সাগরে নিখোঁজ ৫০০ জনের বেশি রোহিঙ্গা- কী ঘটেছে?

ইন্দোনেশিয়ার আচেহ উপকূলের কাছে রোহিঙ্গাদের বহনকারী নৌকার ফাইল ছবি

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইন্দোনেশিয়ার আচেহ উপকূলের কাছে রোহিঙ্গাদের বহনকারী নৌকার ফাইল ছবি
    • Author, জনাথন হেড
    • Role, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সংবাদদাতা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

আনুমানিক ৫৩০ জন রোহিঙ্গা আশ্রয়প্রার্থীকে বহনকারী দুটি নৌকা গত ২৯শে জুন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে যাত্রা করে এবং এরপর থেকে তাদের সম্পর্কে আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। যাত্রীভর্তি একটি জ্যাম্বো জেট বিমানের সমপরিমাণ মানুষ যেন উধাও হয়ে গেছে।

খুব সম্ভবত দুটি নৌকাই ডুবে গেছে। মৌসুমি বৃষ্টি শুরু হয়েছে, সমুদ্র উত্তাল। আর পুরনো মাছ ধরার ট্রলারগুলোকে পাল্টে মানুষ বহনকারী এমন নৌকায় পরিণত করা হয়েছে যেগুলো এত বেশি আরোহী ধারণ করতে পারে না, সেগুলো কোনোভাবেই সমুদ্রযাত্রার উপযোগী নয় এবং এগুলোর ইঞ্জিনও অনির্ভরযোগ্য।

এটিও খুবই সম্ভব যে জীবিত উদ্ধার হওয়া মানুষের সংখ্যা খুব কম ছিল, অথবা কেউই বেঁচে নেই।

তাদের প্রায় অর্ধেকই নারী ও শিশু হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু আমরা নিশ্চিতভাবে কখনোই তদের বিষয়ে তথ্য জানতে পারব না।

রাখাইন বহু বছর ধরে যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। বিদ্রোহী আরাকান আর্মি মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা থেকে হটিয়ে দিয়েছে এবং রাজ্যের রাজধানী সিতওয়ের সেনাবাহিনীর শেষ ঘাঁটিটি অবরুদ্ধ করে রেখেছে, যেখানে এখন কেবল আকাশপথ ও সমুদ্রপথে পৌঁছানো সম্ভব। প্রায় সব ধরনের টেলিযোগাযোগ সেনাবাহিনী বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।

রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতির উন্নতির জন্য কাজ করা আরাকান প্রজেক্টের প্রধান ক্রিস লেওয়া দুটি নৌকার কী ঘটে থাকতে পারে, তা বোঝার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এটি অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ।

সিতওয়ে কিংবা আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত সিন তেত মাও গ্রামে, যেখান থেকে নৌকাগুলো যাত্রা করেছিল, সেখানে এখন তার যোগাযোগ করা যায় এমন কোনো সূত্র নেই।

তবে অন্যান্য যোগাযোগসূত্র এবং বিচ্ছিন্ন তথ্যের সংমিশ্রণে তিনি নিশ্চিত যে দুটি নৌকাই ২৯শে জুন রওনা হয়েছিল, একটি সকালে এবং অন্যটি দিনের পরের দিকে।

একটি নৌকায় রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশুরা বসে ও দাঁড়িয়ে আছে

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, রোহিঙ্গাদের বহনকারী অনেক নৌকাই একসময় ইন্দোনেশিয়ার আচেহ-এর দিকে যেত, পুরোনো ছবি
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

তার মতে, নৌকাগুলো মিয়ানমারের দক্ষিণ উপকূলের দিকে যাচ্ছিল, যেখানে তারা তাদের মানবপাচারের শিকার যাত্রীদের নামিয়ে দিত।

সেখান থেকে বনাঞ্চলের অস্থায়ী ট্রানজিট ক্যাম্প হয়ে সড়কপথে তাদের হয়তো থাইল্যান্ডের মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়া সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হতো।

এধরনের সমুদ্রযাত্রায় যারা যায়, সাধারণত তাদের পরিবার এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিনের মধ্যে তাদের কাছ থেকে খবর পাওয়ার আশা করে। কিন্তু এবার প্রায় তিন সপ্তাহ পরও তারা কোনো খবর পায়নি।

বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ সমুদ্র থেকে ভেসে আসা একজন নারীর মরদেহ উদ্ধার করেছে।

ইরাবতী বদ্বীপ ও মন রাজ্যের উপকূলের মাঝামাঝি সমুদ্রে মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত জেলেরা নয় দিন পরে আরও কয়েকটি মরদেহ দেখতে পান।

ক্রিস লেওয়ার বিশ্বাস, এসব তথ্য থেকে বোঝা যায় যে দুটি নৌকাই ডুবে গেছে। একটি সিন তেত মাও ত্যাগের কয়েক ঘণ্টা পর এবং অন্যটি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে কয়েক দিন যাত্রার পর।

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত জনাকীর্ণ শিবিরগুলোতে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাস করছে। সেখানে সহায়তা কমে যাচ্ছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রগুলো অবাধে সক্রিয়। তাদের শিবির ছেড়ে যাওয়ারও অনুমতি নেই।

আনুমানিক ছয় লাখ রোহিঙ্গা এখনো রাখাইন রাজ্যে রয়ে গেছে। তাদের এক-চতুর্থাংশ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত দুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তিদের (আইডিপি) শিবিরে সীমাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। আর বাকিরা বিরোধে লিপ্ত দুই পক্ষের মাঝখানে অনিশ্চিত সম্প্রদায় হিসেবে আটকে পড়াদের মধ্যে টিকে থাকার চেষ্টা করছে।

সামরিক জান্তা তাদের বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করছে।

নাফ নদীতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের টহলের ফাইল ছবি। নদীর অন্য তীরে পাহারের ওপার থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মিয়ানমারের রাখাইনে ২০১৭ সালে সহিংসতা বাড়ার পর বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার জন্য রোহিঙ্গারা দলে দলে রওনা হয়েছিল; নাফ নদীতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের টহলের ফাইল ছবি

আরাকান আর্মি, যাদের সমর্থনের ভিত্তি জাতিগত রাখাইন জনগোষ্ঠী, তারা রোহিঙ্গাদের প্রতি অবিশ্বাস পোষণ করে এবং তাদের বিরুদ্ধে (আরাকার আর্মি) গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।

এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের একমাত্র আশা হলো অন্য কোনো দেশে চলে যাওয়া।

ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ায় বসবাসরত দুই লাখ রোহিঙ্গার উপস্থিতি দেশটিকে তাদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করেছে।

এটি মানবপাচারকারীদের জন্য একটি লাভজনক ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করেছে, যাদের নেটওয়ার্ক এখন বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া জুড়ে বিস্তৃত।

এই ব্যবসার ধরন খুবই সরল– নৌকায় যত বেশি সম্ভব মানুষ তোলা, কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে তাদের মালয়েশিয়ায় নেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় খুঁজে বের করা এবং তাদের পরিবারের কাছ থেকে তিন হাজার ডলার সমপরিমাণ ফি আদায় নিশ্চিত করা।

যাদের পরিবার অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়, তাদের আটক করে মারধর করা হয়, অথবা আরও খারাপ আচরণ করা হয়। তাদের কষ্টের ভিডিও আত্মীয়স্বজনদের কাছে পাঠানো হয় যাতে তারা নির্ধারিত অর্থ পরিশোধে বাধ্য হন।

বছরের পর বছর মানবপাচারের পথ পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু অবৈধ এই বাণিজ্যের নিষ্ঠুরতা বদলায়নি।

২০১৫ সালে মানবপাচার নিয়ে নিজেদের দুর্নামের জন্য বিব্রত থাইল্যান্ড সরকার পাচারকারীদের ব্যবহৃত সড়কপথগুলো বন্ধ করতে শুরু করে এবং ম্যানগ্রোভ জলাভূমি ও রাবার বাগানে থাকা আদিম ট্রানজিট ক্যাম্পগুলো বন্ধ করে দেয়, যেখানে পর্যাপ্ত অর্থ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত পাচারকারীরা তাদের বন্দিদের আটকে রাখত।

এসব ক্যাম্পে গণকবরের সন্ধান পাওয়ার বিষয়টি থাই কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়।

সেই বছর মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে দক্ষিণমুখী বহু নৌকা থাইল্যান্ডের পরিবর্তে ইন্দোনেশিয়ার আচেহর দিকে চলে যায়, যেখানে জেলে সম্প্রদায়গুলো শুরুতে নিপীড়িত মুসলিম হিসেবে এসব রোহিঙ্গাকে স্বাগত জানিয়েছিল।

তবে সেই স্বাগত জানানোর পরিস্থিতি এখন আর নেই এবং ইন্দোনেশিয়ায় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু বৈরী প্রচারণাও দেখা গেছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ঘরগুলো দেখা যাচ্ছে। মাঝখানে একটি গাছ ও দূরে পাহাড়

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের কক্সবাজারে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে

সমুদ্রপথে সরাসরি মালয়েশিয়ায় পৌঁছানো এখনো রোহিঙ্গাদের জন্য খুবই কঠিন।

মালয়েশিয়ার নৌবাহিনী তাদের আটক করতে দক্ষ এবং তাদের আবার উন্মুক্ত সমুদ্রে ঠেলে পাঠায়। স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ও তাদের সহায়তা করে না।

লেওয়ার মতে, পাচারকারীরা আবারও থাইল্যান্ডকে প্রধান ট্রানজিট পথ হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছে।

বড় আকারের 'মাদার শিপ' রাখাইন উপকূল বা বাংলাদেশের টেকনাফ উপকূলের কাছে রোহিঙ্গাদের তুলে নেয় এবং দুই দেশের কর্তৃপক্ষের নজর এড়াতে সেখানে বেশিক্ষণ অবস্থান করে না।

বর্তমানে তারা স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহার করে এবং থাইল্যান্ড বা ইন্দোনেশিয়ার পাচারকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে স্থানীয় জেলেদের অর্থ দেয়, যাতে তারা রোহিঙ্গাদের দক্ষিণ থাইল্যান্ড বা পূর্ব সুমাত্রার সৈকতে নিয়ে যায়। সেখান থেকে পূর্ণ অর্থ পরিশোধের পর তাদের গোপনে মালয়েশিয়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়।

কিছু মানুষকে মিয়ানমারের দক্ষিণ উপকূলে নামিয়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে তাদের স্থলসীমান্ত পার করে থাইল্যান্ডে নেওয়া হয় এবং এরপর সড়কপথে মালয়েশিয়া সীমান্তে পৌঁছে দেওয়া হয়।

তবে রাখাইন থেকে মিয়ানমারের বাকি অংশে যাওয়ার সব স্থলপথ বন্ধ থাকায় তাদের পালিয়ে যাওয়া সবসময়ই একটি ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হয়।

ক্রিস লেওয়ার বিশ্বাস, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে অন্তত ১০ হাজার রোহিঙ্গা নৌকায় করে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ ছেড়েছে।

এটি আগের বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যা প্রায় নিশ্চিতভাবে রাখাইন ও বাংলাদেশে তাদের অসহনীয় জীবনযাপনের অবস্থার ফল।

জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ প্রস্থানপথ তৈরির আহ্বান জানিয়েছে।

কিন্তু এই অঞ্চলের কোনো দেশই তাদের নিতে চায় না এবং এখন পর্যন্ত কোনো সরকার তাদের যাত্রা সহজ করতে আগ্রহ দেখায়নি।