সংবিধান সংস্কার নাকি সংশোধন, বিএনপি ও জামায়াত-এনসিপি জোটের বিরোধ কোন দিকে যাবে?

জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

ছবির উৎস, PID

ছবির ক্যাপশান, জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (ফাইল ছবি)
    • Author, কাদির কল্লোল
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৮ মিনিট

সংবিধান সংস্কার নাকি সংশোধন, এই প্রশ্নে পরস্পর বিরোধী অবস্থানে বিএনপি এবং জামায়াত-এনসিপির জোট। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনুপস্থিত আওয়ামী লীগ। এমন প্রেক্ষাপটে শেষপর্যন্ত সংবিধান ঘিরে কোন দিকে এগোতে পারে রাজনীতি- অনিশ্চয়তা দেখছেন বিশ্লেষকদের অনেকে।

সংসদের বিরোধী জোটের দাবি অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পথে যায়নি বিএনপি সরকার। তারা হাঁটছে বিদ্যমান সংবিধান সংশোধন করার পথে।

দলটি তাদের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব এবং জুলাই সনদের প্রস্তাব সমন্বয় করে বিদ্যমান সংবিধানেই অষ্টদশ সংশোধনী আনার কথা বলছে।

আর সেই অবস্থানে থেকে বিএনপি সংসদে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু ওই কমিটি প্রত্যাখান করেছে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির ১১দলীয় ঐক্য।

বিএনপি নেতাদের অনেকে মনে করছেন, সংসদের বিরোধী জোট সংস্কারের কথা বলে এর খোলনলচে পাল্টে দিতে চাইছে, অর্থাৎ তারা চাইছে নতুন করে সংবিধান লিখতে।

অবশ্য জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির যুক্তি হচ্ছে, বিদ্যমান সংবিধানে 'ফ্যাসিবাদী' তৈরির সুযোগ আছে। সেখানে তারা জুলাই আন্দোলনের 'স্পিরিটের' বিষয়কে সামনে আনছে।

এই দলগুলো সংসদের বাইরে কর্মসূচি রেখে বিএনপি সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপও তৈরি করতে চাইছে।

প্রসঙ্গত, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরে ওই আন্দোলনের ছাত্র নেতৃত্ব এবং সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলো সংবিধানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের দাবি সামনে আনে। এছাড়াও ছাত্র নেতৃত্বের একাংশ রাজনৈতিক দল এনসিপি গঠনের পর সেই দল দাবি তোলে নতুন করে সংবিধান লেখার।

সে সময়ই এর পক্ষ-বিপক্ষে দলগুলোর অবস্থানে বিভক্তি দেখা যায়। সমর্থনে ছিল জামায়াতসহ বিভিন্ন দল। তখনই নতুন করে সংবিধান লেখার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল বিএনপি ও এর মিত্ররা।

দলগুলো যে যার অবস্থান ও কৌশলেই অনড় রয়েছে এবং অনিশ্চয়তার প্রশ্ন আসছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

বাংলাদেশের সংবিধানের ছবি

অনিশ্চয়তা কোথায়

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সংকটটা শুরু থেকেই। কারণ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি ও এর মিত্ররা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি; তারা শুধু জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছে।

জামায়াত ও এনসিপিসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা দুটি শপথই নিয়েছেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার বৈধতা নেই বলে বলছে বিএনপি। এমনকি এ ধরনের পরিষদ গঠনে রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে দলটির।

নতুন জাতীয় সংসদের শুরুতেই ওই পরিষদ গঠনের বিষয়টি হোঁচট খেয়েছে। বিএনপি বরং সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করেছে।

২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনার শাসনের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সংবিধানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা করেছিল।

সেই আলোচনার ফলাফলে 'জুলাই জাতীয় সনদ' সই করা হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৭ই অক্টোবর। একই বছরের ১৩ই নভেম্বর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন এবং তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।

আর সেই আদেশের ভিত্তিতেই এই বছরের নভেম্বরেই সংবিধান সংস্কার সর্ম্পকিত কিছু প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না, সেটা যাচাইয়ের জন্য গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী এ বছরের ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তাতে 'হ্যাঁ' ভোট জয়যুক্ত হয়েছে।

কিন্তু বিএনপি ও এর মিত্ররা যেহেতু রাষ্ট্রপতির ওই আদেশ জারির এখতিয়ার নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে এবং সেই আদেশ অনুসরণ করেনি তারা, ফলে বিরোধী জোটের এমপিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিলেও তা গঠন হয়নি এবং গণভোটের বিষয়টিও 'তামাদি' হয়ে গেছে বলে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন।

বিএনপির নেতারা বলে আসছেন, গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে বিগত সংসদের স্পিকার আত্মগোপনে ছিলেন এবং জেলে গেছেন ডেপুটি স্পিকার। সে কারণে ত্রয়োদশ সংসদের এমপিদের শপথ করিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। জামায়াতসহ ১১দলীয় ঐক্যের এমপিদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে যে শপথ পড়িয়েছেন, এর কোনো বৈধতা নেই বলে তারা মনে করেন।

এই ইস্যুতে বিএনপি সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্ন যেমন তুলেছে, একইসঙ্গে সংস্কার নিয়ে আলোচনার শুরু থেকেই তারা অবস্থান নিয়েছে নতুন করে সংবিধান লেখার বিপক্ষে।

দলটি বর্তমান সংবিধান বাতিল করে সংস্কারের পক্ষে নয়। তারা সংস্কার করার কথা বলছে; সেটি তারা করতে চায় বিদ্যমান সংবিধানে সংশোধনী এনে।

বিএনপির নেতারা বলছেন, বিদ্যমান সংবিধানে বিভিন্ন সময়ে ১৭ বার সংশোধনী আনা হয়েছে। এখন তারা সংস্কার নয়, সংবিধানের অষ্টদশ সংশোধনী আনতে চান। সেখানে জুলাই সনদের যে বিষয়গুলোতে দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে বা বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট নেই, সেগুলোর সঙ্গে তাদের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের সমন্বয় করবেন তারা।

এখানে উল্লেখ করা যায় যে, জুলাই সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান-সম্পর্কিত। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে। দলটি নিজেদের ভিন্নমতের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে।

তবে জামায়াত ও এনসিপিসহ বিরোধী জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো হুবহু বাস্তবায়নের পক্ষে। তারা এটিকে সাধারণ সংবিধান সংশোধন নয়, 'সংবিধান সংস্কার' হিসেবে দেখছে।

সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক মনে করেন, সংস্কার করতে হলে সংবিধান বাতিল করতে হবে। এই বাতিলের ক্ষমতা কারও নেই।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, সামরিক শাসকরা এসে সংবিধান বাতিল বা স্থগিত করে থাকে। কোনো গণতান্ত্রিক সরকার সংবিধান বাতিল করতে পারে না। কারণ সংবিধান অনুযায়ীই ক্ষমতায় আসে গণতান্ত্রিক সরকার।

ফলে বিএনপি সরকারের অবস্থান আইনগতভাবে ঠিক আছে বলে তিনি মনে করেন।

তবে জামায়াত ও এনসিপি নেতাদের বক্তব্য হচ্ছে, গণ-অভ্যুত্থান ও আওয়ামী লীগ সরকারের পতন আইনের ভেতরে থেকে হয়নি। সেই গণ-অভ্যুত্থানের 'স্পিরিটের' ভিত্তিতে তারা সংবিধান সংস্কারের কথা বলছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ মনে করেন, সংবিধান সংস্কার নাকি সংশোধন - এই প্রশ্নে দুই পক্ষের অবস্থানের পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যাচ্ছে না; অনিশ্চয়তা বা সংকটটা সেখানেই।

বিএনপি নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ

ছবির উৎস, TV Screen Grab

ছবির ক্যাপশান, বিএনপি নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ

সংস্কার পরিষদ নয়, সংসদেই সংবিধান সংশোধনের অবস্থানে বিএনপি

জাতীয় সংসদেই বিদ্যমান সংবিধানে সংশোধনীর মাধ্যমে সংস্কার করার অবস্থানে অনড় রয়েছে বিএনপি সরকার।

দলটির একাধিক নেতা বলেছেন, জুলাই গণ-অভ্যত্থানের পর সেই আন্দোলনের ছাত্র নেতৃত্বসহ বিভিন্ন পক্ষ থেকে যখন সংবিধান বাতিলের দাবি তোলা হয়েছিল, তখনই বিএনপি এই সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তারা এই অবস্থানের কোনো পরিবর্তন আনতে রাজি নন।

দল ও সরকারের অবস্থান একই। সংস্কার যা করা দরকার, তা নির্বাচিত জাতীয় সংসদে এবং সংবিধান সংশোধন করেই করতে হবে, এখন পর্যন্ত এটাই বিএনপি ও তাদের সরকারের অবস্থান।

তাদের বক্তব্য হচ্ছে, সংবিধানের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই বিগত অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিয়েছিল এবং ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে। সেখানে সংবিধানের বাইরে গিয়ে কিছু করবেন না তারা।

কারণ বিএনপির নেতৃত্ব মনে করেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের ব্যাপারে রাষ্ট্রপতির আদেশ দেওয়ার এখতিয়ার নেই। এর ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটও বৈধ নয়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে প্রধান করে ১২ সদস্যের সংবিধান সংশোধন সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এই কমিটিতে জামায়াত-এনসিপিসহ বিরোধী জোটকে পাঁচটি পদ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই জোট তা প্রত্যাখ্যান করায় সংসদে কমিটি গঠন করেছে বিএনপি। অবশ্য এনপি বিরোধীদলের জন্য পাঁচটি পদ খালি রেখেছে।

মি. আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "বিরোধী জোট তাদের রাজনৈতিক কৌশলের স্বার্থে হয়তো সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সংস্কারের কথা বলছে, কিন্তু আমরা বিদ্যমান সংবিধানেই সংশোধন করতে চাই এবং সেই উদ্যোগ আমরা নিয়েছি।

"সংবিধান সংশোধনের এই উদ্যোগ সরকার কার্যকরভাবে চালিয়ে যাবে। এটি বিশাল কাজ। কারণ আমরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ এবং আমাদের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব সমন্বয় করে সংবিধানের সংশোধনী প্রস্তাব আনবো। সেজন্য সবার সাথে আলোচনা করেই তা করবো" বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি এ-ও উল্লেখ করেন, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে জামায়াতসহ বিরোধী জোটের জন্য পাঁচটি পদ এখনো খালি রাখা আছে, বিরোধী জোট চাইলে যে কোনো সময় অংশ নিতে পারে। সংশোধনী আনার ক্ষেত্রে তাদের বিরোধী দলের সাথে আলোচনা করার চেষ্টা থাকবে।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান (ফাইল ছবি)

অবস্থান কি পাল্টাবে জামায়াত-এনসিপি

সংবিধান ইস্যুতে জামায়াত-এনসিপি বা তাদের জোটের অবস্থান পাল্টানোর কোনো ইঙ্গিত নেই। বরং তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, সংস্কার পরিষদ গঠন ও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন-এই বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে তৈরির কৌশল নিয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

এসব ইস্যুতে জামায়াত-এনসিপির জোট সভা-সমাবেশ-সেমিনার করছে। তারা রাজপথে কর্মসূচি রেখে এবং সংসদের ভেতরেও প্রতিবাদ অব্যাহত রেখে বিএনপি সরকারের ওপর একটা রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে চাইছে।

তারাও তাদের অবস্থানে অটল থাকার কথা বলছে। সেজন্য বিএনপির প্রস্তাব অনুযায়ী গঠিত সংবিধান সংশোধন কমিটিতে তারা অংশ না নিয়ে সেটিকে প্রত্যাখান করেছে।

এখনো বিএনপি যে ওই কমিটিতে তাদের পদ খালি রাখার কথা বলছে, তাতে বিরোধীজোট সাড়া দেবে না বলেই এর নেতারা বলছেন।

বিএনপির অবস্থান অনুযায়ী যদি জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাব সংবিধানে সংশোধনীর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যায়, তাতে জামায়াত-এনসিপি জোটের আপত্তি কেন, তারা কেন সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সংস্কারের অবস্থানে অটল থাকার কথা বলছে - এসব প্রশ্নও আলোচনায় আসছে।

কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সব রাজনৈতিক দলই মানুষের কাছে সংবিধান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। গণভোটে রায়ও দিয়েছে জনগণ। এখন জনগণের রায় পেছনে ফেলে বিএনপি সরকারে এসে এখন সংস্কার পরিষদ গঠন না করে সংবিধান সংশোধনের কথা বলছে, উল্টো পথে হাঁটছে।

তারা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসতে পারেন না বলেও মন্তব্য করেন মি. রহমান।

এনসিপির সদস্য সচিবআখতার হোসেন (ফাইল ছবি)
ছবির ক্যাপশান, এনসিপির সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন (ফাইল ছবি)

বিরোধীজোটের অন্যতম শরিক এনসিপি শুরু থেকেই পুরোপুরি সংস্কার বা নতুন করে সংবিধান লেখার দাবি করে আসছে। তারাও বিএনপি অবস্থানের বিরুদ্ধে জোটগত ও দলীয়ভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি নিচ্ছে।

এনসিপির সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, সংবিধান সংশোধন করা হলে সে ব্যাপারে আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ থাকে। এর আগে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সংবিধানের সংশোধনী আদালতে চ্যালেঞ্জ হওয়ার উদাহরণ আছে।

মি. হোসেন মনে করেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সংস্কার করা হলে তখন আদালতের যাওয়ার বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। এটি তাদের অবস্থানের পক্ষে প্রধান যুক্তি।

জামায়াতের আমিরও ওই একই যুক্তি দিয়েছেন। তবে বিশ্লেষকেরা পরিস্থিতিটাকে দেখছেন ভিন্নভাবে।

তারা মনে করেন, সংস্কার প্রশ্নে দুই পক্ষের পরস্পরের প্রতি সন্দেহ, অবিশ্বাস কাজ করছে। বিএনপির ধারণা, সংশোধনের বিরোধিতা করে এবং সংস্কারের কথা বলে বিরোধীজোট সংবিধানই পাল্টে ফেলতে চাইছে। কারণ এই জোটের দলগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নতুন করে সংবিধান লেখার দাবি তুলেছিল।

এছাড়াও বিশ্লেষকেরা বলছেন, সংস্কারের যে সব প্রস্তাব এসেছে, সেগুলো সংশোধনী হিসেবেও যুক্ত করা হলে মৌলিক অনেক বিষয়সহ সামগ্রিকভাবেই সংবিধান পাল্টে যাবে।

জাতীয় সংসদের অধিবেশন (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, BSS

ছবির ক্যাপশান, জাতীয় সংসদের অধিবেশন (ফাইল ছবি)

আবার বিরোধী জোট সন্দেহ করছে, সংবিধান সংশোধনের কথা বলে সরকার জুলাই সনদ হুবহু বাস্তবায়ন না করার কৌশল নিয়েছে।

সংবিধান ও সংস্কার ইস্যুতে জামায়াতের জোট বিএনপি সরকারকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে চাইছে। কিন্তু সংসদ নিরঙ্কুশ সংখ্যাঘরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপিকে সংশোধনের পথে এগোতে কতটা চাপে ফেলা সম্ভব হবে, সেই প্রশ্ন রয়েছে বিশ্লেষকদের অনেকের।

যদিও বিএনপি নেতারা আশা করেন, জামায়াত- এনসিপি শেষপর্যন্ত তাদের অবস্থান থেকে সরে আসবে। অন্যদিকে, বিএনপিকে নিয়ে একইরকম আশা প্রকাশ করছেন জামায়াত-এনসিপি নেতারা।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ বলেন, এক পক্ষ সংবিধানের মধ্যে থেকে এর পরিবর্তন বা সংশোধন করতে চাইছে। আরেক পক্ষ চাইছে সংবিধানের বাইরে গিয়ে সামগ্রিকভাবে পরিবর্তন। আর এই অবস্থানে দুই পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে।

দুই পক্ষকেই আলোচনার মাধ্যমে সাংবিধানিক বা রাজনৈতিক, যে কোনো সংকট এড়ানোর চেষ্টা করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ।

বিএনপির নেতারা অবশ্য বলছেন, সংবিধান সংশোধন কমিটি সব রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সংশোধনী প্রস্তাব তৈরির চেষ্টা করবে।