আলোচনায় 'শীর্ষ সন্ত্রাসীরা', নতুনরা কীভাবে এখন সন্ত্রাসে জড়াচ্ছে

    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় পুলিশের শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় থাকা খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন সম্প্রতি খুন হওয়ার পর নতুন করে ওই তালিকায় 'শীর্ষ সন্ত্রাসী'দের নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছে।

অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ নিতে নিজেদের মধ্যে তারা দ্বন্দ্ব সংঘাতে জড়াচ্ছেন এমন খবরও আসছে সংবাদ মাধ্যমে।

ঢাকার পুলিশ কমিশনার অবশ্য বলেছেন, "শীর্ষ সন্ত্রাসী তেমন নেই, যারা আছে তারা আগের শীর্ষ সন্ত্রাসীর সহযোগী বা ওরকম সাজতে চাচ্ছে"।

তিনি এও বলেছেন যে, যারা শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম ভাঙ্গাচ্ছে কিংবা যারা মাথা চাড়া দিয়ে উঠার চেষ্টা করছে তাদের আগেই তারা দমন করবেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কারা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন এবং নতুন নতুন সন্ত্রাসীর আবির্ভাব হচ্ছে কীভাবে? অর্থাৎ কারা কখন কিভাবে সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়ছে?

পুলিশ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে এক সময় এলাকাভিত্তিক কর্তৃত্ব তৈরির প্রতিযোগিতা থেকে আলোচিত সন্ত্রাসী তৈরি হলেও এখন সন্ত্রাসী হিসেবে যারা তকমা পাচ্ছে তাদের উত্থান হচ্ছে মূলত কিশোর গ্যাং থেকে। এরা মূলত, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মাধ্যমেই অপরাধ জগতের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

তবে সবসময় পর্দার অন্তরাল থেকে 'গডফাদাররাই' এদের একেক জনকে সমর্থন-সহায়তা যুগিয়ে 'সন্ত্রাসী' হিসেবে আখ্যা পাবার উপযোগী করে তুলছে। অভিযোগ আছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতারাই এদের লালন করে থাকেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এ এইচ এম শাহাদত হোসেন বলছেন, সমাজে যেন সন্ত্রাসী হিসেবে কারও আবির্ভাব না ঘটে সেজন্য পুলিশের দিক থেকে প্রতিরোধমূলক অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয় কিন্তু এগুলো কতটা সফল হচ্ছে সেটি নির্ধারণের কোনো মাপকাঠি নেই।

"আর এই সত্যিটাও অস্বীকার করা যাবে না যে পরিবার ও সমাজ যথেষ্ট সক্রিয় হয়ে এগিয়ে না হলে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে। পুলিশ চেষ্টা করছে কিন্তু এজন্য দরকার সম্মিলিত চেষ্টা," বিবিসি বাংলাকে বলছেন তিনি।

আলোচনায় শীর্ষ সন্ত্রাসী

গত সপ্তাহে মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর ঢাকার নিউ মার্কেট এলাকায় গুলিতে এক ব্যক্তির নিহত হওয়ার পরই নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে পুলিশ ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম।

কারণ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তি ছিলেন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় ২০০১ সালে পুলিশ কর্তৃক ঘোষিত তালিকায় থাকা কথিত ২৩ 'শীর্ষ সন্ত্রাসীর' মধ্যে একজন খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন।

তিনি ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন।

ঢাকার অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিক ও আজকের পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কামরুল হাসান বলছেন, "শুধু টিটন নয়, পুলিশ কর্তৃক ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা তালিকায় থাকা এমন অন্তত ৬ জন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে এবং এরপরেই তাদের ঘিরে অপরাধ জগতে এক ধরনের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে"।

এর আগে ২০২৪ সালের ৮ই অগাস্টে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেওয়ার পর ১১ই অগাস্ট কিলার আব্বাস ও ১৩ই অগাস্ট কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন সুইডেন আসলাম। তারা দুজনই সরকার কর্তৃক পুরস্কার ঘোষিত ২৩ সন্ত্রাসীর তালিকায় ছিলেন।

এরপর পনেরই অগাস্ট কেরানীগঞ্জের কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় থাকা সানজিদুল হাসান ইমন। তিনি ও কিলার আব্বাস মুক্তি পেয়েই দেশ ছেড়েছেন বলে পুলিশ সূত্রকে উদ্ধৃত করে তখন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছিল।

এর কয়েকদিন পরেই আলোচনায় আসেন ওই তালিকার অন্যতম নাম সুব্রত বাইন। খবর ছড়ায় যে তিনিও জামিন পেয়ে জেল থেকে বেরিয়ে গেছেন।

এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনার মধ্যেই পরে ২০২৫ সালের ২৭শে মে সেনাবাহিনী সুব্রত বাইন ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোল্লা মাসুদকে কুষ্টিয়া থেকে আটকের খবর জানায়।

সেনাবাহিনীর বিজ্ঞপ্তিতে তখন বলা হয়েছিল, "সুব্রত বাইন এবং মোল্লা মাসুদ সেভেন স্টার সন্ত্রাসী দলের নেতা এবং তালিকাভুক্ত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অন্যতম"।

এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন শীর্ষ সন্ত্রাসী শেখ আসলাম (সুইডেন আসলাম হিসেবে পরিচিত)। ২০১৪ সাল থেকে তিনি ওই কারাগারে আটক ছিলেন।

এছাড়া শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় থাকা ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল এবং খোরশেদ আলম ওরফে রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসুও মুক্তি পেয়েছেন বলে জানা গেলেও এখন তাদের অবস্থান কোথায় সে সম্পর্কে কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৯৯৮ সালে সুইডেন আসলাম, জোসেফ, বিকাশ ও প্রকাশকে ধরতে ৫০ হাজার টাকা করে প্রথম পুরস্কার ঘোষণা করেছিল সরকার।

এরপরের কয়েক বছরে একের পর এক ঘটনায় আলোচিত হয়ে ওঠা মোট ২৩ জনকে শীর্ষ সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করে ধরার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার।

এর মধ্যেই বিভিন্ন সময়ে সুইডেন আসলাম, ইমন, টিটন, সুব্রত বাইন, জোসেফ, কিলার আব্বাস, বিকাশ কুমার বিশ্বাসসহ অনেককেই আটক করতে সক্ষম হয় পুলিশ।

কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই ২০০৯ সালেই পুলিশের তালিকাভুক্ত 'শীর্ষ সন্ত্রাসী' বিকাশ কুমার বিশ্বাস জামিনে মুক্তি পান। তার ভাই প্রকাশ কুমার বিশ্বাসও ওই তালিকার একজন। তবে তার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়নি।

তবে আওয়ামী লীগ আমলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় জোসেফ আহমেদের মুক্তি পাওয়ার ঘটনা। মুক্তির আগে তিনি প্রায় ২০ মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

যাবজ্জীবন সাজার আসামি নব্বইয়ের দশকের আলোচিত এই জোসেফ আহমেদের বড় ভাই হারিস আহমেদের নামও ছিল পুলিশের শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায়। তারা দুজন সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই।

দীর্ঘকাল ধরে এসব 'শীর্ষ সন্ত্রাসী' তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে আসা কামরুল হাসান বলছেন, "এদের অনেকে দীর্ঘদিন জেলে থেকেই তাদের বাহিনীর মাধ্যমে অপরাধ কার্যক্রম চালিয়ে গেছে এবং আবার কেউ কেউ বিদেশে থেকেও দেশের ভেতরে অপরাধমূলক নানা তৎপরতা চালিয়েছে বলে অভিযোগ আছে"।

"এরা জেলে থাকার সময় অপরাধ জগত কিছুটা স্থিতিশীল ছিল। এদের মুক্তির পর আবার অস্থিরতার খবর বেরিয়ে আসছে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মি. হাসান।

তবে এখন তাদের তৎপরতা সম্পর্কে খুব একটা পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় না। যদিও অনেকে মনে করেন তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচনায় থাকা এসব ব্যক্তিদের সহযোগী কিংবা অনুসারীরা অপরাধ জগতে এখনো সক্রিয় আছে।

শনিবার ঢাকার কারওয়ানবাজারে এক অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেছেন, "এখন শীর্ষ সন্ত্রাসী তেমন আর নেই'। তিনি বলেন "আমাদের তালিকা হালনাগাদ সবসময় হচ্ছে। আমাদের মনিটরিং, অবজারভেশন ও ব্যবস্থা সবই নেওয়া হয়েছে এবং হালনাগাদ করা হচ্ছে।"

নতুনরা অপরাধে জড়াচ্ছে কীভাবে

পুলিশ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, আশির দশক থেকে যারা অপরাধ জগতের নানা ঘটনার জেরে বারবার আলোচনায় এসেছেন তারা শুরুতে নিজ এলাকায় ছোট ছোট ঘটনায় জড়িত হয়েছিলেন।

কামরুল হাসান বলছেন, "নিজেরা ছোট ছোট ইস্যু থেকে তৈরি হতো। তারপর কোনো গডফাদার তাদের পিক করতো। এরপর আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সদস্যদের সাথে তাদের একটা সমঝোতা হতো। যেমন ধরুন কালা জাহাঙ্গীরকে ধরার জন্য এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হলেও তাকে কিন্তু কখনো আটক করা হয়নি। যদিও পুলিশ কিন্তু নিজে কাউকে সন্ত্রাসী বানায়নি"।

মি. হাসান বলেন, আগে সন্ত্রাসের জন্য আলোচিতরা সরাসরি রাজনৈতিক দলে সম্পৃক্ত হতো না, তারা কারও কারও ব্যক্তিগত ছত্রছায়ায় থাকতো।

"কিন্তু এক পর্যায়ে দলগুলো আলোচিত সন্ত্রাসীদের দলে জড়িত করে। কেউ যুবলীগ-আওয়ামী লীগে আবার কেউ যুবদল-বিএনপিতে জড়িত হয়েছিল। আবার কেউ কেউ আবার দল বদলও করেছে। এভাবেই রাজনৈতিক আশীর্বাদ তাদের ক্ষমতাশালী করে তুলেছিল," বলছিলেন কামরুল হাসান।

সমাজ অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তৌহিদুল হক বলছেন, স্বাধীনতার পর শীর্ষ পর্যায়ের সন্ত্রাসীদের উত্থান হয় ৯০ সাল পর্যন্ত, তবে তারা প্রকাশ্যে আসতো না।

"৯০ এর পর থেকেই তাদের অনেকে প্রকাশ্যে সক্রিয় হয় ও ক্ষমতার লাঠিয়ালে পরিণত হয়। এরপর থেকে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, ডিশ ব্যবসা, কারও হয়ে জায়গা দখল, ঝুট ব্যবসা, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা সন্ত্রাসী তৈরির উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

কামরুল হাসান বলছেন, "অপরাধ সমাজের অনুষঙ্গ। আইনের কঠোর প্রয়োগ থাকলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে বিভিন্ন ফরম্যাটে সন্ত্রাসী তৈরি হওয়ার সংস্কৃতি আছে। এখন অনেক উঠতি সন্ত্রাসী তৈরি হচ্ছে। ছিনতাই চাঁদাবাজি দিয়ে শুরু হয়। এর মধ্যে কে টিকবে আর কে হারিয়ে যাবে তা বলা কঠিন। কিন্তু কেউ কেউ হয়তো ভবিষ্যতের তালিকার জন্যও পুলিশের কাছে উপযোগী হয়ে উঠবে এবং এ চক্র চলমান থাকবে"।

পুলিশ সদরদপ্তরের মুখপাত্র ও ডিআইজি এ এইচ এম শাহাদত হোসেন বলছেন, সন্ত্রাসের জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে নানা ধরনের প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি পুলিশ সবসময় নেয়, তবে অল্প বয়সে অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পরিবার থেকে সমাজে সবার দায়িত্ব আছে।

"কমিউনিটি পুলিশিং, জনসচেতনতা, সংশোধনের জন্য কাউন্সেলিং সব চেষ্টাই পুলিশ করছে। এগুলোর আউটপুট তো আর দেখে পরিমাপ করা যাবে না। তবে এটি সত্যি যে, সবাই পুলিশকে সহযোগিতা না করলে সফলতা পাওয়া তো সহজ হবে না," বিবিসি বাংলাকে বলছেন।