বাঁলিয়ু থেকে বিশ্বমঞ্চ, ২০২৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের নীল স্বপ্ন

২১ জুন ১৯৮৬: মেক্সিকোর গুয়াদালাহারার হালিস্কো স্টেডিয়ামে ব্রাজিলের বিপক্ষে বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে গোল উদযাপনে ফরাসি অধিনায়ক মিশেল প্লাতিনি। ফ্রান্স পেনাল্টিতে ৪-৩ ব্যবধানে ম্যাচটি জিতেছিল।

ছবির উৎস, David Cannon/Allsport Via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২১শে জুন ১৯৮৬: মেক্সিকোর গুয়াদালাহারার হালিস্কো স্টেডিয়ামে ব্রাজিলের বিপক্ষে বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে গোল উদযাপনে ফরাসি অধিনায়ক মিশেল প্লাতিনি। ফ্রান্স পেনাল্টিতে ৪-৩ ব্যবধানে ম্যাচটি জিতেছিল।
    • Author, মঞ্জুরুল ইকরাম
    • Role, অতিথি লেখক, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৮ মিনিট

প্যারিসের উত্তর-পূর্ব প্রান্তের শহরতলির একটি এলাকা বঁদি। চার বছর আগে, কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে হারের পর এই অঞ্চলের কিশোর-তরুণরা স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল।

ফরাসি সমাজের মূল স্রোত থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন এই 'বাঁলিয়ু' বা অভিবাসী প্রধান শহরতলিগুলোর মানুষের কাছে ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়— এটি তাদের অস্তিত্বের লড়াই, ফরাসি হিসেবে নিজেদের পরিচয় প্রমাণ করার মঞ্চ।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বঁদি কিংবা সার্সেলের মতো প্যারিসের এই কংক্রিটের জঙ্গলগুলোতে আবারও নীল জার্সিগুলো ধুয়ে শুকাতে দেওয়া হয়েছে।

প্রধান কোচ দিদিয়ের দেশম ২৬ সদস্যের যে দল ঘোষণা করেছেন, এই শহরতলিগুলোর মানুষ সেখানে নিজেদেরই প্রতিফলন দেখছেন। কারণ, বর্তমান ফ্রান্স দলের বড় অংশই উঠে এসেছে এই অবহেলিত গলির ধুলোবালি থেকে।

শেকড়ের গল্প

১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপে জাস্ট ফঁতেন নামের এক ফরাসি ফরওয়ার্ড ১৩টি গোল করেছিলেন। একটি বিশ্বকাপে। এখনো রেকর্ড। এখনো অস্পৃশ্য।

ফঁতেন পরে বলেছিলেন, 'আমি জানতাম না আমি ইতিহাস লিখছি। আমি শুধু বল দেখলে দৌড়েছি।'

এই সরলতাই ফরাসি ফুটবলের ভেতরের কথা। চাকচিক্যের আড়ালে এক নিরেট বিশ্বাস- আমরা জিততে পারি।

মিশেল প্লাতিনি সেই বিশ্বাসকে শিল্পে পরিণত করেছিলেন আশির দশকে। তিন বছর পর পর ব্যালন ডি'অর। ১৯৮৪ ইউরোতে নয় গোল।

কিন্তু বিশ্বকাপ? সেটা ধরা দেয়নি।

১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে হেরে গেলেন। সেই হারের ব্যথা প্লাতিনি বহন করেছেন সারাজীবন।

ফুটবলের সবচেয়ে কঠিন বোঝাটার নাম- 'প্রায় পেয়েছিলাম।'

১৮ই ডিসেম্বর, ২০২২-এ কাতারের লুসাইল সিটির লুসাইল স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের মধ্যে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপ কাতার ২০২২-এর ফাইনাল ম্যাচ চলাকালীন আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি বলে হেড করছেন

ছবির উৎস, Julian Finney Via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ১৮ই ডিসেম্বর, ২০২২-এ কাতারের লুসাইল সিটির লুসাইল স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের মধ্যে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপ কাতার ২০২২-এর ফাইনাল ম্যাচ চলাকালীন আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি বলে হেড করছেন

১৯৯৮ : যখন স্বর্গ নামল মাটিতে

এমে জাকে তখন কোচ। দলে জিদান, দেশম, থুরাম, পেতি, ভিয়েরা, অঁরি। যেন সোনালি প্রজন্ম।

সেই দলটার দিকে তাকালে আজকের ফ্রান্সের প্রতিফলন দেখা যায়।

ভিয়েরা এসেছিলেন সেনেগালের পরিবার থেকে। থুরাম গুয়াদেলুপ থেকে। জিদান আলজেরিয়ান অভিবাসী পরিবারের সন্তান, মার্সেইয়ের লা কাস্তেল্লান শহরতলি থেকে।

১৯৯৮-এর সেই দলটা শুধু ফুটবলই জেতেনি, প্রমাণ করেছিল যে ফ্রান্স মানে শুধু প্যারিসের বুলেভার্ড নয়, বাঁলিয়ুর কংক্রিটও।

ফরাসি সমাজ তখন এই দলকে আখ্যা দিয়েছিল 'ব্ল্যাক, ব্লাঙ্ক, ব্যুর' (কালো, সাদা ও আরব) নামে- যা ছিল বহু সংস্কৃতির এক মেলবন্ধন।

ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ফাইনালে জিদানের দুটো হেডার। রোনালদো সেদিন মাঠে ছিলেন, কিন্তু আবার ছিলেন না। রহস্যময় অসুস্থতা। কিংবদন্তি বলে, সেদিন ঈশ্বর ফরাসি ছিলেন।

থিয়েরি অঁরি পরে বলেছিলেন, 'আমি তখন তরুণ। বুঝিনি কী হচ্ছে। শুধু দেখলাম, দেশম কাপটা তুলছেন আর পুরো স্টেডিয়াম নীল হয়ে গেছে।'

সেই রাতে শঁজেলিজেতে লক্ষ লক্ষ মানুষ। বঁদি থেকে বার্সেলোনেত পর্যন্ত উদ্‌যাপন। একটি জাতির কান্না আর হাসি একসাথে।

২০০৬: মাতেরাজ্জি, একটি মাথা এবং অনন্তকালের মুহূর্ত

বার্লিনের অলিম্পিয়াস্তাদিওন। ফাইনাল। ইতালি বনাম ফ্রান্স। জিদানের শেষ ম্যাচ।

সপ্তম মিনিটে পেনালটি থেকে জিদানের গোল। ক্রসবারে লেগে ভেতরে। ফ্রান্স এগিয়ে।

তারপর ১১০ মিনিট। মাতেরাজ্জি কিছু একটা বললেন। মাতেরাজ্জি নিজে পরে স্বীকার করেছেন, 'আমি তার বোনের কথা বলেছিলাম।'

জিদান ঘুরলেন। হাঁটলেন। এবং মাতেরাজ্জির বুকে মাথা ঠুকলেন।

লাল কার্ড। মাঠ ছাড়লেন জিদান। সেই হাঁটা — ট্রফির পাশ দিয়ে, মাথা নিচু করে — সম্ভবত ফুটবলের সবচেয়ে বিষণ্ণ দৃশ্য।

ফ্রান্স সেদিন পেনাল্টিতে হারলো।

কিন্তু মার্সেইয়ের সেই বাঁলিয়ুর ছেলে জিদান ছাড়া ফুটবল যেন একটু সংকুচিত হয়ে গেল।

১২ই জুলাই, ১৯৯৮-এ ফ্রান্সের প্যারিসের সাঁ-দেনি'র স্তাদ দ্য ফ্রান্সে ফ্রান্স ও ব্রাজিলের মধ্যে অনুষ্ঠিত ১৯৯৮ ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচ চলাকালীন ফ্রান্সের খেলোয়াড় জিনেদিন জিদান (মাঝে) দলের পক্ষে দ্বিতীয় গোলটি করেন।

ছবির উৎস, Ross Kinnaird/Allsport/Getty Images/Hulton Archive

ছবির ক্যাপশান, ১২ই জুলাই, ১৯৯৮-এ ফ্রান্সের প্যারিসের সাঁ-দেনি'র স্তাদ দ্য ফ্রান্সে ফ্রান্স ও ব্রাজিলের মধ্যে অনুষ্ঠিত ১৯৯৮ ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচ চলাকালীন ফ্রান্সের খেলোয়াড় জিনেদিন জিদান (মাঝে) দলের পক্ষে দ্বিতীয় গোলটি করেন।

২০১৮: দ্বিতীয় সূর্যোদয়

দেশম এবার কোচ। সেই দেশম যিনি ১৯৯৮-এ অধিনায়ক ছিলেন।

মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়াম। ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে ফাইনাল।

ফল ৪-২।

কিন্তু একটা কিশোর ছিল সেই দলে। যার বয়স ১৯ বছর। কিলিয়ান এমবাপ্পে, বঁদির ছেলে। তিনি ফাইনালে গোল করলেন।

বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করা দ্বিতীয় কিশোর- প্রথম ছিলেন পেলে, ১৯৫৮ সালে।

বঁদিতে সেই রাতে উৎসব হয়েছিল অন্যরকম। এটা শুধু ফুটবলের জয় ছিল না - এটা ছিল প্রমাণ যে কংক্রিটের জঙ্গল থেকেও চ্যাম্পিয়ান বের হয়।

ইতিহাস অলক্ষ্যে বৃত্ত আঁকে।

২০২২: লুসাইলের রাত

কাতারের লুসাইল স্টেডিয়াম। ফাইনাল। আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্স।

৮০ মিনিট পর্যন্ত ২-০ তে পিছিয়ে ফ্রান্স। তারপর এমবাপ্পে। একটা পেনালটি। একটা ভলি। ২-২। এক্সট্রা টাইমে আরেকটা পেনালটি। ৩-৩।

পেনালটি শুটআউটে হার।

স্বর্গের সাথে লিওনেল মেসির করমর্দনের সেই রাতে এমবাপ্পে হ্যাটট্রিক করেছিলেন।

পুরো বিশ্বকাপে আট গোল। জিতলেন গোল্ডেন বুট।

কিন্তু ট্রফি গেল মেসির হাতে।

সেই রাতে বঁদিতে নীরবতা নেমেছিল। বাঁলিয়ুর ছেলে এতদূর এসেছে — কিন্তু শেষ ধাপটা পার হতে পারেনি।

সেই ব্যথা হয়ত এখনো আছে।

১৫ জুন, ২০১৪-এ ২০১৪ ফিফা বিশ্বকাপ চলাকালীন পোর্তো আলেগ্রের বেইরা-রিও স্টেডিয়ামে ফ্রান্স ও হন্ডুরাসের মধ্যকার গ্রুপ ই-এর একটি ফুটবল ম্যাচ চলাকালীন হন্ডুরাসের গোলরক্ষক লুইস লোপেজকে পরাস্ত করে গোল করছেন ফ্রান্সের ফরোয়ার্ড করিম বেনজেমা (মাঝে)

ছবির উৎস, Luis ACOSTA / AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ১৫ই জুন, ২০১৪-এ ২০১৪ ফিফা বিশ্বকাপ চলাকালীন পোর্তো আলেগ্রের বেইরা-রিও স্টেডিয়ামে ফ্রান্স ও হন্ডুরাসের মধ্যকার গ্রুপ ই-এর একটি ফুটবল ম্যাচ চলাকালীন হন্ডুরাসের গোলরক্ষক লুইস লোপেজকে পরাস্ত করে গোল করছেন ফ্রান্সের ফরোয়ার্ড করিম বেনজেমা (মাঝে)

২০২৬: এই দলটা কেমন?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

দেশম আবার কোচ। সম্ভবত শেষবার। এই বিশ্বকাপ তার জন্যও একটি বিদায়ের সুযোগ।

হুগো লরিসের অবসরের পর এসি মিলানের মাইক মেনিওঁ এখন ফ্রান্সের এক নম্বর গোলরক্ষক।

এসি মিলানে তার পারফরম্যান্স ধারাবাহিক। বল প্লেয়িং, গোলকিপার হিসেবে দক্ষতা, পজিশনিং, রিফ্লেক্স— সব মিলিয়ে তিনিই সামলাতে যাচ্ছেন ফ্রান্সের গোলবার।

বিকল্প হিসেবে আছেন অভিজ্ঞ ব্রিস সাম্বা এবং তরুণ রবিন রিসার।

আর্সেনালের উইলিয়াম সালিবা বর্তমানে রক্ষণভাগের মূল ভরসা।

তার সঙ্গে বায়ার্ন মিউনিখের দায়ো উপামেকানো অথবা লিভারপুলের ইব্রাহিমা কোনাটে সেন্টার ব্যাক পজিশনে খেলবেন। লেফট ব্যাকে থিও হার্নান্দেজ এবং রাইট ব্যাকে বার্সেলোনার জুলেস কুন্দে মূল পছন্দ।

সালিবা, কোনাটে, কুন্দে— এই তিনজনের শেকড়ের দিকে তাকালে আবার সেই গল্প। আফ্রিকান

অঁতোয়ান গ্রিজমানের আন্তর্জাতিক অবসর এবং রিয়াল মাদ্রিদের এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গার বাদ পড়া ফরাসি মাঝমাঠে বড় পরিবর্তন এনেছে।

রিয়াল মাদ্রিদের অরেলিয়া চুয়ামেনি এবং আদ্রিয়েন রাবিও মাঝমাঠের মূল দায়িত্ব সামলাবেন। পিএসজির তরুণ ওয়ারেন জাইর-এমেরি এবং রোমার মানু কোণের পাশাপাশি ৩৫ বছর বয়সি অভিজ্ঞ এনগোলো কান্তেও দলে রয়েছেন।

কান্তের গল্পটা যেন রূপকথার মতো। লেস্টার সিটিতে 'ঐতিহাসিক' লিগ, শিরোপা, বিশ্বকাপ— তারপর ইনজুরির দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন।

এখন ফেনারবাচেতে নতুন জীবন। আর ওয়ারেন জায়ের-এমেরি মাত্র বিশ বছর বয়সেই দারুণভাবে পিএসজির মাঝমাঠ সামলাচ্ছেন।

এখানেই ফ্রান্স পৃথিবীর বাকি সব দলের থেকে আলাদা।

২০২২ এর বিশ্বকাপে আট গোল করে এমবাপ্পে জিতেছিলেন গোল্ডেন বুট।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০২২ এর বিশ্বকাপ ফাইনালের সেই রাতে এমবাপ্পে হ্যাটট্রিক করেছিলেন। পুরো বিশ্বকাপে আট গোল করে জিতেছিলেন গোল্ডেন বুট। কিন্তু ট্রফি গেল মেসির হাতে।

রিয়াল মাদ্রিদের কিলিয়ান এমবাপ্পে দলের অধিনায়ক এবং প্রধান ফরোয়ার্ড।

উইংয়ে তার সঙ্গে থাকবেন ব্যালন ডি'অর জয়ী উসমান দেম্বেলে এবং বায়ার্ন মিউনিখের মাইকেল অলিসা।

স্ট্রাইকার পজিশনে ইন্টার মিলানের মার্কাস থুরাম ও মাতেতা বিকল্প হিসেবে থাকবেন।

রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে লা লিগায় গোলের পর গোল করে যাচ্ছেন এমবাপ্পে। এই ২৬ বছর বয়সি ইতোমধ্যেই জিতেছেন বিশ্বকাপ শিরোপা।

বায়ার্ন মিউনিখে মাইকেল ওলিসা যে ফুটবল খেলছেন, তাতে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা লেফট ফুটেড উইঙ্গার হিসেবে দেখা হচ্ছে তাকে।

উসমান দেম্বেলে পিএসজিতে অবশেষে সেই ধারাবাহিকতা খুঁজে পেয়েছেন, যা বার্সেলোনায় অধরা ছিল।

রায়ান শেরকি ম্যানচেস্টার সিটিতে গিয়ে পেপ গার্দিওলার অধীনে আরও শানিত হচ্ছেন।

ব্র্যাডলি বার্কোলা, দেজাইরে দুয়ে — পিএসজির দুই তরুণ, যারা ইতোমধ্যে লিগ ওয়ানে ঝড় তুলেছেন। জিতেছেন উয়েফা চ্যাম্পিয়ানস লিগ।

১৫ ই জুলাই, ২০১৮-এ রাশিয়ার মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ার মধ্যে অনুষ্ঠিত ২০১৮ ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচ চলাকালীন ফ্রান্সের পল পগবা দলের পক্ষে তৃতীয় গোলটি করেন।

ছবির উৎস, Kevin C. Cox/Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ১৫ই জুলাই, ২০১৮-এ রাশিয়ার মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ার মধ্যে অনুষ্ঠিত ২০১৮ ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচ চলাকালীন ফ্রান্সের পল পগবা দলের পক্ষে তৃতীয় গোলটি করেন।

দলের ভেতরের রসায়ন ও শৃঙ্খলা

তারকাবহুল ফরাসি দলে খেলোয়াড়দের পারস্পরিক সম্পর্ক ও ড্রেসিংরুমের শৃঙ্খলা রক্ষা করা সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

অতীতে ২০১০ বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের বিদ্রোহের মতো ঘটনা ফরাসি ফুটবলকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।

কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং উসমান দেম্বেলের ক্লাব ও জাতীয় দলের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব দলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

তবে কামাভিঙ্গার বাদ পড়া নিয়ে দলে কোনো অসন্তোষ তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে ফরাসি গণমাধ্যমে আলোচনা রয়েছে।

কোচ হিসেবে দিদিয়ের দেশম কড়া শৃঙ্খলার জন্য পরিচিত, তাই দলের ভেতরের ইগোর লড়াই নিয়ন্ত্রণ করাই হবে তাঁর প্রধান কাজ।

এত তারকা, এত অহং সামলানো দেশমের সবচেয়ে কঠিন কাজ হতে পারে। ১৯৯৮-এ জাকে এটা পেরেছিলেন। দেশম ২০১৮-এ পেরেছিলেন। ২০২২-এ কিছুটা ফাটল দেখা গিয়েছিল। এবার পারবেন?

দুর্বলতা আছে কি?

মাঝমাঠে গ্রিজমানের মতো একজন অভিজ্ঞ প্লে-মেকার বা গেম মেকারের অভাব এবার ফ্রান্সকে ভোগাতে পারে। শেরকি বা অলিসা সেই জায়গাটা কতটা পূরণ করতে পারবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এছাড়া দেশমের অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক কৌশল মাঝেমধ্যে দলের আক্রমণাত্মক প্রতিভাকে সংকুচিত করে ফেলে।

থিও এরনান্দেজের সৌদি আরবে খেলার বিষয়টা নিয়ে প্রশ্ন আছে। উপামেকানো বায়ার্নে সেই ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেননি, যা প্রত্যাশিত ছিল।

নীল স্বপ্ন চলতে থাকে।

গ্রুপ 'আই'-তে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ সেনেগাল, ইরাক এবং নরওয়ে। খাতা-কলমে ফরাসিদের জন্য নকআউট পর্বে যাওয়া কঠিন কিছু নয়।

তবে এই বিশ্বকাপটি দিদিয়ের দেশমের জন্য শেষ অ্যাসাইনমেন্ট হতে যাচ্ছে। ১৯৯৮ সালে অধিনায়ক হিসেবে যে সোনালি যাত্রার শুরু করেছিলেন, ২০২৬ সালে কোচ হিসেবে সেটির সফল সমাপ্তি টানতে চান দেশম।

জাস্ট ফঁতেন থেকে প্লাতিনি। জিদান থেকে অঁরি। অঁরি থেকে এমবাপ্পে। ফরাসি ফুটবলের একটা নদী আছে- সময়ের সাথে বইছে, নতুন নতুন মোড় নিচ্ছে, কিন্তু থামছে না।

তাই সেই অ্যাপার্টমেন্টগুলোর সাধারণ মানুষদের কাছে এই বিশ্বকাপ কেবল টেলিভিশনের পর্দায় কিছু তারকার দৌড়ঝাঁপ নয়। পিচঢালা সরু গলিতে প্লাস্টিকের বলে লাথি মারা যে কিশোরটি এবারও মায়ের পুরোনো নীল জার্সি গায়ে জড়িয়ে টিভির সামনে বসবে, সে জানে— মাঠে লড়তে যাওয়া ওই ছাব্বিশ জন আসলে তাদেরই প্রতিনিধি। লস অ্যাঞ্জেলেসের ফাইনালের মঞ্চে যদি ফ্রান্স ট্রফি উঁচিয়ে ধরে, তবে সেই জয়োৎসব ওয়াশিংটন বা প্যারিসের রাজপথের চেয়েও বেশি প্রতিধ্বনিত হবে এই অবহেলিত শহরতলিগুলোর অন্ধকার গলিতে।

সেই অপেক্ষায় এই গ্রীষ্মে আমেরিকা, মেক্সিকো, কানাডার মাঠে যখন নীল জার্সি নামবে, বঁদির সেই অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকের জানালাগুলো খুলে যাবে। মানুষ দেখবে। বিশ্বাস করবে।

কারণ এই দলটা শুধু ফ্রান্সের নয়— এটা তাদেরও।

লে ব্লু আসছে।