাক পরেছেন, অন্যজন গাঢ় নীল কোট পরে একটি ব্যাকপ্যাক বহন করছেন।

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান, হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দিতে নারাজ ইরান, প্রতীকী ছবি

হরমুজ কেন গুরুত্বপূর্ণ

ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি এখনো উপসাগরীয় অঞ্চলে উৎপাদিত তেল ও গ্যাসের বড় অংশের প্রধান রপ্তানি পথ। এর কারণ এই রুটের ব্যাপক সক্ষমতা, নমনীয়তা এবং ব্যয়-সাশ্রয়ী বৈশিষ্ট্য।

পাইপলাইন নেটওয়ার্কে যেখানে অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়, সেই তুলনায় ট্যাংকারের মাধ্যমে কম খরচে বেশি পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা যায়।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য এই প্রণালি অতিক্রম করে, যা বৈশ্বিক সমুদ্রপথে তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

এই চালানের প্রায় ৮০ শতাংশের গন্তব্য এশিয়া।

বিশ্বের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশও এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।

এলএনজির ক্ষেত্রে হরমুজের ওপর নির্ভরতা আরও বেশি।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক কাতার আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে এই রুটের ওপর নির্ভরশীল এবং বর্তমানে তাদের এলএনজি রপ্তানির জন্য বড় আকারের কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই।

বিদ্যমান বিকল্প পথ

“হরমুজ প্রণালিকে এড়িয়ে যাওয়া প্রধান পাইপলাইন” শিরোনামের আরব উপদ্বীপের মানচিত্র। এতে হরমুজ প্রণালিকে এড়িয়ে যাওয়া প্রধান তেল পাইপলাইনগুলো দেখানো হয়েছে। মানচিত্রে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন, যা দেশটির ওপর দিয়ে লোহিত সাগর পর্যন্ত গেছে, এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাবশান-ফুজাইরাহ পাইপলাইন, যা ওমান উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত, প্রদর্শিত হয়েছে। মানচিত্রে হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি, ভারত মহাসাগর ও সুয়েজ খালও চিহ্নিত রয়েছে। প্রদর্শিত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও ইয়েমেন।
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

হরমুজ প্রণালি ইরানকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয় বলে উপসাগরীয় উৎপাদকরা দীর্ঘদিন ধরে এমন অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করছে, যার মাধ্যমে এই জলপথ ব্যবহার না করেও তেল পরিবহন করা যায়।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট বা পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন, যা পেট্রোলাইন নামে পরিচিত। এক হাজার ২০০ কিলোমিটার (৭৫০ মাইল) দীর্ঘ এই নেটওয়ার্ক দেশটির পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্রকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু রপ্তানি টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় এটি নির্মিত হয়, যখন উভয় দেশ উপসাগরে তেলবাহী ট্যাংকার ও অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাত।

২০১৯ সালে জরুরি ব্যবহারের জন্য পাইপলাইনটির সক্ষমতা দৈনিক ৭০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করা হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতও ৪০৬ কিলোমিটার (২৫২ মাইল) দীর্ঘ আবুধাবি ক্রুড অয়েল পাইপলাইন (এডকপ)-এর মাধ্যমে নিজস্ব বিকল্প রুট তৈরি করেছে। এটি আবুধাবির হাবশান তেলক্ষেত্রকে ওমান উপসাগরের ফুজাইরাহ বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করেছে, ফলে রপ্তানি পুরোপুরি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে যেতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে ফাইন্যানশিয়াল টাইমস বলছে, দুবাইভিত্তিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড ফুজাইরাহতে একটি নতুন বহুমুখী বন্দর এবং বিদ্যমান বন্দরে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়ে আলোচনা করছে।

এই প্রকল্পগুলোর লক্ষ্য দুবাইয়ের প্রধান কেন্দ্র জেবেল আলির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং হরমুজ প্রণালির বাইরে নৌপথে প্রবেশাধিকার বাড়ানো।

তবে এক্ষেত্রে প্রধান সীমাবদ্ধতা হচ্ছে সক্ষমতা। বিকল্প ব্যবস্থা থাকলেও আইইএ-এর হিসাব অনুযায়ী এগুলো দৈনিক মাত্র ৩৫ লাখ থেকে ৫৫ লাখ ব্যারেল তেল অন্যদিকে সরিয়ে নিতে পারে, যা সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া দৈনিক প্রায় দুই কোটি ব্যারেলের তুলনায় অনেক কম।

কিংস কলেজ লন্ডনের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডেভিড বি. রবার্টস সাম্প্রতিক এক প্রবন্ধে লিখেছেন, "এটিও এখনো যথেষ্ট নয়"।

যেসব ক্ষেত্রে বিকল্প পথ রয়েছে, সেখানেও বাস্তব সীমাবদ্ধতা এর কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।

রবার্টসের মতে, ইয়ানবুর লোডিং টার্মিনালগুলো কখনও "এত দ্রুত এত বেশি তেল" পরিচালনার জন্য নকশা করা হয়নি।

দুই রুটই হামলার শিকার হয়েছে।

মার্চ মাসে ইরানের বিরুদ্ধে ফুজাইরাহর স্থাপনায় হামলার অভিযোগ তোলে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যে হামলার ফলে সংরক্ষণ ট্যাংকে আগুন লেগে যায় এবং লোডিং কার্যক্রম স্থগিত করতে হয়।

এপ্রিল মাসে পেট্রোলাইনের একটি পাম্পিং স্টেশনে একই ধরনের হামলায় দৈনিক সাত লাখ ব্যারেল পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। যদিও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকো তিন দিনের মধ্যে পাইপলাইনটি পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনে।

ইরানও হরমুজ এড়িয়ে যাওয়ার নিজস্ব রুট তৈরি করেছে। উপসাগরের মাথায় অবস্থিত গোরেহ থেকে ওমান উপসাগরের জাস্ক রপ্তানি টার্মিনাল পর্যন্ত এক হাজার কিলোমিটার (৬২০ মাইল) দীর্ঘ একটি পাইপলাইন নির্মাণ করেছে।

দৈনিক সর্বোচ্চ ১০ লাখ ব্যারেল পরিবহনের জন্য পরিকল্পিত এই পাইপলাইন ইরানি তেলকে হরমুজ প্রণালি ছাড়াই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ দেয়।

তবে বাস্তবে নিষেধাজ্ঞা এবং অসম্পূর্ণ টার্মিনাল অবকাঠামোর কারণে এর ব্যবহার পরিকল্পিত সক্ষমতার অনেক নিচে রয়েছে।

রাতের আঁধারে বন্দরের তীরজুড়ে আগুন জ্বলছে। উজ্জ্বল কমলা শিখা ও ঘন কালো ধোঁয়া উপকূলের বিভিন্ন স্থান থেকে উঠছে এবং পানিতে প্রতিফলিত হচ্ছে। আগুনের কাছে কয়েকটি নৌকা দেখা যাচ্ছে, আর সামনে বৃত্তাকার সামুদ্রিক কাঠামো ও পাথর রয়েছে।

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, জুলাইয়ের শুরুর দিকে ইরানের কুহেস্তাকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওচিত্রে হরমুজ প্রণালির কাছে একটি বন্দরে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়

ভবিষ্যৎ রপ্তানি রুট

হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে নতুন রপ্তানি রুটও বিবেচনা করা হচ্ছে।

এর একটি হলো ৬০০ মাইল (৯৭০ কিলোমিটার) দীর্ঘ কিরকুক-জেইহান পাইপলাইন, যা উত্তর ইরাকের কিরকুক অঞ্চল থেকে তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর চেইহানে তেল পরিবহন করে।

দুই বছর ছয় মাস বন্ধ থাকার পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাইপলাইনটি পুনরায় চালু হয়।

২০২৬ সালের মার্চ নাগাদ এর পরিবহন দৈনিক প্রায় আড়াই লাখ ব্যারেলে পৌঁছায়, যা ইরাককে একটি বিকল্প রপ্তানি পথ দেয়, যদিও দেশের মোট রপ্তানির তুলনায় এটি এখনো কম।

ইরাক প্রতিদিন প্রায় ৩৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে, যার প্রায় ৯৫ শতাংশ দক্ষিণাঞ্চলের বসরা বন্দর দিয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে যায়।

আরেকটি সম্ভাবনা হলো কিরকুক-বানিয়াস পাইপলাইন পুনরুজ্জীবিত করা, যা ইরাকি তেলকে উপসাগর এড়িয়ে সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে পৌঁছাতে সক্ষম করবে।

প্রায় ৫০০ মাইল (৮০০ কিলোমিটার) দীর্ঘ এই পাইপলাইন নির্মাণ ১৯৫২ সালে সম্পন্ন হয়েছিল, কিন্তু ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তা বন্ধ হয়ে যায়।

সাম্প্রতিক গণমাধ্যম প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে আঞ্চলিক রপ্তানি পথ বৈচিত্র্যময় করার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে ইরাক, সিরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র এটি পুনর্নির্মাণের বিষয়ে আলোচনা করেছে।

আরও উচ্চাভিলাষী প্রস্তাবগুলোর মধ্যে একটি হলো ফোর সিজ প্রজেক্ট, যা সিরিয়া ও তুরস্কের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগর, কৃষ্ণ সাগর, কাস্পিয়ান সাগর ও আরব উপসাগরকে যুক্ত করার জন্য প্রস্তাবিত পরিবহন ও জ্বালানি নেটওয়ার্ক।

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে তুরস্কের জ্বালানিমন্ত্রী আলপারস্লান বায়রাকতার আরব উপদ্বীপ হয়ে কাতার ও তুরস্ককে সংযুক্ত করার জন্য ২০০৯ সালে প্রস্তাবিত গ্যাস পাইপলাইনের পুনরুজ্জীবিত করার কথা বলেন, যা বৃহত্তর ওই উদ্যোগের অংশ হতে পারে। প্রস্তাবটি দীর্ঘদিন স্থগিত ছিল।

এ ছাড়া বসরা-আকাবা পাইপলাইনের দাবিও আবার জোরালো হয়েছে। ১৯৮৩ সালে প্রথম প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল ইরাকি তেলকে জর্ডানের লোহিত সাগরীয় বন্দর আকাবায় পৌঁছে দেওয়া।

তবে রাজনৈতিক বিরোধ ও অর্থায়ন-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ বারবার এর উন্নয়ন বিলম্বিত করেছে।

সমর্থকদের মতে, এসব উদ্যোগ উপসাগরীয় অঞ্চলের বিঘ্নের ঝুঁকি কমাবে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহের ওপর ইরানের প্রভাবও হ্রাস করবে।

তবে সিঙ্গাপুরের এস. রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হুজেইর ইজেকিয়েল জুলহিশাম সাম্প্রতিক এক গবেষণাপত্রে সতর্ক করেছেন যে এসব প্রকল্প নতুন ধরনের নির্ভরতা তৈরি করতে পারে।

তিনি লিখেছেন, "এই রুটগুলো এমন রাষ্ট্রগুলোর হাতে জ্বালানি বাণিজ্যের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ দেবে, যারা নিজেরা জ্বালানি উৎপাদক নয় কিন্তু ট্রানজিট রাষ্ট্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।"

তার মতে, এর ফলে তুরস্কের মতো দেশগুলো আরও বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে।

নিরাপত্তাও একটি বড় বাধা হয়ে রয়ে গেছে।

জুলহিশামের মতে, ইরাক বা সিরিয়া অতিক্রমকারী যেকোনো রুট আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা, সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলার ঝুঁকির মুখে থাকবে।

হরমুজের ওপারে

কুয়াশাচ্ছন্ন দিনে উপকূলের পানিতে মানুষ সাঁতার কাটছে ও দাঁড়িয়ে রয়েছে, আর সামনে সমুদ্রের দিকে মালবাহী জাহাজ ও ট্যাংকার নোঙর করা আছে।

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংকীর্ণ নৌপরিবহন পথ

উপসাগরীয় রপ্তানিকারকরা হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমালেও ওই অঞ্চলে জ্বালানি পরিবহনের বিকল্প পথগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

এর একটি উদাহরণ হলো মিসরের সুমেদ পাইপলাইন, যা লোহিত সাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং সুয়েজ খাল এড়িয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর একটি পথ তৈরি করেছে।

এই পাইপলাইন প্রতিদিন ২৫ লাখ থেকে ২৮ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করতে পারে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুথিদের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বৃহত্তর সুয়েজ করিডরের দুর্বলতা তুলে ধরেছে।

সংঘাত শুরুর পর সুমেদ পাইপলাইনে তেলের প্রবাহ বেড়েছে, কিন্তু এর তুলনামূলক সীমিত সক্ষমতা এখনো "ইউরোপীয় সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা"- রবার্টসের ভাষ্য।

বুধবার ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস জানায়, যুক্তরাষ্ট্র তাদের "আগ্রাসী কর্মকাণ্ড" বন্ধ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।

তারা অঞ্চলজুড়ে অন্যান্য তেল ও গ্যাস রপ্তানি পথেও বিঘ্ন ঘটানোর হুমকি দিয়েছে।

হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমবে?

যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট (রুসি)-এর মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ড. এইচ. এ. হেলিয়ার বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো ক্রমশ হরমুজের ওপর তাদের নির্ভরতা কমাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

"উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালির ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা যতটা সম্ভব কমানোর চেষ্টা করবে।"

হেলিয়ারের ধারণা, অতীতের মতো আর হরমুজের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা সম্ভব নয় বলে আঞ্চলিক সরকারগুলো বিকল্প রপ্তানি রুট উন্নয়নের কাজ চালিয়ে যাবে।

তবে তিনি মনে করেন না যে এসব বিকল্প একেবারে হরমুজের জায়গা নিয়ে নেবে।

"একটি রুটের জায়গায় আরেকটি রুটের সরল প্রতিস্থাপন হবে না।"

তবুও হেলিয়ারের বিশ্বাস, দেশগুলো যখনই সম্ভব বিকল্প পথ বেছে নিয়ে কোনো একক আঞ্চলিক শক্তির ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইবে, তখন হরমুজ প্রণালি "অত বেশি মূল্যবান নয়, বরং অনেক কম মূল্যবান" হয়ে উঠবে।

"অঞ্চলটি ইসরায়েলের প্রাধান্য চায় না, তবে ইরানের আধিপত্যেও আগ্রহী নয়।"