বৃষ্টি ও বন্যা নিয়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে কী বলা হচ্ছে

Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

বাংলাদেশের দুটি জেলায় নদীর পানি এখন বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং একই সাথে দেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় নদ নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আভাস দিয়েছে বন্যা তথ্য কেন্দ্র।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, কুশিয়ারা নদী সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে ও সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

ওদিকে আগামী দুই দিনে উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পান বেড়ে কিছু জায়গায় বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে, যা অন্তত পাঁচটি জেলার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রাকিবুল হাসান বলছেন, ওই জেলায় কোন নদ নদীর পানি এখনো বিপদসীমা অতিক্রম করেনি তবে উজানে বৃষ্টি থাকায় তিস্তা ধরলা ও দুধকুমারের পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে।

"ভারতের আসাম অর্থাৎ উজানে প্রবল বৃষ্টির কারণে পানি বাড়ছে। তবে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি এবার বিপদসীমা অতিক্রম করবে না। সে কারণে নদী সংলগ্ন এলাকায় পানি উঠলেও বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

গাইবান্ধা ও রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, সেখানকার সব নদীর পানিই বাড়ছে এবং এর মধ্যে তিস্তার পানি কোনো কোনো জায়গায় বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে।

কর্মকর্তারা বলছেন, উজানে অর্থাৎ ভারতের আসামে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে বাংলাদেশের এসব এলাকায় নদনদীর পানি বাড়বে।

"তবে এ নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। কয়েকদিন পর পানি আবার নেমে যাবে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম।

পূর্বাভাসে আর কী আছে

চলতি মাসের শুরুতেই একবার বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল গাইবান্ধার চরাঞ্চলে। ওই সময় জেলার গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি এবং সাঘাটা উপজেলার চরাঞ্চলে পানি উঠেছিল ব্রক্ষ্মপুত্র ও যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার উপরে চলে যাওয়ার কারণে।

বন্যার পানির স্রোতে বেশ কিছু চরে বাড়িঘর তলিয়ে গিয়েছিল তখন। এখন আবারও উজানে অর্থাৎ ভারতের দিকে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে একই পরিস্থিতির আশংকা তৈরি হয়েছে বলে বলে জেলার ফুলছড়ি উপজেলার মানিককর চরের অধিবাসী রফিকুল ইসলাম।

সম্ভাব্য দুর্যোগ ও বন্যা মোকাবেলায় ব্যবস্থা নিতে ইতোমধ্যেই জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে জেলার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা হয়েছে।

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলছেন, জেলার সব নদীরই পানি ক্রমশ বাড়ছে।

"তিস্তায় পানি বিপদসীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনা আছে। তবে যমুনায় পানি বাড়লেও বিপদসীমা অতিক্রম করবে না। তারপরেও আগামী ২/৩ দিন সব নদনদীর পানি বাড়বে এবং তাতে করে নিম্নাঞ্চলে পানি উঠবে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, গত চব্বিশ ঘণ্টায় ব্রক্ষ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি বাড়লে এখনো বিপদসীমার নীচেই আছে।

"আগামী ৫ দিন এসব নদ নদীর পানি বাড়তে পারে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় কিছু জায়গায় বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে এবং লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে," পূর্বাভাসে বলা হয়েছে।

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রবিউল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ভারতের দিকে বৃষ্টির কারণে তিস্তার পানি রংপুর ও কুড়িগ্রামে বাড়বে। "এসব এলাকায় স্বল্পমেয়াদী বন্যার আশঙ্কা আছে। তবে এখনো পানি প্রবাহ বিপদসীমা থেকে নীচেই আছে," বলছিলেন তিনি।

এছাড়া দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে গঙ্গা পদ্মা অববাহিকাতেও আগামী ৫ দিন পানি বাড়বে, তবে তা বিপদসীমার উপরে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

ওদিকে সুরমা কুশিয়ারা অববাহিকায় কুশিয়ারা নদী সিলেট ও সুনামগঞ্জের দুটি জায়গায় বিপদসীমার উপর দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া সুরমা নদী ছাতকে এবং কুশিয়ারা মৌলভীবাজারের শেরপুরে সতর্কসীমায় প্রবাহিত হচ্ছে।

এসব নদীর পানি আগামী তিনদিনে আরও বাড়তে পারে এবং কোথাও কোথাও বিপদসীমার উপর যেতে পারে বলে বলছে বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

তিস্তা নদী নীলফামারীর ডালিয়া ও কাউনিয়া এবং গাইবান্ধার হরিপুর ও তারাপুর স্টেশনে সতর্কসীমায় প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তার পানি আগামী কয়েকদিন আরও বাড়তে বলে জানিয়েছে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড।

এদিকে আত্রাই, করতোয়া, ছোটো যমুনা ও যমুনেশ্বরী নদীগুলোর পানি কমেছে। যদিও আত্রাই ও ছোটো যমুনা নওগাঁর দুটি পয়েন্টে এখনো সতর্কসীমায় প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে নেত্রকোনার কলমাকান্দা পয়েন্টে সোমেশ্বরী নদীর পানিও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

জামালপুর ও বগুড়ার কিছু এলাকায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি সতর্ক সীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হতে পারে। এতে নদীর কাছাকাছি নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা ও এর চারদিকে থাকা নদীর মধ্যে ধলেশ্বরীর পানি বেড়েছে আর স্থিতিশীল আছে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও টঙ্গীখালের পানি। আগামী তিন দিন এসব নদীর পানি স্থিতিশীল থাকবে বলে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আজ শনিবার থেকে পরবর্তী পাঁচদিন বিভিন্ন মাত্রার বৃষ্টি সারাদেশে অব্যাহত থাকবে। "মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের উপর সক্রিয় এবং দেশের অন্যত্র এটি মোটামুটি ভাবে সক্রিয়। তবে উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় রয়েছে"।

এতে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় সব বিভাগেই হালকা থেকে মাঝারী কিংবা ভারী বৃষ্টি হতে পারে। তবে রংপুর বিভাগের কোথাও কোথাও অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে।

ওদিকে নদীর পানির অস্বাভাবিক জোয়ারের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের কিছু জেলার চরাঞ্চলে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও হাটবাজার প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। রোববার পর্যন্ত অস্বাভাবিক জোয়ার অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

প্রসঙ্গত, চলতি মাসের শুরুতে এক সপ্তাহের টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম ও বান্দরবানসহ অন্তত সাতটি জেলায় বন্যার পানি উঠেছিল। এই অতিবৃষ্টি ও কিছু জায়গায় পাহাড় ধসের কারণে অন্তত ৫৮ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছিল ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে কক্সবাজার জেলায়। এর মধ্যে ১৯ জন সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা।