ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট কে?

    • Author, ফার্নান্দো দুতার্তে
    • Role, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
  • Published
  • পড়ার সময়: ৯ মিনিট

ইসরায়েলে ভোট শুরুর আগের জরিপ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জোট, যেটিতে তার নিজের দল লিকুদ, কট্টর ডানপন্থী এবং অতি-গোঁড়া ইহুদি দলগুলো রয়েছে আজকের অর্থাৎ ২৭শে অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনের পর সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে বাধার মুখে পড়তে পারে।

আর এর একটি প্রধান কারণ হলেন গাদি আইজেনকোট - ইসরায়েলের সাবেক এই সেনাপ্রধান এমন একজন ব্যক্তির সামনে এক অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন, যিনি গত তিন দশকের বেশিরভাগ সময় ধরে ইসরায়েলকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

রাজনৈতিকভাবে আইজেনকোট তুলনামূলক নতুন একজন ব্যক্তি। তিনি ২০২২ সালে ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টির হয়ে নেসেটের (ইসরায়েলি পার্লামেন্ট) সদস্য হওয়ার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

পরবর্তীতে তিনি আদর্শগত মতপার্থক্যের কারণে দলটি ত্যাগ করেন।

গত বছর বিরোধী দলের প্রধান নেতাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের মধ্যপন্থী দল ‘ইয়াশার’ (যার অর্থ ‘সোজা’ বা ‘সৎ’) গঠন করার পর থেকে আইজেনকোট নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত হয়েছেন, যে অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন এবং ২০২৩ সালের সাতই অক্টোবরের হামলা মোকাবেলায় তার ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা হয়েছে।

এছাড়াও বিচার বিভাগকে ঢেলে সাজানোর বিতর্কিত সংস্কারের বিষয়টিও রয়েছে, যা ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।

কিন্তু নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়ানোর ব্যাপারে আইজেনকোটের নিজস্ব সংকল্পের পেছনে ব্যক্তিগত দুঃখজনক ঘটনাও প্রেরণা যুগিয়েছে।

আইজেনকোটের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ, মাস্টার সার্জেন্ট গাল আইজেনকোট, সাতই অক্টোবর হামাসের হাতে বন্দি হওয়া দুই ইসরায়েলি জিম্মির দেহাবশেষ উদ্ধারের একটি অভিযান চলাকালে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে উত্তর গাজায় এক বিস্ফোরণে নিহত হন।

গাল গাজায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন।

গাদি আইজেনকোট বলেছেন, ছেলের মৃত্যুর পর তার ব্যবহৃত জিনিসপত্রগুলো কয়েকটি বাক্সে করে তাকে পাঠানো হয়েছে, তেল আবিবের উত্তরে অবস্থিত উপকূলীয় শহর হার্জলিয়ায় তার বাড়িতে সেগুলো রাখা আছে, সেসব তিনি এখনও দেখেননি।

"আমি এখনও সেগুলো খুলিনি। আমি এটা কেবলই পিছিয়ে দিচ্ছি," এপ্রিল মাসে ইসরায়েলি পাবলিক রেডিও কান রেশেত বেত-কে বলেছিলেন ৬৬ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি।

গালের মৃত্যু, সাথে গাজা অভিযানে নিজের দুই ভাগ্নের প্রাণহানি এবং নেতানিয়াহু সরকার হামাসের নজিরবিহীন হামলা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছে বলে তার যে ধারণা - এই সবকিছু আইজেনকোটের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।

“আমি সময়কে পেছনে ফেরাতে পারব না,” এ মাসের শুরুতে তিনি ‘দ্য টাইমস অফ ইসরায়েল’ পত্রিকাকে বলেছিলেন।

“গালকে যে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে, তার যোগ্য হতে আমি আমার সাধ্যমতো সবকিছু করব।”

নেতানিয়াহু ও তার মন্ত্রিসভাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা তার করণীয় তালিকার অন্যতম। ২০২৩ সালের সাতই অক্টোবরের ঘটনার পর, জাতীয় ঐক্যের নিদর্শন হিসেবে আইজেনকোট অন্যান্য বিরোধী নেতাদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দেন।

তিনি ২০২৪ সালের জুন মাসে পদত্যাগ করেন এবং নেতানিয়াহুকে অভিযুক্ত করেন যে, হামলার সময় হামাসের হাতে অপহৃত জিম্মিদের মুক্তি নিশ্চিত করতে তিনি আরও দ্রুত পদক্ষেপ নেননি।

“তার আমলে নারী ও শিশুদের অপহরণ করা হয়েছিল এবং তাদের উদ্ধার করার জন্য যা করা দরকার ছিল, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে তা করেননি,” ‘দ্য টাইমস অফ ইসরায়েল’কে বলেন গাদি আইজেনকোট।

যদিও ওই দাবি নেতানিয়াহু বারবার নাকচ করে এসেছেন।

নেতানিয়াহু বলেন, আইজেনকোট যুদ্ধ মন্ত্রিসভার অংশ থাকাকালীন গাজায় গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছিলেন। তার মতে, আইজেনকোটের এ পন্থা হামাসকে দুর্বল করতে পারত না।

দ্য টাইমস অফ ইসরায়েলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু বলেন, “আমার মনে আছে, আমরা যখন গাজায় ছিলাম, তখন গাদি আইজেনকোট এবং অন্যরা কী বলেছিলেন… তারা বলেছিলেন, আমাদের কেবল একটি সমঝোতায় আসা উচিত, জিম্মিদের বের করে আনা উচিত এবং গাজা ছেড়ে দেওয়া উচিত – পুরো গাজা ছেড়ে দেওয়া উচিত।”

নেতানিয়াহু আরও বলেন, সেই কৌশল অনুসরণ করার অর্থ হতো যে, যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের হাতে নিহত 'পুরো হামাস' এবং শীর্ষ কর্মকর্তারা 'এখনও সেখানে থাকতো, এখনও জীবিত থাকতো, এবং তারা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতো'।

ওয়াইনেট নিউজ ওয়েবসাইটকে দেওয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে আইজেনকোট নেতানিয়াহুর দাবি নাকচ করে দিয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রীকে যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার আলোচনা ও ভোটের কার্যবিবরণী জনগণের কাছে প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

নির্বাচনের কয়েকদিন আগে আইজেনকোট অঙ্গীকার করেছিলেন যে, নির্বাচিত হলে তিনি ১৮ মাসের মধ্যে হামাসের শাসনের অবসান ঘটাবেন।

আইজেনকোটের অগ্রাধিকার

ইসরায়েলের অন্যতম বিশিষ্ট সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ নাদাভ ইয়াল, যিনি আইজেনকোটের রাজনৈতিক যাত্রাপথ শুরু থেকে পর্যবেক্ষন করেছেন, বলেন যে তার ব্যক্তিগত ক্ষতি তাকে "এক নতুন উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের অনুভূতিতে" পূর্ণ করেছে।

ইয়াল বলেন, এ মিশনের উদ্দেশ্য শুধু এই নয় যে, তার ইয়াশার পার্টি যেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য জোট সরকার গঠনের মতো অবস্থানে আসতে পারে, সেজন্য নেসেটে যথেষ্ট আসন নিশ্চিত করা।

নেতানিয়াহুর মতোই আইজেনকোটও নিশ্চিত যে, গাজা সম্পর্কিত যেকোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থেকে হামাসকে অবশ্যই বাদ দিতে হবে।

"এটা বোঝা খুব জরুরি যে, তার ছেলেকে হামাসই হত্যা করেছে, এমন এক যুদ্ধে যা হামাসই শুরু করেছিল," ইয়াল বিবিসিকে বলেন।

অবসরপ্রাপ্ত এ জেনারেল দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের (ইসরায়েলি রাষ্ট্রের পাশাপাশি একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি) প্রতিও সমর্থন জানাননি।

ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অগাস্টের শেষের দিকে তিনি বলেছিলেন যে, যারা এখনও এ সম্ভাবনায় বিশ্বাস করে তারা "বিভ্রান্ত"। তবে তিনি বলেছেন যে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ককে তিনি "পুনর্নির্ধারণ" করতে চান।

“ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে (অধিকৃত পশ্চিম তীরের) ২৮ লাখ ফিলিস্তিনিকে শাসন করার সুযোগ দিতে হবে। আমি তাদের শাসন করতে চাই না,” তিনি অক্টোবরে ‘দ্য টাইমস অফ ইসরায়েল’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন।

যদিও আইজেনকোট ইসরায়েলি আইন ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ শর্তে প্রধান বসতি ব্লকগুলোর সম্প্রসারণকে সমর্থন করেন, তিনি পশ্চিম তীরের কিছু এলাকায় ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের উপস্থিতি বাড়ানোর বিতর্কিত পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন; বিশেষ করে জেরুজালেমের পূর্বে অবস্থিত ই-ওয়ান নামে পরিচিত একটি এলাকায় বসতি সম্প্রসারণের পরিকল্পনাকে তিনি জোরালোভাবে বিরোধিতা করেছেন।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কারণেই তার এ দ্বিধা দেখা দিয়েছে বলে মনে হয়, কিন্তু অতি সম্প্রতি তিনি "জুডিয়া ও সামারিয়া থেকে ইহুদি সন্ত্রাসীদের বিতাড়িত করার" (অধিকৃত পশ্চিম তীরের জন্য ইসরায়েলের ব্যবহৃত নাম) প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে একটি হলো সাতই অক্টোবরের হামলার তদন্ত শুরু করা, যেখানে ইসরায়েলি সরকারের সম্ভাব্য ব্যর্থতাগুলো খতিয়ে দেখা হবে।

দেশের প্রধান গণমাধ্যমগুলো এ অভিযোগ প্রকাশ করেছে যে, গাজা থেকে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিশরীয় কর্তৃপক্ষ নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছিল।

প্রধানমন্ত্রী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং যে ইসরায়েলি সংবাদপত্রটি প্রথম এ দাবি করেছিল, তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।

তিনি এও ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলের সর্বোচ্চ আদালতের নেতৃত্বাধীন একটি রাষ্ট্রীয় তদন্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন, এ যুক্তিতে যে বিচার বিভাগ তার বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট হবে।

আইজেনকোট বলেন, "এই নির্বাচন হলো দায়িত্ব গ্রহণ এবং দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়ার মধ্যে যে কোন একটিকে বেছে নেয়ার নির্বাচন।"

তার ১০-দফা কর্মসূচিতে আইজেনকোট দেশ ছেড়ে যাওয়া উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন ইসরায়েলিদের সংখ্যা মোকাবেলা করতে এবং নতুন অভিবাসীদের আগমনকে উৎসাহিত করার জন্য একটি জরুরি কর্মসূচি চালু করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তিনি অতি-গোঁড়া ইহুদি সম্প্রদায় এবং আরব ইসরায়েলিদের জন্য সামরিক পরিষেবা থেকে অব্যাহতির নিয়মও বাতিল করতে চান।

"আমরা আরও একটি কাজ করব, তা হলো সকল ইসরায়েলি নাগরিকের জন্য একটি সার্বজনীন সেবা আইন পাস করা: সামরিক, জাতীয় বা বেসামরিক সেবা, যার মধ্যে আরবদের জন্য জাতীয় সেবাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে," তিনি ‘দ্য টাইমস অফ ইসরায়েল’কে বলেন।

নেতানিয়াহু প্রশাসনের একটি উদ্যোগসহ সামরিক পরিষেবা সম্প্রসারণের পূর্ববর্তী প্রচেষ্টাগুলোর ফলে অতি-গোঁড়া ইহুদি সম্প্রদায়গুলোর পক্ষ থেকে প্রতিবাদ দেখা দিয়েছে।

আইজেনকোটের জন্ম ও বেড়ে ওঠা

আইজেনকোটের জন্ম তিবেরিয়াসে এবং তিনি বেড়ে উঠেছেন এইলাতে - ইসরায়েলের রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রধান কেন্দ্র জেরুজালেম ও তেল আবিব থেকে অনেক দূরে অবস্থিত দুটি শহর।

তিনি ১৯৫০-এর দশকে ইসরায়েলে বসতি স্থাপনকারী স্বল্পবিত্ত মরোক্কান অভিবাসী দম্পতির সন্তান।

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর ইহুদি সম্প্রদায় মিজরাহি নামে পরিচিত। কোনো মিজরাহি কখনো ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী হননি, যদিও এ সম্প্রদায়ের রাজনীতিবিদরা অতীতে চেষ্টা করেছেন।

দ্য নিউ ইয়র্কারের সম্পাদক ডেভিড রেমনিক, যিনি প্রচারণার সময় আইজেনকোটের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন, বলেন যে আইজেনকোট ইসরায়েলি সমাজের বঞ্চিতদের, যেমন মিজরাহিমদের রক্ষক হিসেবে নেতানিয়াহুর অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করেন - যা এ সত্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয় যে নেতানিয়াহু পূর্ব ইউরোপীয় ইহুদি অভিবাসীদের বংশধর এবং জেরুজালেমের একটি অভিজাত এলাকায় বেড়ে উঠেছেন।

ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, মিজরাহিম সম্প্রদায় - যারা ঐতিহাসিকভাবে লিকুদকে সমর্থন করে আসছে - প্রায়শই আইজেনকোটকে বর্ণনা করার জন্য মরক্কীয় আরবি শব্দ 'ডায়ালিনা' ('আমাদের একজন') ব্যবহার করে থাকে।

“আমার বাবা-মা মরক্কো থেকে অভিবাসী হয়ে এসেছিলেন এবং আমি তাদের ও আমার শেকড় নিয়ে গর্বিত, কিন্তু আমি সবার আগে খুশি হব যদি আমরা আমাদের ইসরায়েলি পরিচয় নিয়ে গর্ব করতে পারি,” এ বছরের শুরুতে টিভি নেটওয়ার্ক চ্যানেল থারটিনকে বলেন আইজেনকোট।

সামরিক জীবন

আইজেনকোট ১৮ বছর বয়সে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ৪০ বছর সেখানে কর্মরত ছিলেন।

এই দীর্ঘ সময়ে তিনি পদোন্নতি পেয়ে চিফ অফ স্টাফ পদে উন্নীত হন, যে পদে তিনি ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

২০০০-এর দশকে, দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় তিনি পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন। এটি ছিল চার বছরব্যাপী একটি ফিলিস্তিনি অভ্যুত্থান, যাতে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রায় ১,০০০ ইসরায়েলি এবং ৩,০০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিল।

আইজেনকোট পরবর্তীকালে 'দাহিয়ে মতবাদ'-এর সাথে যুক্ত হন, যা ইসরায়েলের বিশ্বাস অনুযায়ী আক্রান্ত হওয়া এলাকাগুলোতে বেসামরিক অবকাঠামোর বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক শক্তি ব্যবহারের পক্ষে সমর্থন করে।

এটাও উল্লেখ করা জরুরি যে, নেতানিয়াহুর এত সমালোচনার মাঝেও আইজেনকোট সাতই অক্টোবরের হামলার জবাবে ইসরায়েলের সামরিক প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে কখনো মুখ খোলেননি।

হামাস পরিচালিত হামলায় প্রায় ১,২০০ জন নিহত এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়।

এর জবাবে ইসরায়েল গাজায় একটি সামরিক অভিযান শুরু করে, যাতে ৭৪,২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে হামাস-পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যাদের দেওয়া পরিসংখ্যান জাতিসংঘ নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে।

"আমরা আত্মরক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছি। এর শুরুটা কোথায় হয়েছিল, তা আপনাকে সততার সাথে খতিয়ে দেখতে হবে," আইজেনকোট ‘দ্য টাইমস অফ ইসরায়েল’-কে বলেন।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক গার্ডিয়ান পত্রিকায় সাংবাদিক ও সম্প্রচারক মেহদি হাসান লিখেছেন যে, "আইজেনকোট নেতানিয়াহু নন", কিন্তু তিনি "পশ্চিম তীর ও গাজা উভয় স্থানেই একই ধরনের সম্প্রসারণ ও ধ্বংসাত্মক নীতি" অনুমোদন করবেন।

ইসরায়েলে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ পত্রিকার সংবাদদাতা এবং নেতানিয়াহুর জীবনীর লেখক আনশেল ফেফার বলেছেন যে, আইজেনকোট "শান্তিবাদী নন"।

কিন্তু তিনি একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবেও পরিচিত। প্রচারণায় এখন পর্যন্ত তিনি কোনো অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন না।

এছাড়াও, তিনি কোনো অভিজাত পরিবার থেকে আসেননি, [যার ফলে] তাকে কলঙ্কিত করা খুব কঠিন," ফেফার বিবিসিকে বলেন।

নেতানিয়াহুর সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আইজেনকোটের উত্থান কিছুটা অপ্রত্যাশিত ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ছয় মাস আগেও সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন [সাবেক প্রধানমন্ত্রী] নাফতালি বেনেট। কিন্তু মনে হচ্ছে, আইজেনকোট সঠিক সময়ে নির্বাচকমণ্ডলীর মন জয় করতে পেরেছেন।

আইজেনকোটকে প্রায়শই নেতানিয়াহুর বিপরীত হিসেবে বর্ণনা করা হয়: এমন একজন ব্যক্তি যিনি প্রচারের আলোয় স্বচ্ছন্দ নন এবং একজন দুর্দান্ত রাজনৈতিক বক্তাও নন। ইয়াল মনে করেন, আইজেনকোট রাজনীতিবিদ হিসেবে কাজ করাটা উপভোগও করেন না।

রাজনৈতিক দরকষাকষির খেলা

জনমত জরিপে ভালো করলেও, আইজেনকোটের দল ১২০ আসনের নেসেটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে না - সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠনের জন্য ৬১টি আসন প্রয়োজন, যা ঐতিহাসিকভাবে দলগুলোকে জোট সরকার গঠন করতে বাধ্য করেছে।

কিন্তু বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নির্বাচন-পরবর্তী হিসাবনিকাষে একজন 'ওস্তাদ' রাজনীতিবিদ। তিনি লিকুদ পার্টির নেতা হিসেবে ১০টি জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং ছয়বার জোট সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়েছেন।

এর মধ্যে ২০০৯ সালের নির্বাচনও অন্তর্ভুক্ত, যখন তার দল প্রকৃতপক্ষে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে কম আসন জিতেছিল।

গত কয়েক সপ্তাহে নেতানিয়াহুর প্রচার শিবির যুক্তি দিয়েছে যে, সরকার গঠনের জন্য আইজেনকোটকে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন জোগাড় করতে হবে।

ইসরায়েলে বসবাসকারী ২০ লক্ষেরও বেশি আরব নাগরিক ও বাসিন্দাদের (যারা দেশটির জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ) মধ্যে আরব দলগুলো জনপ্রিয়, এবং জনমত জরিপ অনুযায়ী প্রধান চারটি আরব দল (হাদাশ, তা'আল, বালাদ এবং রা'আম) সম্মিলিতভাবে নেসেটের ১২ থেকে ১৫টি আসন জিততে পারে।

"আপনি কি একটি ইহুদি রাষ্ট্র চান, নাকি একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র চান?" একটি নির্বাচনী ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রী আইজেনকোটকে এ প্রশ্ন করেন।

আইজেনকোট প্রকাশ্যে তার সরকারে আরব দলগুলোর উপস্থিতি নাকচ করে দিয়েছেন, কিন্তু সম্ভাব্য সংখ্যালঘু সরকারে নেসেটে নেতানিয়াহু-বিরোধী জোটের দরজা পুরোপুরি নাকচ করেননি।

তেল আবিব-ভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডালিয়া শাইন্ডলিন বিবিসিকে বলেন, "নেতানিয়াহু ক্ষমতায় টিকে আছেন, কারণ তিনি তার সমর্থকদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে তাকে ভোট দেওয়া জীবন-মরণের প্রশ্ন।"

তবে এবার আইজেনকোটের অতীত কর্মকাণ্ড প্রধানমন্ত্রীর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

(ইসরায়েলি) রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সামরিক নেতারা জনসমর্থন পেয়ে আসছেন, যার কারণ হলো ইসরায়েলি জনগণ সেনাবাহিনীর ওপর উচ্চ পর্যায়ের আস্থা রাখে।

সম্পর্ক মেরামত করা

আইজেনকোটের বিজয় কি ইসরায়েল ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্ক মেরামতে সাহায্য করবে?

চ্যাথাম হাউসের ইসরায়েলি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইয়োসি মেকেলবার্গ বিবিসিকে বলেছেন, তেমনটা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কিন্তু তিনি ‘এক রাতের পরিবর্তনের’ আশার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন এবং বলেছেন যে নেতানিয়াহুকে প্রতিস্থাপন করা মানেই ইসরায়েলের পক্ষ থেকে সদিচ্ছার কোনো নিশ্চয়তা নয়।

"আমি বিশ্বাস করি না যে আইজেনকোটের দলসহ কোনো বিরোধী দলই (নেতানিয়াহুর) কোনো সুস্পষ্ট বিকল্প তৈরি করবে।

যদি আইজেনকোট জেতেন, তাহলে তাকে পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতির বিষয়ে সিদ্ধান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে এবং গাজার পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে," অধ্যাপক মেকেলবার্গ যোগ করেন।