রংপুরের চাঞ্চল্যকর চার খুন নিয়ে এত সন্দেহ ও অবিশ্বাস কেন?

ছবির উৎস, SHARIER MIM
- Author, জান্নাতুল তানভী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা রংপুর জেলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে পুলিশ ও ময়না তদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্য নিয়ে মানুষের মনে নানা প্রশ্ন, সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই ঘটনার পর পুলিশের দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্য ও তদন্তের নানা সূত্র ও অসঙ্গতি নিয়ে মানুষকে প্রশ্ন তুলতে দেখা গেছে।
এদিকে, পুলিশ বলছে তাদের তদন্তে অগ্রগতি রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে মানুষের মনে এত প্রশ্ন, সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে কেন?
অপরাধবিজ্ঞানী ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধের ঘটনা নিয়ে তাড়াহুড়ো করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কথা বললে মানুষের মাঝে সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়। এটা একটি মনস্তাত্তিক বিষয়।
এছাড়া, নানা ধরনের চাপ ও আইনগত কারণে পুলিশ বাহিনীও বাংলাদেশে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে সত্য উদঘাটনে তাদের সামর্থ্য নিয়েও সন্দেহ পোষণ করেন কেউ কেউ।
ফলে নানা প্রশ্ন উঠতে দেখা যাচ্ছে।
যদিও অপরাধ বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীর উদ্দেশ্য, মোটিভ ও প্রক্রিয়া যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে সময় লাগে, সেজন্য তাড়াহুড়া না করার পরামর্শ দেন তারা।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য সংবাদ

ছবির উৎস, SHARIER MIM
কেন এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে সন্দেহ, প্রশ্ন ও অবিশ্বাস?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
গত শনিবার অর্থাৎ ২২শে অগাস্ট রাতে রংপুরের দাসপাড়া মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে জেলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পরে ওই ঘটনায় মামলা দায়েরের আগেই মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে স্থানীয় দুই ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ দাবি করে, ওই দুই ব্যক্তিই মি. চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, কন্যা ও পুত্রকে একে একে হত্যা করেছে।
পরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
এদিকে, চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে দেখা যায়।
হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়া বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল কী-না, নিহত একজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন কী-না, মাদকাসক্ত দুইজন মানুষ চারজনকে হত্যা করতে পারে কী-না, খুনি সন্দেহে গ্রেফতার ব্যক্তি ও পুলিশ কর্মকর্তার একই রকম শার্ট কেন, আসলেই মাদক গ্রহণে বাধা দেয়ায় হত্যাকাণ্ড নাকি এটি ডাকাতির ঘটনা - এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে নেটিজেনদের নিউজ ফিডে।
এছাড়া, হত্যাকাণ্ডের পরও কেন আসামিরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করছিল, নিহতদের শরীরে বা পোশাকে কিংবা ঘটনাস্থলে আসামিদের ডিএনএ বা আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে কী-না - এমন প্রশ্নও উঠছে।
সেই সাথে, নিহত মি. চক্রবর্তীর মেয়ের চোয়াল ভাঙ্গা ছিল কী-না তা নিয়ে পুলিশ ও ময়না তদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্যের অমিল নিয়েও প্রশ্ন ও সন্দেহের কথা বলছেন কেউ কেউ।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এ ঘটনা নিয়ে এত সন্দেহ ও অবিশ্বাস?
বিশ্লেষকেরা বলছেন, চাঞ্চল্যকর অপরাধের ঘটনা বিশেষত অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের তদন্ত নিয়ে অবিশ্বাস বা সন্দেহ তৈরির ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও নানা সময়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছিল পুলিশের তদন্ত।
এর মধ্যে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলা, কুমিল্লার তনু হত্যা, মেজর সিনহা হত্যা, ফেনীর নুসরাত হত্যা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু বকর সিদ্দিক হত্যা মামলাসহ আরো বেশ কিছু মামলার তদন্ত নানা সময়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বিষয়টি বিভিন্ন সময় পুলিশের পক্ষ থেকে স্বীকারও করা হয়েছে।

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা মনে করছেন, পুলিশের তদন্ত নিয়ে মানুষের মনে অবিশ্বাস ও সন্দেহের অনেক কারণের একটি হচ্ছে, ব্রিটিশ আমলে তৈরি আইনে পুলিশকে তদন্ত সংস্থা হিসেবে খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
বিবিসি বাংলাকে মি. হুদা বলেন, "পুলিশ অ্যাজ অ্যান ইনস্টিটিউশন অর অ্যাজ অ্যান অর্গানাইজেশন, এইটা বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা হয়নি। তো এখন সেখান থেকে রাতারাতি খুব ভালো আচরণ কি করে আশা যাবে?"
এছাড়া, নানা ধরনের চাপের কারণেও পুলিশের তদন্তে প্রভাব পড়ে বলে মনে করেন পুলিশের সাবেক এই মহাপরিদর্শক।
মি. হুদা বলেন, "পুলিশ নিরপেক্ষভাবে এই দেশে কাজ করতে পারে না। আইনগত কতগুলো অসুবিধা রয়ে গেছে এবং প্র্যাকটিসেও (চর্চাতেও)। পুলিশ সরকারের নির্বাহী বিভাগের অংশ। সে কারণে নির্বাহী বিভাগের পার্ট বা অংশ হলে সেখানে অনেক রকম চাপ থাকে। অত প্রেশার যেখানে থাকে, সেখানে তো ভালোভাবে তদন্ত হওয়ার কথা না।"
তবে, অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক সময়ই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের আগেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অনুমান নির্ভর বক্তব্য জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বলছিলেন, "স্পর্শকাতর ইস্যুতে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে একেক অফিসার, একেক এজেন্সি প্রধান একেক ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন। এর ফলে জনগণের মধ্যে বিশাল একটা সংশয় তৈরি হয়ে যায়।"
এর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক সময় ক্রেডিট নেয়ার মানসিকতা থেকে নানা ভুল করে থাকে বলেও মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক।
"আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রথমে অনুমান নির্ভর কথা বললে পরবর্তীতে ঘটনার সত্য উদঘাটন হলেও মানুষের মাঝে অবিশ্বাস থেকেই যায়। পরবর্তীতে আমরা দেখি যে, সত্য উদ্ঘাটন হলেও সে বিষয়টার প্রতি একটা অনাস্থা তৈরি হয়।"
মনে করেন, এমন পরিস্থিতি ভবিষ্যতের জন্য অশনি সংকেত।
"আমি মনে করি এটা জাস্টিসের জন্য, এটা ভবিষ্যতের জন্য একটা অন্ধকার অশনি সংকেত। কারণ জাস্টিস সিস্টেমের ওপর মানুষের যে আস্থা, সেটা রিকভার করা সামনে আসলে কঠিন হয়ে যাবে" বলেন সহকারী অধ্যাপক করিম।
ঘটনার পর ফরেনসিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ঘটনার সত্যতা উদঘাটন করতে হয় এবং সেজন্য প্রয়োজনীয় সময় নেয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি।
"সুনির্দিষ্ট করে একদম ভ্যালিড একটা ইনফরমেশন জনগণের কাছে যদি শেয়ার করি, তাহলে তো এখানে কোনো ফাঁক-ফোকড় থাকে না, লিমিটেশনস থাকে না, তাহলে জনগণের মধ্যে কোনো কনফিউশন থাকে না। এই যে আমরা তাড়াহুড়া করি, তাড়াহুড়া করতে গিয়েই প্রথম ইনফরমেশনের সাথে শেষের ইনফরমেশনের মিল থাকে না। ফলশ্রুতিতেই নানা প্রশ্নসহ এ ধরনের সমস্যাগুলো তৈরি করে।"

ছবির উৎস, SHARIER MIM
কী বলছেন তদন্ত কর্মকর্তা
এদিকে, হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহ পেরুনোর আগেই মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব থানা পুলিশের কাছ থেকে পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক জিন্নাত আলী।
বিবিসি বাংলা তার কাছে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার তথ্য ও সূত্র নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ওঠা নানা প্রশ্ন নিয়ে জানতে চেয়েছিল, তিনি সেসবের জবাবে বলছেন, "মানুষ প্রশ্ন তুলতেই পারে, তাতে অসুবিধা নেই"।
তবে তিনি বিবিসিকে বলেন, "আমার তদন্ত নিরপেক্ষভাবে এবং সঠিক পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে যে কাজগুলো করা দরকার, আমি করতেছি।"
মি. আলী জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাতে এ মামলায় সীমান্ত দাস, যিনি গ্রেফতার দুই ব্যক্তির বন্ধু, তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছেন ঘটনার আগে গ্রেফতার দুই ব্যক্তি মাদক গ্রহণ করেছিল।
সবশেষ ওই ঘটনার সময় ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল কী-না প্রশ্নের জবাবে মি. আলী বলেছেন, তিনি অফিসিয়ালি পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট বা ময়না তদন্ত প্রতিবেদনটি এখনো হাতে পাননি।
"আমরা আনঅফিশিয়ালি পেয়েছি। অফিশিয়ালি পাই নাই। ধর্ষণের কোনো আলামত নাই। তবে, ধস্তাধস্তিতো থাকবেই"।
এদিকে, গ্রেফতার ব্যক্তিদের মাদকাসক্ত বলা হয়েছে। কিন্তু তারা আসলেই মাদকাসক্ত ছিল কী-না তা নিশ্চিত হতে ডোপ টেস্ট করা হয়েছে কীনা এমন প্রশ্নে মি. আলী বলেছেন, "ওটাও করবো। ওটার সময় আছে তো, ৯০ দিন পর্যন্ত সময় থাকে। এখনো করা হয়নি"।
এদিকে, আসামিদের একজনের গায়ের জামা এবং রংপুরেরই একজন পুলিশ কর্মকর্তার গায়ের জামা একই ধরনের - এমন ছবি অনেকেই শেয়ার করে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন যে, পুলিশের জামা ওই ব্যক্তির গায়ে গেল কি করে।
ওই পুলিশ কর্মকর্তা রংপুর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী সোমবার বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "ওই জামা রংপুরে আমিসহ আরও দুশো লোকের আছে। আমার শার্ট আমারই আছে। এ নিয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে"।








