আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
'যেদিন কম সেদিন সাত ঘণ্টা, কোনো দিন আবার ১০ ঘণ্টারও বেশি হয় লোডশেডিং'
- Author, মুকিমুল আহসান
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
"রাত থেকে ভোর পর্যন্ত চার থেকে পাঁচ বার বিদ্যুৎ যায়। দিনে রাতে অর্ধেকের বেশি সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। একদিকে গরম যেমন বাড়তেছে, সেই সাথে লোডশেডিংও। যেদিন কম সেদিনও সাত ঘণ্টা, কোনদিন আবার ১০ ঘণ্টারও বেশি হয় লোডশেডিং"।
মেহেরপুরের আমঝুপির বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে বিবিসি বাংলার কাছে এই অভিজ্ঞতা জানাচ্ছিলেন সেখানকার ব্যবসায়ী আসাদুজ্জামান লিটন।
ঢাকার বাইরে কয়েকটি জেলার বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত তিন চারদিন থেকে সারাদেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। দিন ও রাতের বড় একটা সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।
বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন জেলার পৌর এলাকার বাইরে যে সব এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বিদ্যুৎ সরবারহ করে থাকে সে সব জায়গায় লোডশেডিংয়ের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারাও অবশ্য সেটি মানছেন। তারা বলছেন, কোথাও লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৩০ শতাংশ থেকে ৪৬ শতাংশ পর্যন্তও বাড়ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এই তিন মাস দেশে গরম যেমন বাড়ে, তেমনি বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ে। তবে এবার জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির সংকট তৈরি হওয়ার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয় রোধে অফিসের সময় কমানো, শপিং মল দ্রুত বন্ধ করাসহ নানা প্রচেষ্টা শুরু করেছে সরকার। কিন্তু লোডশেডিং পরিস্থিতির কারণে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, সেসব ব্যবস্থা কতটা কাজে লাগছে।
যদিও এই সংকট কাটাতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড।
সংস্থাটি বলছে, জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেশিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কিছুটা কমছে। সেটি রক্ষণাবেক্ষণ করে দ্রুত পুরোদমে উৎপাদন শুরুর চেষ্টা করছে সরকার।
শহরের বাইরে বেশি লোডশেডিং
এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ার কারণে গরম ছিল তুলনামূলক কম। গত রোববারের পর থেকে আস্তে আস্তে গরম বাড়তে শুরু করেছে সারাদেশে।
বিবিসি বাংলার পক্ষ থেকে মেহেরপুরের আসাদুজ্জামান লিটনের সাথে যখন কথা হয় তখন সেখানকার পরিস্থিতি তিনি বর্ণনা করেন।
মি. লিটন বলছিলেন, "আজ (বুধবার) সকাল ৯টায় কারেন্ট গিয়ে ১০টায় আসছে, ১১টায় আবার গিয়ে ১২টায় আসছে। পরে একটার দিকে আবার কারেন্ট গিয়ে সেই কারেন্ট এসেছে বিকাল তিনটায়। এরপর তিনটা থেকে সাড়ে চারটা পর্যন্ত ছিল। সাড়ে চারটায় গিয়ে সাড়ে পাঁচটায় আবার কারেন্ট আসছে"।
মি. লিটন জানান, তিনি যে এলাকায় থাকেন সেটি শহর বা পৌরসভার বাইরে। পৌরসভার বাইরের বিদ্যুৎ সরবারহ করে থাকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। আর শহরের বাইরেই এই লোডশেডিং সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
"গতকাল (মঙ্গলবার) সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত চারবার লোড শেডিং হয়েছে। প্রত্যেকবারই এক থেকে দুই ঘণ্টা করে লোডশেডিং হয়। প্রচণ্ড গরম, ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি তাপমাত্রা। কারেন্ট গেলে বাসার বাইরে বের হতে হয়। হাতপাখা দিয়ে বাতাস করা ছাড়া আর উপায় নাই", বলছিলেন মি. লিটন।
পৌর এলাকার বাইরে লোডশেডিং পরিস্থিতি বেশি খারাপ হলেও শহরের মধ্যে তুলনামূলক লোডশেডিং কম বলে জানান মেহেরপুর শহর এলাকার বাসিন্দা রাশেদুজ্জামান।
বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, তাদের পৌর এলাকায় সর্বোচ্চ দুই থেকে তিনবার বিদ্যুৎ যায়, যেটি গ্রামের তুলনায় অনেক কম।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মেহেরপুর জোনের জেনারেল ম্যানেজার স্বদেশ কুমার ঘোষও এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
মি. ঘোষ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমাদের টোটাল যে ডিমান্ড আছে তার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ লোডশেডিং হচ্ছে। আমরাও বিদ্যুৎ কম পাচ্ছি, সে জন্য লোডশেডিং হচ্ছে"।
তার হিসাব অনুযায়ীই, গত দুই দিনে গড়ে ছয় থেকে আট ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ থাকছে না পৌর এলাকার বাইরে।
লালমনিরহাট থেকে ফারাহ ফিবা নামে একজন গৃহিণী জানান, তিনি যে এলাকায় থাকেন সেটি পৌরসভার মধ্যে। পৌর এলাকায় থাকায় দিনে দুই তিনবার, কিংবা কখনো তারও কম লোডশেডিং হচ্ছে। তবে শহরের বাইরে তার পরিচিত যারা আছেন তাদের অভিযোগ লোডশেডিং বাড়ছে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার হেমসেন লেন এলাকার একজন বাসিন্দা জানান, গত কয়েকদিন ধরেই বার বার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার বিকাল নাগাদ অন্তত চার বার লোডশেডিং হয়েছে।
ময়মনসিংহের স্থানীয় সাংবাদিক আতাউর রহমান জুয়েল জানান, সম্প্রতি বিভাগের সব জেলাতেই লোডশেডিং বেড়েছে বলে অভিযোগ আসছে। বিভাগের ছয় জেলায় দিনে গড়ে ১০৭৫ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৩২৫ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুতের ঘাটতি হচ্ছে বলে পিডিবি সূত্রের বরাত দিয়ে জানান তিনি।
পরিস্থিতি আসলে কেমন?
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ বা পিজিসিবি এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বা পিডিবি'র গত কয়েক দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পিক আওয়ারে (সর্বোচ্চ চাহিদার সময়) সারা দেশে লোডশেডিং এক হাজার ৮০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
পিডিবির গত কয়েক দিনের তথ্য বলছে, এই মাসের প্রথমার্ধে দেশে দিনে ও রাতে গড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।
১৪ই এপ্রিল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ চাহিদার সময় সারা দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে ১৪ হাজার ৮০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। সেই হিসেবে এই সময়ে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ৬৮৮ মেগাওয়াট।
পরদিন অর্থাৎ বুধবার বিকাল তিনটায় সারাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে এই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৬৭০ মেগাওয়াট। পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে সারাদেশে লোড শেডিংয়ের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৮৪৩ মেগাওয়াট।
গত কয়েক সপ্তাহের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বুধবারের এই লোডশেডিংয়ের পরিমাণ চলতি মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য মো. জহুরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "গত কয়েকদিনে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হচ্ছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কিছু মেশিন রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। তাছাড়া জ্বালানি সংকটও রয়েছে। যে কারণে চাহিদা থাকলে সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না"।
পিজিসিবি'র ওয়েব সাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে সারাদেশের লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় শূন্যের কোটায়। সেটা গরম বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে শুরু করেছে।
এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ অর্থাৎ আট এপ্রিলের পর থেকে সেটি আস্তে আস্তে বাড়তে শুরু করে। প্রথম সপ্তাহে খুব সামান্য লোডশেডিং থাকলেও দ্বিতীয় সপ্তাহে সেটি বেড়ে গড়ে ৭০০-৯০০ মেগাওয়াটে পৌঁছায়।
আর ১৫ই এপ্রিল থেকে সেটি বেড়ে ১৮০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বেড়েছে।
এবার আশঙ্কা আরও বেশি
পিডিবি ও পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশের বর্তমানে ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র (আমদানিসহ) রয়েছে। এগুলোর সর্বমোট স্থাপিত সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট।
পিডিবির ওয়েবসাইট বলছে, এর বিপরীতে প্রতিদিন দিন গড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাকি অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না মূলত জ্বালানি সংকটের কারণে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত সময়ের বকেয়া পরিশোধ, জ্বালানি তেলের সংকটসহ নানা কারণে এবার গরমে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি বেশ খারাপের দিকে যেতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ফার্নেস অয়েল প্রয়োজন। সেটির একটি সংকট আছে। এছাড়াও গ্যাসসহ জ্বালানি সংকট রয়ছে। যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে"।
গত এক মাসের তথ্যে দেখা গেছে, দিনের বেলার তুলনায় সন্ধ্যা বা রাতের পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি। যে কারণে দিনের তুলনায় রাতে লোডশেডিংয়ের পরিমাণও বেশি।
সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, ১৫ই এপ্রিল বিকেল তিনটায় দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৩ হাজার ১১২ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য মো. জহুরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "যুদ্ধের কারণে কয়লা ও তেলের সাপ্লাই চেইনে সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে কয়লার জন্য আমাদের দুইটা মেশিন আন্ডার লোডে চলতেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সেটি আর থাকবে না"।
তিনি বলছিলেন, অন্যদিকে গ্যাস সংকটের কারণেও উৎপাদন কমছে। সেটি আরেকটু বাড়ানো গেলে লোডশেডিং আরো কমানো যেতো।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিমের আশঙ্কা, এবার যদি গরম বাড়ে, তাহলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি অনেক বেশি খারাপের দিকে যেতে পারে।