ইউক্রেনের অস্ত্রভাণ্ডারে রুশ ড্রোন হামলায় নিহত অন্তত ৩৭ জন

কালো ও হলুদ পোশাক পরা ইউক্রেনীয় অগ্নিনির্বাপকদের একটি বিস্তৃত দৃশ্য, যেখানে তারা ড্রোন হামলার পর সম্ভবত একটি গুদামের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠতে থাকা আগুন পর্যবেক্ষণ করছেন।

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, রাজধানীর পশ্চিমে অবস্থিত গুদামটিতে গোলাবারুদ সংরক্ষণ করা হচ্ছিল কী-না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
    • Author, ড্যান জনসন
    • Reporting from, মাইলা
    • Author, রোরি বোসোত্তি
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের উপকণ্ঠে একটি অস্ত্র ও গোলাবারুদের ডিপোতে রাশিয়ার ড্রোন হামলায় অন্তত ৩৭ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় প্রায় ৪০০ জনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার গভীর রাতে একটি আবাসিক এলাকার কাছে অবস্থিত ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর অস্ত্রাগারে ওই হামলায় গোলা, মাইন ও ড্রোনে বিস্ফোরণ ঘটে।

এর ফলে সৃষ্ট বিস্ফোরণে আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি পরিচর্যা কেন্দ্রও রয়েছে বলে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, অস্ত্র সংরক্ষণের এই স্থাপনাটি নিশ্চয়ই সেখানে থাকা উচিত ছিল না। বিস্ফোরক মানুষের বসবাসের একেবারে পাশে সংরক্ষণ করার ঘটনায় 'ভয়াবহ অবহেলার' অভিযোগ তদন্তে একটি তদন্ত শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

গত কয়েক মাসের মধ্যে কিয়েভের কাছে কোনো অস্ত্রভাণ্ডারে এটি দ্বিতীয় হামলা। এ ঘটনায় নতুন করে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

আঞ্চলিক প্রধান তিমুর তাকাচেঙ্কোর তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার রাতের বিস্ফোরণে আহত ৪২ জনের মধ্যে চারজন শিশু রয়েছে। শনিবার বুচা জেলায় ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান চলছিল।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, তাদের বাহিনী ইউক্রেনের রাজধানীর পশ্চিমে অবস্থিত মিলা গ্রামে "একটি গোলাবারুদ গুদাম" লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, যেখানে "এফপি-১/এফপি-২ দূরপাল্লার মানববিহীন আকাশযানের উপাদান ও উৎক্ষেপণ বুস্টার" রাখা ছিল।

আঞ্চলিক প্রধান তিমুর তাকাচেঙ্কোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার রাতের বিস্ফোরণে আহত ৪২ জনের মধ্যে চারজন শিশু। শনিবারও বুচা জেলায় ওই স্থানে উদ্ধার অভিযান চলছিল। বিস্ফোরণে গ্রামটির প্রায় ১৩০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

"সবকিছু পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে," ৪৫ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা লিউবোভ পাভলেনকো বিবিসিকে বলেন। তিনি গোলাবারুদ গুদাম থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে নিজের বাড়ি পরিদর্শন করছিলেন।

ভলোদিমির জেলেনস্কি

ছবির উৎস, Getty Images

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

তিনি বলেন, "চারপাশজুড়ে ফাটল ধরেছে, জানালার চারপাশেও ফাটল রয়েছে। মূলত ভবনের কাঠামোগত কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।"

"আমি এখনও কেমন যেন স্তব্ধ হয়ে আছি। জানি না… জানি না আমার যখন একটু হুঁশ ফিরবে, সম্ভবত আমার আরও বড় ধরনের মানসিক বিপর্যয় ঘটতে পারে"।

জেলেনস্কি বলেছেন, গ্রামে বিস্ফোরক মজুত করার সিদ্ধান্তটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। তিনি আরও জানান, "সরকারি অবহেলার অভিযোগে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে।"

এর আগে ইউক্রেনের অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় জানিয়েছিল যে, তারা মাইলার আবাসিক ভবনগুলোর কাছে "বিস্ফোরক বস্তু ও উপকরণ স্থাপন এবং মজুদের বৈধতা" পর্যালোচনা করছে।

এতে বলা হয়, "যেসব কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছেন", তাদের কর্মকাণ্ডও তদন্ত করা হবে।

তবে জেলেনস্কি এর আগে বলেছিলেন যে, "নিয়ম রয়েছে - বাড়ি বা অন্যান্য আবাসিক এলাকার কাছে গোলাবারুদ মজুত করা যাবে না"

তিনি আরও বলেন, "এ নিয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত অবশ্যই নেওয়া হবে।"

তিনি জুলাই মাসে ভিশনেভে একটি গোলাবারুদ গুদামে হামলার প্রসঙ্গ টানেন। ওই হামলায় পরবর্তী বিস্ফোরণে নয়জন নিহত, আরও কয়েক ডজন আহত এবং ২৮০টির বেশি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

শুক্রবার রাতের বিস্ফোরণের পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, কেন মানুষের বাড়িঘরের এত কাছে গোলাবারুদ সংরক্ষণ করা হচ্ছিল, বিশেষ করে যখন রাশিয়া বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

২০২২ সাল থেকে ইউক্রেনে যুদ্ধ চলছে

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, ২০২২ সাল থেকে ইউক্রেনে যুদ্ধ চলছে

৬১ বছর বয়সী বোরিস দানিয়িলুক বলেন, "কর্তৃপক্ষ.. মানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সেই অনুমোদন কেন দিল?

"একটি জনবহুল গ্রামের পাশে সেখানে গোলাবারুদ ও অস্ত্রশস্ত্র কেন মজুত করা হয়েছিল? এর জন্য কোনো ভাষা নেই", যোগ করেন তিনি।

ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী সের্গেই কোরেতস্কি দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, ভিশনেভেতে বিস্ফোরণের পরও 'শিক্ষা' নেওয়া হয়নি।

ওই ঘটনার তদন্তে একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের গুরুতর গাফিলতি ধরা পড়ে। প্রতিষ্ঠানটি আবাসিক ভবনের কাছে বিস্ফোরক সংরক্ষণের বিষয়ে নির্ধারিত নিয়মকানুন মেনে চলেনি।

জেলেনস্কি ইঙ্গিত দিয়েছেন, মাইলা গ্রামের ওই অস্ত্রভাণ্ডারটি ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী পরিচালনা করত।

কোরেতস্কি টেলিগ্রামে লিখেছেন, "পূর্ণমাত্রার রুশ আগ্রাসনের পঞ্চম বছরে একই ভুল বারবার করা অপরাধমূলক অবহেলা।"

তিনি আরও বলেন, "দায়ী প্রত্যেককে, ব্যতিক্রম ছাড়া, কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে, যেন এমন পরিস্থিতি আর কখনও না ঘটে।"

এদিকে তাকাচেঙ্কো বলেন, পৃথক এক হামলায় বোরিসপিল জেলায় ১৪ বছর বয়সী একজন নিহত হয়েছে। কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানান, ওবোলোনস্কি এলাকায় একটি রুশ ড্রোন বিধ্বস্ত হওয়ার পর দুই বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, শনিবার সকালে রাজধানীতে নতুন হামলায় অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৮ বছর বয়সী এক তরুণীও রয়েছে।

স্থানীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দিনে সারা দেশে পাঁচজন নিহত হয়েছেন।

জেলেনস্কি আরও জানান, রাতে ওডেসা, দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক, সুমি ও জাপোরিঝঝিয়ায় হামলা হয়েছে। ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী বলেছে, তারা ২৩৩টি রুশ ড্রোন ভূপাতিত করেছে।

রাশিয়ার হামলায় কিয়েভের একটি স্থাপনায় আগুন জ্বলছে, গত সপ্তাহের ছবি

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, রাশিয়ার হামলায় কিয়েভের একটি স্থাপনায় আগুন জ্বলছে, গত সপ্তাহের ছবি

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়ই তাদের আকাশপথে হামলা জোরদার করেছে। কিয়েভ তাদের অভিযান পরিচালনা করছে মূলত রাশিয়ার অর্থনৈতিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে।

ইউক্রেন কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশটির বৃহত্তম অনলাইন খুচরা বিক্রেতা ওয়াইল্ডবেরিজের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়ে আসছে। ইউক্রেন বলছে, প্রতিষ্ঠানটি সামরিক বাহিনীকে রসদ সরবরাহ করায় এটি একটি বৈধ লক্ষ্যবস্তু। তবে মস্কো এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

রাশিয়ায় স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় বেলগোরোদ ও রোস্তভ অঞ্চলে হামলায় দুইজন নিহত এবং ২৫ জন আহত হয়েছেন।

দখলকৃত ইউক্রেনীয় অঞ্চল জাপোরিঝঝিয়ার মস্কো-নিযুক্ত গভর্নর বলেন, একটি ইউক্রেনীয় হামলায় একটি শপিং সেন্টারে আঘাত হানার পর চারজন আহত হয়েছেন।

রুশ অনলাইন খুচরা বিক্রেতা ওজোন জানিয়েছে, রাতের ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় তাদের একটি লজিস্টিকস কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, "এলাকার ঝুঁকির কারণে" তারা আরেকটি লজিস্টিকস কেন্দ্রে কার্যক্রম স্থগিত করেছে এবং কর্মীদের সরিয়ে নিয়েছে।

এই সপ্তাহের শুরুতে ক্রাসনোদার, দাগেস্তান, স্তাভরোপোল ও আদিগেয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন স্থাপনা হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল, যাতে কয়েকজন আহত হন এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।