ব্রাজিলে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত লুলা, সামনে বৈরী কংগ্রেস ও বিভক্ত দেশ

Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

ব্রাজিলের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী লড়াইয়ে প্রবীণ বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুলা ডা সিলভা তার ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারুকে হারিয়ে আবারো নির্বাচিত হয়েছেন।

ভোট গণনা শেষে লুলা পেয়েছেন ৫১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে ফ্লাভিও বলসোনারু পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২৪ শতাংশ ভোট।

মি. বলসোনারু লুলার জয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ফল বাতিলের দাবি করেছেন। যদিও ব্রাজিলের সংবাদপত্রগুলো লুলার জয়কে ঐতিহাসিক হিসেবে বর্ণনা করছে।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এটি লুলা ডা সিলভার চতুর্থ জয়। এর আগে তিনি ২০০৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন।

পরে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আবারও ক্ষমতায় ফেরেন।

তবে রোববারের দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে জয়ের পথ তার জন্য মোটেও সহজ ছিল না।

প্রথম দফার নির্বাচনে ৪ঠা অক্টোবর লুলা ডা সিলভাকে পেছনে ফেলেছিলেন ফ্লাভিও বলসোনারু। মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে লুলা ফলাফল পাল্টে দিতে পারবেন, এমনটা অনেকেই ভাবেননি।

লাতিন আমেরিকায় চলমান বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রবণতারও ব্যতিক্রম ঘটিয়েছেন লুলা। এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের ভোটাররা ক্ষমতাসীনদের প্রত্যাখ্যান করে ডানপন্থীদের দিকে ঝুঁকেছেন।

আর্জেন্টিনা, চিলি ও কলম্বিয়ার মতো বড় দেশগুলোতেও এখন রক্ষণশীল নেতারা ক্ষমতায় রয়েছেন।

প্রথম দফায় পরাজয়ের পর লুলার নির্বাচনী প্রচারণা আবারও গতি পায়। রাজপথে বিক্ষোভ-সমাবেশ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা তার প্রত্যাবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

একসময়ের ধাতুশ্রমিক লুলা ডা সিলভা ১৯৮৯ সালে প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পর থেকেই ব্রাজিলের বামপন্থী রাজনীতির প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

তবে ২০০৩ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এবারই তাকে সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

২০২৭ সালের ৫ই জানুয়ারি শুরু হতে যাওয়া তার নতুন মেয়াদে দেশে ও বিদেশে নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হবে তাঁকে, যার মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈরী মনোভাব।

ট্রাম্প সরাসরি লুলার প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারুকে সমর্থন দেননি। তবে কলম্বিয়া ও হন্ডুরাসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়া ডানপন্থী প্রার্থীদের তিনি সমর্থন দিয়েছিলেন।

ফলে ২১ কোটি ৩০ লাখ মানুষের এই দেশটির নেতৃত্বে একজন রক্ষণশীল নেতাকে দেখতে ট্রাম্প প্রশাসন যে বেশি আগ্রহী ছিল, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ কম।

হোয়াইট হাউজ লাতিন আমেরিকাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয়ের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের নীতির প্রতি সমর্থন জানাবেন- এমন নেতাদের ক্ষমতায় দেখতে আগ্রহী ট্রাম্প প্রশাসন।

একই সঙ্গে পশ্চিম গোলার্ধে চীনের প্রভাব কমাতেও আগ্রহী ওয়াশিংটন।

তেলসমৃদ্ধ ব্রাজিলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরল মৃত্তিকা খনিজের মজুত রয়েছে।

দক্ষিণ আমেরিকার বড় দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিলই একমাত্র দেশ, যার নেতৃত্বে কোনো ডানপন্থী সরকার নেই। লুলা ডা সিলভাকে সাধারণত চীনঘনিষ্ঠ নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ফ্লাভিও বলসোনারু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি ব্রাজিলকে ওয়াশিংটনের আরও ঘনিষ্ঠ করবেন।

অন্যদিকে লুলা ডা সিলভা নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ না করার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ব্রাজিল কখনোই 'অন্য কারও পেছনের আঙ্গিনা' হয়ে থাকবে না।

হোয়াইট হাউজে হতাশা দেখা দিতে পারে, তবে লুলার বিজয়ে স্বস্তি পাবেন পরিবেশবাদীরা। তাদের আশঙ্কা ছিল, বলসোনারু জয়ী হলে ব্রাজিলের প্রভাবশালী কৃষিভিত্তিক ব্যবসা ও খনি খাতের ক্ষমতা আরও বেড়ে যেত।

পরিবেশবাদীরা বলেছেন, ফ্লাভিওর বাবা জাইর বলসোনারুর প্রেসিডেন্ট থাকাকালে আমাজন বনাঞ্চলে বন উজাড় ও দাবানলের ঘটনা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

তাদের আশঙ্কা, ফ্লাভিও ক্ষমতায় এলে শিথিল পরিবেশনীতি আবারও এই গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রের ধ্বংস ডেকে আনতে পারত।

লুলা ডা সিলভার সমর্থকেরা তার বিজয়ে উচ্ছ্বসিত হলেও নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট করেছে যে দেশটি এখনো গভীরভাবে বিভক্ত। ৪৮ শতাংশের বেশি ভোটার ফ্লাভিও বলসোনারুকে বেছে নিয়েছেন।

এতটা বিভক্ত দেশকে ঐক্যবদ্ধ করার চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক যুগের সবচেয়ে ডানপন্থী কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করতে হবে লুলাকে।

নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি অর্জন করেছে বলসোনারুর লিবারেল পার্টি (পিএল)।

তা সত্ত্বেও লুলার ওয়ার্কার্স পার্টি দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের আগে বিশাল জনসমাবেশ আয়োজন করতে সক্ষম হয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে দলটির শক্তিশালী তৃণমূলভিত্তিক সমর্থনের প্রমাণ মিলেছে।

নির্বাচনের আগে লুলা ডা সিলভা এই ভোটকে ব্রাজিলের জন্য 'দুই বিপরীত ধারার মধ্যে বিভাজনরেখা' হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, 'শাসনব্যবস্থার নতুন পদ্ধতি' গ্রহণের মাধ্যমে ব্রাজিলের পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক শিবিরগুলোর মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনবেন।

নির্বাচনের আগে হোয়াটসঅ্যাপে সরাসরি সম্প্রচারিত এক অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেছিলেন, 'এই দেশ আর কখনো আগের মতো থাকবে না'।

শাসনব্যবস্থার সেই নতুন পদ্ধতি ঠিক কী হবে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।

তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, 'সবার জন্য সুযোগ এবং জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী নীতিমালার মাধ্যমে আরও ন্যায়সংগত একটি দেশ গড়ার লড়াইয়ে আমি অবিচল থাকব'।

কিন্তু কংগ্রেসের অধিকাংশ সদস্যের বিরোধিতার মুখে এই লড়াই প্রবীণ নেতা লুলা ডা সিলভার জন্য তার আগের তিন মেয়াদের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

তার চতুর্থ মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় বয়স হবে ৮৫ বছর।