তৃণমূল কংগ্রেসের ৫৮ জন বিধায়ক 'বিদ্রোহী', বহিষ্কৃত ঋতব্রত হলেন বিরোধী দলনেতা

Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী ৮০ জন তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন দলের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন বুধবার। তাদের নেতা হিসাবে দল থেকে বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জীকে পরিষদীয় দলনেতা হিসাবে মেনে নিয়েছেন, তাকে বিরোধী দলনেতার মর্যাদা দিয়ে দিয়েছেন বিধানসভার স্পিকারও।

সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর মনোনীত পরিষদীয় দলের বিরুদ্ধে গিয়ে এই পদক্ষেপ তৃণমূলের 'ফাটল'কে আরো স্পষ্ট করে দিল।

গত কদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙনের যে জল্পনা চলছিল, তার অবসান হলো আজ।

এরপরেই তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে দলের এবং শাখা সংগঠনগুলির সব স্তরের কমিটি ভেঙে দিয়েছে। প্রতিটা স্তরে পর্যালোচনা করে তার পরে নতুন করে কমিটিগুলি গড়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

তৃণমূলের টিকিটে জিতে আসা ৫৮জন বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জীকে বিরোধী দলনেতা হিসাবে বেছে নেওয়ার পক্ষে স্বাক্ষর করে একটা চিঠি জমা দেন বিধানসভার স্পিকারের কাছে। সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।

এর আগে তৃণমূলের পক্ষ থেকে দলের বর্ষীয়ান নেতা শোভনদেব চ্যাটার্জীর নাম বিরোধী দলনেতা হিসাবে প্রস্তাব করা হয়েছিল। সেই প্রস্তাবনায় যে স্বাক্ষর রয়েছে সেখানে 'অসংগতি' রয়েছে বলে অভিযোগ জানিয়েছিলেন ঋতব্রত ব্যানার্জী এবং তৃণমূলের টিকিটে জিতে আসা অপর বিধায়ক সন্দীপন সাহা।

এই তথ্য রাজ্যের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রকাশ্যে আনার পর দু'জনকে তড়িঘড়ি বহিষ্কার করে দল।

বিধানসভায় সকাল থেকে যা হলো

বুধবার সকাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় উপস্থিত হন একের পর এক তৃণমূল বিধায়ক। সাংবাদিকদের সামনে সেই সময় কেউ কোনো মন্তব্য না করলেও, বুধবার পরিষদীয় দলনেতা বেছে নেওয়ার জন্যেই যে এই 'বিদ্রোহী' বিধায়করা বৈঠক করবেন, সে বিষয়ে অনুমান করেছিলেন অনেকে।

ঋতব্রত ব্যানার্জী বিধানসভায় প্রবেশের সময়ও উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান কোনো 'জল্পনায়' 'ইন্ধন' দিতে প্রস্তুত নন তিনি। তবে সে সময় সন্দীপন সাহা জানিয়েছিলেন, তাদের কাছে "দুই তৃতীয়াংশের বেশি বিধায়কদের সমর্থন রয়েছে।"

ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই সোমবার থেকে যে জল্পনা চলছিল, তা-ই বাস্তবায়িত হতে দেখা যায়।

বিধানসভার স্পিকারের কাছে পরিষদীয় দলনেতা বেছে নেওয়ার জন্য চিঠি জমা দেওয়া হয়। ওই চিঠিতে উপ দলনেতা এবং মুখ্য সচেতকের নামও উল্লেখ রয়েছে। এই চিঠিতে মমতা ব্যানার্জীকে দলনেত্রী হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে বিরোধী দলনেতা করা হয়েছে ঋতব্রত ব্যানার্জীকে।

পরে জানানো হয় সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।

বুধবার বিকেলে বিরোধী দলনেতার মর্যাদা পাওয়ার পর ঋতব্রত ব্যানার্জী জানান, তৃণমূলের হয়েই তিনি এই ভূমিকা পালন করবেন। তিনি জানিয়েছেন, তাদের পক্ষে থাকা বিধায়কদের সংখ্যা আরো বাড়তে চলেছে।

তিনি বলেছেন, "যদি কিছু ঠিক না হয় তাহলে হাউজের ভিতরে এবং বাইরে বিরোধিতা করব। আবার পজিটিভ কিছু হলে শুধুমাত্র বিরোধিতা করার জন্যই বিরোধিতা করব না।"

"মমতা ব্যানার্জীকে আমাদের প্রধান পরামর্শদাতার ভূমিকায় থাকার অনুরোধ জানাব। মমতাদি থাকলে ভাল কাজ করতে পারব।"

যে সমস্ত তৃণমূল বিধায়করা বুধবার ঋতব্রত ব্যানার্জীকে পরিষদীয় দলনেতা হওয়ার প্রস্তাবনায় স্বাক্ষর করেছেন, সেই তালিকায় মমতা ব্যানার্জীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত এবং সদ্য প্রাক্তন মন্ত্রী জাভেদ খানও আছেন। রয়েছেন কেশপুরের বিধায়ক শিউলি সাহা, সুজাপুরের বিধায়ক সাবিনা ইয়াসমিন, রঘুনাথগঞ্জের বিধায়ক আখরুজ্জামানের মতো বহু পরিচিত তৃণমূলের নেতাও।

কী বলল তৃণমূল কংগ্রেস?

ঋতব্রত ব্যানার্জীকে পরিষদীয় দলনেতা হিসাবে বেছে নেওয়ার এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ।

তিনি প্রশ্ন তুলেছেন দল ইতিমধ্যে ঋতব্রত ব্যানার্জীকে বহিষ্কার করেছে। সেক্ষেত্রে তিনি কীভাবে তৃণমূলের বিরোধী দলনেতা হতে পারেন?

পাশাপাশি কুণাল ঘোষ প্রশ্ন তুলেছেন, "যারা জিতেছেন, যারা এটা করলেন তারা কিন্তু মমতা ব্যানার্জীর আশীর্বাদে জিতেছেন, তার ছবি ব্যবহার করেই জিতেছেন। এটা ভুলে গেলেন কী করে?"

তিনি জানিয়েছেন এই ঘটনায় দল কী পদক্ষেপ নেবে, আইনি পথে যাবে কি না তা শীঘ্রই জানানো হবে।

কুণাল ঘোষ আবার বলেছেন, "এইভাবে চোরাগোপ্তা পথে এসব করার কী দরকার ছিল? আমাদের দল কী করবে সেটা ঠিক করা হবে। গতকাল আমরা নিয়ম মাফিক একটা চিঠি জমা দিয়েছি বিধানসভায়, এদের মতো চোরাগোপ্তা পথে দিইনি।"

ঋতব্রত ব্যানার্জীকে সিংহভাগ তৃণমূল কংগ্রেস পরিষদীয় দলনেতা হিসাবে বেছে নেওয়ার পরে এক বিবৃতি দিয়ে দলটি জানিয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গে দলের সব স্তরের কমিটি তারা ভেঙে দিচ্ছে। শাখা সংগঠনগুলির কমিটিও ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

এরপরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ভুলক্রুটি বিশ্লেষণ করবে দলটি। তারপরে আবার নতুন করে কমিটি গড়া হবে।

বিধায়কদের সইতে অসংগতি দিয়ে শুরু

ভোটের পরে তৃণমূলের পক্ষ থেকে বিরোধী দলনেতা হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল শোভনদেব চ্যাটার্জীকে। উপদলনেতা ছিলেন অসীমা পাত্র ও নয়না ব্যানার্জী এবং পরিষদীয় দলের মুখ্য সচেতক হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হয় ফিরহাদ হাকিমকে।

বিরোধী দলনেতা বেছে নেওয়ার ওই প্রস্তাবনায় তৃণমূলের বিধায়কদের স্বাক্ষরকে ঘিরে 'সমস্যার' সূত্রপাত। স্বাক্ষরে অসংগতির অভিযোগ তোলেন ঋতব্রত ব্যানার্জী ও সন্দীপন সাহা।

এই মর্মে হেয়ার স্ট্রিট থানায় অভিযোগ দায়ের হয়, পরে মামলার তদন্তভার সিআইডি-র হাতে তুলে দেওয়া হয়।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সোমবার জানান, তদন্তের সময় দেখা গিয়েছে একাধিক স্বাক্ষর ইংরেজির ক্যাপিটাল লেটারে এবং সিআইডি-র তদন্তের সময় বেশ কয়েকজন বিধায়ক বলেছেন প্রস্তাবনায় থাকা স্বাক্ষর তাদের নয়।

এই বিষয়কে ঘিরে আলোচনা চলছিল। একইসঙ্গে চলছিল তৃণমূলের অন্দরে 'ভাঙন' নিয়ে আলোচনাও।

কারণ ভোটে ভরাডুবির পর তৃণমূলের একাধিক নেতা ও কর্মীরা দলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সরব হয়েছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম ছিল অভিষেক ব্যানার্জী ও তৃণমূল কংগ্রেসের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের বিরুদ্ধে অভিযোগ।

সই নিয়ে 'অসংগতি'র কথা প্রকাশ্যে আসার পর 'বিদ্রোহ' ঘোষণাকারী তৃণমূলের বিধায়কদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

মঙ্গলবার মমতা ব্যানার্জী যে ধর্নার ডাক দিয়েছিলেন সেখানে নয়না ব্যানার্জী, কুণাল ঘোষের মতো কয়েকজন বিধায়ক এবং তৃণমূল নেতাদের দেখা গেলেও অনেকেই অনুপস্থিত ছিলেন।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

অন্যদিকে, যারা তৃণমূলের অন্দরের বিভিন্ন 'সমস্যার' কথা জানিয়ে 'বিদ্রোহ' ঘোষণা করেছেন কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী তাদের প্রতি আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, "২০১৬ সালে কংগ্রেস যখন বিরোধী দলের তকমা পেয়েছিল তখন মমতা ব্যানার্জী এইভাবে দলটাকে ভাঙিয়ে, ভয়-ভীতি, প্রলোভন দেখিয়ে তৃণমূলে নিয়ে গিয়েছিল। আজ ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে মমতা ব্যানার্জীর দল খান খান হয়ে গেছে।"

"যারা তৃণমূলকে ভালবেসে দল করেছেন, মার খেয়েছেন তারা আসুন কংগ্রেসের দরজা আপনাদের জন্য খোলা। আমরা আলোচনায় বসি, বিজেপি এবং এই তথাকথিত তৃণমূলের বিরুদ্ধে একটা প্লাটফর্ম গড়ে তুলি," বলেছেন মি. চৌধুরী।

বিজেপির সুকান্ত মজুমদার আবার বার্তা সংস্থা এএনআইকে বলেছেন, "যে দলের কোনো মতাদর্শ নেই, সেই দলের এমনটাই হওয়ার ছিল। এ কথা আমরা অনেকদিন থেকেই বলে আসছি।"