'পুশ-ইন' বন্ধ করতে বিএসএফকে বিজিবির আহ্বান

৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়

ছবির উৎস, BGB

ছবির ক্যাপশান, ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়
    • Author, সজল দাস
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৪ মিনিট

সীমান্তের ওপার থেকে কাউকে জোর করে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা হচ্ছে। আর সেই চেষ্টা ঠেকিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি।

সীমান্তে 'পুশ-ইন' বা জোর করে কাউকে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা কিছুদিন ধরেই প্রতিবেশী দেশ দুটির মধ্যে বেশ উত্তেজনা তৈরি করেছে।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করতেও দেখা গেছে।

এমনকি কদিন আগে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনারহাট সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পালটাপালটি গুলির ঘটনাও ঘটেছে।

দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে একাধিকবার পতাকা বৈঠকেও এর সমাধান হয়নি, বরং দিন দিন এই সমস্যা আরও বড়ো আকার ধারণ করছে।

এমন প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠকে কী বার্তা আসে, সেদিকে নজর ছিল সবারই।

ভারতের নয়াদিল্লিতে গত আটই জুন থেকে ১১ই জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন।

বরাবরই এই বৈঠকে সীমান্ত হত্যা, মাদক চোরাচালান, অবৈধ অভিবাসন, মানবপাচারসহ সীমান্ত সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে বাহিনীগুলো।

সীমান্তের বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে এবারের বৈঠকে 'পুশ-ইন' বা 'পুশ-ব্যাক' ইস্যু অনেক বেশি গুরুত্ব পাবে বলেই মনে করা হচ্ছিল।

আশা ছিল, দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক থেকে এই বিষয়ে একটি কার্যকর সমাধানের পথ মিলবে।

কিন্তু বৈঠক শেষে সীমান্তে জোর করে ঠেলে দেওয়া বা পুশ-ইন ইস্যু সমাধানে তেমন কোনো বার্তা আসেনি।

এমনকি বৈঠকের পর প্রথাগতভাবে যৌথ বিবৃতি না দিয়ে আলাদা আলাদা বিবৃতি দিয়েছে দুই পক্ষ। এই বিষয়টিও ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে না বলেও মত অনেক বিশেষজ্ঞের।

বিজিবির ১৪ সদস্যের প্রতিনিধিদল সম্মেলনে অংশ নেন

ছবির উৎস, BGB

ছবির ক্যাপশান, বিজিবির ১৪ সদস্যের প্রতিনিধিদল সম্মেলনে অংশ নেন

সীমান্তে কি স্বস্তি ফিরবে?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বিভিন্ন জায়গায় পুশ-ইন ইস্যুতে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়ে রয়েছে।

মে মাসের শেষদিক থেকে জুনের প্রথম ভাগ পর্যন্ত সীমান্তের অন্তত ২০টি পয়েন্টে অন্তত ২০০ জন মানুষকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে জানিয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে বিজিবি- বিএসএফ ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল সীমান্তে জোর করে কাউকে ঠেলে দেওয়ার বিষয়টি।

বিশেষ করে বাংলাদেশের দিক থেকে এই বিষয়ে যে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হবে সেটি আগে থেকেই ধারণা করা গিয়েছিল।

শুক্রবার এই বৈঠক নিয়ে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী যে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, সেখানে পুশ-ইন ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান বিএসএফের কাছে তুলে ধরার কথা জানানো হয়েছে।

সীমান্তে পুশ-ইন বন্ধে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ এর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছে বিজিবি।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, "বিজিবির মহাপরিচালক বিএসএফ কর্তৃক রোহিঙ্গা/মিয়ানমার নাগরিকসহ ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে সাম্প্রতিক পুশ-ইন ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন"।

সীমান্ত সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালকএ-ও বলেছেন যে, "পুশ-ইনএর ঘটনা সীমান্ত বিষয়ক যৌথ নির্দেশিকা, সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, পূর্ববর্তী মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে গৃহীত পারস্পরিক সিদ্ধান্তসমূহ এবং বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক নীতি ও প্রটোকলের পরিপন্থী"।

বিজিবি উদ্বেগ জানিয়ে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে আইন ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে।

বিজিবি উল্লেখ করেছে, "যে-কোনো ব্যক্তি যদি বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে যাচাইকৃত হন, তবে তাকে প্রচলিত দ্বিপাক্ষিক প্রত্যাবাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত গ্রহণ করা হবে, প্রচলিত আইন ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে।"

অন্যদিকে বিএসএফের প্রেস বিবৃতিতে, সীমান্ত অবকাঠামো নির্মাণ, সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি এবং নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদারের বিষয় নিয়ে পদক্ষেপের কথা বলা হলেও পুশ ইন বা পুশ ব্যাক ইস্যুতে কোনো বার্তা দেওয়া হয়নি।

এমনকি এবারের বৈঠক শেষে প্রথাগত যৌথ সংবাদ সম্মেলন না হওয়ার বিষয়টিও দুই পক্ষের সমঝোতার বার্তা বহন করেনা বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।

 বিএসএফ-এর মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার (বাঁয়ে) এবং বিজিবি-র মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী (ডানদিকে)

ছবির উৎস, BSF_India

ছবির ক্যাপশান, বিএসএফ-এর মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার (বাঁয়ে) এবং বিজিবি-র মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী (ডানদিকে)

গুরুত্ব পেয়েছে অন্য যে-সব বিষয়

বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের এই সম্মেলনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী।

আর ভারতের ১২ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বিএসএফ-এর মহাপরিচালক শ্রী প্রবীণ কুমার।

মহাপরিচালক পর্যায়ের এই বৈঠকে পুশ-ইন ও পুশ ব্যাক ইস্যু ছাড়াও অবৈধ অভিবাসন, মানবপাচার, সীমান্ত অবকাঠামোসহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে গুরুত্ব পায় সীমান্ত হত্যার বিষয়টিও।

সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে বিএসএফ মহাপরিচালককে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বিজিবি মহাপরিচালক।

অনুপ্রবেশ, সীমান্ত হত্যা ও হামলার ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনতে সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, যৌথ টহল বৃদ্ধি এবং সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি কথা বলা হয়।

আলোচনা হয় অবৈধ অভিবাসন এবং পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিষয়েও।

ভারতের মিজোরাম রাজ্যে পার্বত্য অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্ভাব্য অবস্থান ও বাংলাদেশবিরোধী কার্যক্রমের বিষয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন বিজিবি মহাপরিচালক।

এর জবাবে, সব ধরনের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভারতের 'জিরো টলারেন্স' নীতির বিষয়ে জানান বিএসএফ মহাপরিচালক।

বাংলাদেশি নাগরিকদের অবৈধ অভিবাসন এবং রোহিঙ্গা অবৈধ অভিবাসীদের ভারতে প্রবেশের বিষয়ও তুলে ধরেন বিএসএফ মহাপরিচালক।

এক্ষেত্রে বিএসএফএর মহাপরিপরিচালকের সাথে বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানও তুলে ধরেছেন বিজিবি মহাপরিচালক। কিছু ক্ষেত্রে ভারত থেকে বাংলাদেশে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করা রোহিঙ্গাদের আটকের কথাও জানান তিনি।

আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে নিরাপত্তা বেড়া, গবাদিপশুর বেড়া এবং অন্যান্য কাঠামো নির্মাণে বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

এক্ষেত্রে ১৯৭৫ সালের ভারত–বাংলাদেশ সীমান্ত সংক্রান্ত নির্দেশিকা কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানায় বিজিবি।

মাদকবিরোধী 'জিরো টলারেন্স' নীতি এবং গবাদিপশু চোরাচালান প্রতিরোধের বিষয়ে দুই পক্ষই একমত হয়েছে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়।

এছাড়া সমন্বিত পেট্রোল জোরদার করা এবং ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানোর বিষয়েও দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।