কীভাবে কাজ করছে 'ফসলের হাসপাতাল'?

নেত্রকোনার একটি কৃষক সংগঠন গড়ে তুলেছে অভিনব 'ফসলের হাসপাতাল'

ছবির উৎস, Md Ohidur Rahman

ছবির ক্যাপশান, নেত্রকোনার একটি কৃষক সংগঠন গড়ে তুলেছে অভিনব 'ফসলের হাসপাতাল'
    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৪ মিনিট

বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলার আটপাড়া উপজেলার একটি কৃষক সংগঠন গড়ে তুলেছে 'ফসলের হাসপাতাল', যেখানে কৃষকদের রোগাক্রান্ত শস্যের চিকিৎসা সমাধান দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন এর উদ্যোক্তারা।

তারা বলছেন, ক্ষেতের শস্য পোকা মাকড় কিংবা রোগ বালাইয়ে আক্রান্ত হলে কীটনাশক প্রয়োগ না করে, প্রাকৃতিক উপায়ে পোকা দমন ও বালাই নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তারা কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

"কৃষকরা রোগাক্রান্ত শস্যের স্যাম্পল নিয়ে আমাদের হাসপাতালে আসলে মূলত কোন রোগের জন্য কোন ঔষধ লাগবে এবং সেটা কীভাবে বানানো ও ব্যবহার করতে হবে সেই পরামর্শ দেওয়া হয়," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন 'ফসল হাসপাতাল' ব্যবস্থাপনায় জড়িতদের একজন আবদুল ওয়াদুদ খান।

মি. খান জানিয়েছেন এই পরামর্শ দেওয়ার কাজটি করেন তাদের কৃষক সংগঠনের প্রশিক্ষিত কয়েকজন সদস্য।

নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম বলছেন তারাও এই 'ফসল হাসপাতালের' কথা শুনেছেন এবং এর উদ্যোক্তাদের সমস্যা সমাধানে 'অথেনটিক পরামর্শ' নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কৃষকদের এই ফসল হাসপাতালকে সহায়তা দিচ্ছে বারসিক নামের একটি বেসরকারি সংস্থা। সংস্থাটির নেত্রকোনা অঞ্চলের সমন্বয়ক অহিদুর রহমান বলছেন, ব্যতিক্রমী এই হাসপাতালে সবজি চাষ করা কৃষকরাই বেশি আসেন এবং সেখান থেকে তারা সমস্যা সমাধানে পরামর্শ ও সহায়তাও পেয়ে থাকেন।

উদ্যোক্তারা অবশ্য বলছেন, ধান চাষিরা হাসপাতালটিতে কম আসেন, কারণ তারা কীটনাশকেই বেশি নির্ভর করতে চান। তবে অন্য অনেক শস্য চাষের ক্ষেত্রে কৃষকরা নিয়মিতই 'ফসল হাসপাতালে' এসে পরামর্শ নিয়ে থাকেন।

কৃষকদের জন্য অভিজ্ঞ প্রশিক্ষিত ব্যক্তিরা আছেন এই ফসলের হাসপাতালে

ছবির উৎস, Md Ohidur Rahman

ছবির ক্যাপশান, কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয় এই ফসলের হাসপাতালে

কীভাবে গড়ে উঠেছে 'ফসল হাসপাতাল'

নেত্রকোনা জেলার আটপাড়া উপজেলায় গড়ে ওঠা এই ফসল হাসপাতালের মূল্য উদ্যোক্তা একটি কৃষক সংগঠন। 'বাঘড়া হাওর কৃষক সমিতি' নামে ওই সংগঠন প্রায় দেড় দশক আগে 'ফসল হাসপাতালটির' গোড়াপত্তন করে।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

এর উদ্যোক্তাদের একজন আব্দুল ওয়াদুদ খান বলেছেন ২০১০-১১ সালের দিকে ফসলের পোকা-মাকড় সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে করতেই ফসল হাসপাতালের ধারণাটি তাদের মধ্যে তৈরি হয়।

"আমরা তখন মুরুব্বিদের সাথেও কথা বলি। যাদের কৃষিকাজে অনেক অভিজ্ঞতা। কৃষকরা অভিজ্ঞতার আলোকে চাষাবাদের ক্ষেত্রে অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। এরপর আমরা ভাবলাম মানুষ কিংবা পশুর জন্য হাসপাতাল থাকলে ফসলের জন্যও হতে পারে,"বলছিলেন মি. খান।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "তখনি সিদ্ধান্ত হলো যে একটি ফসল হাসপাতাল আমরা করতে পারি যেখানে রোগাক্রান্ত ফসল নিয়ে কৃষক আসবে এবং প্রয়োজনীয় করণীয় সম্পর্কে সমাধান পাবে"।

তিনি বলেন, 'ফসল হাসপাতাল' প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাদের মূল্য উদ্দেশ্যই ছিল সার বা কীটনাশক ব্যবহার না করেও যে ক্ষেতের ফসলকে রোগমুক্ত করা যায় ও ফসল নিরাপদ রাখা যায় তা নিয়ে কৃষকদের উৎসাহিত করা।

'ফসল হাসপাতালের' সঙ্গে জড়িত আরেকজন কৃষক সায়েদ আহমেদ খান বাচ্চু বলছেন কোনো শস্য বালাই আক্রান্ত হলে হাসপাতাল থেকে তাদের যথাযথ বালাই নাশক কোনটা হবে এবং সেটি কীভাবে তৈরি করতে হবে সে সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া হয়।

"আমরা ৫/৭ জনকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়েছি। তারা একেকজন একেক বিষয়ে প্রশিক্ষিত। কেউ শস্যের জাত, কেউ পোকামাকড় দমন, কেউ বা জাত সংরক্ষণ – এমন পাঁচটি বিষয়ে তারা পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কোন শস্যে কোন পোকামাকড় তা দেখে সেভাবেই বালাই নাশক বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয় কৃষকদের," বলছিলেন তিনি।

উদ্যোক্তারা বলছেন, ৫টি বিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয় ফসলের হাসপাতালে

ছবির উৎস, Md Ohidur Rahman

ছবির ক্যাপশান, উদ্যোক্তারা বলছেন, পাঁচটি বিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয় ফসলের হাসপাতালে

ওই হাসপাতালের সঙ্গেই কাজ করছেন স্থানীয় কৃষক মোহাম্মদ নইম মিয়া। তার দাবি, বালাইনাশক বা জৈব সার ব্যবহারের পাশাপাশি বিভিন্ন জাত সংরক্ষণ নিয়েও তারা কাজ করছেন।

হাসপাতালটির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা বারসিকের কর্মকর্তা অহিদুর রহমান বলছেন, একটি কৃষক সংগঠনই এই হাসপাতালটি পরিচালনা করছে এবং ফসলের রোগ বালাই হলে কৃষকরা সেখানে নিয়ে আসছে।

"ফলে তাদের মধ্যে একটি আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। বীজ সংরক্ষণ, বালাই নাশক, ফসলের রোগ- এমন পাঁচটি বিষয়ে অভিজ্ঞ প্রশিক্ষিত ব্যক্তিরা সেখানে কাজ করছেন। কোন রোগের সমাধান কীভাবে হতে পারে তার একটি চার্ট তৈরি করে সেটি অনুসরণ করে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। পুরো ব্যাপারটিই আসলে প্রাকৃতিক ও পরিবেশ সম্মত। এটি জমির গুণাগুণ রক্ষায় সহায়ক হচ্ছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. রহমান।

একই সঙ্গে এই হাসপাতাল পরিচালনার সাথে জড়িতরা কীটনাশক ছাড়া চাষাবাদ করছেন এবং একই সঙ্গে অন্য কৃষকদের এ বিষয়ে সচেতন করছেন বলে জানান তিনি।

ধানের খেতে কাজ করছেন চারজন কৃষক

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ফসলের হাসপাতালের উদ্যোক্তরা বলছেন সার বা কীটনাশক ছাড়া চাষাবাদে ধানচাষিদের আগ্রহ কম

নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক আমিরুল ইসলাম বলছেন, কৃষি ও কৃষকের জন্য যে কোনো ভালো উদ্যোগকেই তারা ইতিবাচক বলে মনে করেন।

"আমাদের কাছে তারা এসেছিল। আমরা শুধু বলেছি যে যারা পরামর্শ দেবেন তারা যেন কৃষককে অথেনটিক (নির্ভরযোগ্য) পরামর্শ দেন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের কৃষকরা চাষাবাদের সার বা কীটনাশকের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিশেষ করে ধানের ক্ষেত্রে সারের ব্যাপক ব্যবহার হয়। যদিও সারের ব্যবহার ফসলের উৎপাদন বাড়ালেও বেশি ব্যবহারের কারণে জমির উর্বরতা কমে যায় বলে কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন।

আবার বেশি সার কিংবা কীটনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে ফসলের জন্য ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ মারতে গিয়ে অনেক উপকারী পোকামাকড় ধ্বংস হওয়ায় সার-কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ে সমালোচনাও আছে অনেক।

এমনকি সার কীটনাশক এখন জনস্বাস্থ্যেও প্রভাব ফেলছে বলে কৃষি বিভাগ বরাবরই সহনীয় পর্যায়ে সার কীটনাশক ব্যবহারে জোর দিয়ে আসছে।

অনেক সময় কৃষকরা অধিক ফলনের জন্য জমিতে বেশি পরিমাণে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করছেন। আবার কীটনাশক দেওয়ার পর নির্দিষ্ট পরিমাণ সময় অপেক্ষা না করেই ফসল তোলা হচ্ছে যা মানবদেহের জন্য বিপজ্জনক বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন।

এখন নেত্রকোনার 'ফসল হাসপাতালের'র উদ্যোক্তারা বলছেন, স্বল্প পরিসরে হলেও তারা এই হাসপাতালের মাধ্যমে জৈব সার ও প্রাকৃতিক বালাইনাশক দিয়েই যে ভালো ফলন সম্ভব সেটিই কৃষকদের জানানোর চেষ্টা করছেন।