মিষ্টির পর ইশরাক: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, নাকি দল সামলানোর চেষ্টা তারেক রহমানের?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশের সরকারি দল বিএনপির একজন নেতা এমপি পদ ছাড়তে বাধ্য হন এ মাসের শুরুতে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন আরেকজন। দুটি পদত্যাগের পেছনেই তারেক রহমানের নির্দেশের আলোচনা সামনে এসেছে।

ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে গত পহেলা অক্টোবর জাতীয় সংসদের সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন দলের মনোনয়নে সংরক্ষিত আসনে এমপি হওয়া ফেরদৌস আহমেদ মিষ্টি।

সারাদেশে আলোচনার জন্ম দেওয়া ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই 'অস্ত্র হাতে মাদক বিরোধী অভিযান চালিয়ে' বিতর্কে আসা প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনও প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়েন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদত্যাগ করেছেন বলে যেমন আলোচনা রয়েছে, আবার মি. হোসেন দাবি করেছেন তিনি নিজেই পদত্যাগের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো এ দুটি ঘটনার পর কী বার্তা দিতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান?

তিনি কী দলের ভেতরে ক্রমশ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়া নেতাদের সামলানোর চেষ্টা থেকে এই পদক্ষেপ নিয়েছেন? 'বিতর্ক তৈরি করলেই' পদ হারাতে হবে- এই বার্তা দিতে চেয়েছেন দলের নেতাদের?

নাকি শুধু দল ও সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টা করেছেন তিনি?

যদিও দলের ভেতরে এই আলোচনাও আছে যে মি. হোসেনের 'অস্ত্র হাতে মাদক বিরোধী অভিযান' আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতাকেই তুলে ধরেছে যা দলের প্রভাবশালী একটি অংশকে ক্ষুব্ধ করেছে। মি. হোসেন প্রকাশ্যেই বলেছেন, মাদক নিয়ে পুলিশকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ অবশ্য বলছেন, সব জায়গাতে এত নৈরাজ্য যে সামাল দেওয়া কঠিন এবং সে কারণে হয়তো প্রধানমন্ত্রী 'স্যাম্পল অ্যাকশন' বা প্রতীকী ব্যবস্থা নিয়েছেন। তার মতে, এই ব্যবস্থা দল ও সরকারের জন্য ইতিবাচক হবে।

আরেকজন বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবকে উপাচার্য কামরুল আহসান বলছেন, সরকারের খুব অল্প সময়ের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত বলছে যে তিনি তা উপলব্ধি করতে পারছেন।

বিএনপি যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপ একটিই বার্তা দিচ্ছে, তা হলো অন্যায় বা অপরাধ করে কেউ রেহাই পাবে না।

পদত্যাগের ঘোষণা দেয়ার পর সোমবার বিকেলে ঢাকায় অবৈধ মাদক বিরোধী মিছিল বের করেন ইশরাক হোসেন
ছবির ক্যাপশান, পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পর সোমবার বিকেলে ঢাকায় অবৈধ মাদক বিরোধী মিছিল বের করেন ইশরাক হোসেন

ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ও ইশরাক হোসেন, কিছু প্রশ্ন

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই সারাদেশে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়াসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ উঠেছিল।

তখন বিভিন্ন সময়ে দলটি তার তিন হাজারেরও বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পরেও বিএনপি তার নেতাকর্মীদের কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে সেই প্রশ্ন জোরালো হয়ে উঠছে।

বিরোধী দলগুলো থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির যে দাবি উঠে আসছিল, সেখানেও বিএনপি নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে সরকারি ব্যর্থতাই প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে।

যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যানই করে আসছেন। এমনকি, আইনশৃঙ্খলা ক্রমশ উন্নতি হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।

কিন্তু এর মধ্যেই গত ২৪শে সেপ্টেম্বর ঢাকার মিরপুরে স্বল্প আয়ের পরিবারের নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া বেসরকারি সংস্থা রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি এর কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা আলোচনা তৈরি করে।

এর পরপরই আলোচনায় আসে ইউটিউবার সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা। দুইটি ক্ষেত্রেই দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে, সঙ্গে আঙ্গুল ওঠে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার।

রাড্ডার ঘটনায় জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের এমপি ফেরদৌসি আহমেদ মিষ্টি এমপির নাম সামনে উঠে আসে। পরে এ নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে পহেলা অক্টোবর পদত্যাগ করেন মিজ আহমেদ।

সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ার পাঁচ মাসের মাথায় পদত্যাগ করেছিলেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি
ছবির ক্যাপশান, সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ার পাঁচ মাসের মাথায় পদত্যাগ করেছিলেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি

এসব ঘটনার জের ধরে বিএনপি দলীয় কর্মীদের দখল-চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে সরকারের কঠোর সমালোচনা করে রাজনৈতিক দলগুলো।

সেইসাথে সামাজিক মাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চোখে পড়ে।

এসবের রেশ কাটতে না কাটতেই গত শনিবার অস্ত্র হাতে অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীদের ধাওয়া করার একটি ভিডিও নিজেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেন ইশরাক হোসেন।

এর আগে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির পেছনে দৌড়ানো, জিয়াউর রহমানের মাজারে গিয়ে ঠেলাঠেলি কিংবা জাতীয় স্মৃতি সৌধে তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে স্যালুটে অংশগ্রহণের মতো বিষয়গুলো নিয়েও গত কয়েক মাসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ট্রলের শিকার হন তিনি।

এবার তার অস্ত্র হাতে দৌঁড়ানোর ভিডিও সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় সরকারের ভেতরে ও বাইরে।

ওই ভিডিও ও পরে এ নিয়ে করা মন্তব্যে তিনি স্পষ্টতই মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারি ব্যর্থতাকে সামনে নিয়ে এসেছেন, যা সরকারের ভেতরে অনেককে ক্ষুব্ধ করেছেন বলে ধারণা পাওয়া গেছে।

দলের একজন নেতা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "ইশরাক মাদক নিয়ে যা বলেছেন তা তো ভুল না। মাদকের ভয়াবহ বিস্তার তো বাস্তবতা। পুলিশ বা প্রশাসন তো কিছুই করতে পারছে না। ফলে ইশরাককে শুরুতেই পদত্যাগ না করিয়ে শোকজও করা যেত। কিন্তু হয়তো মনে করা হয়েছে হিরোইজমকে সামাল না দিলে ভবিষ্যতে এটি দলের ভেতরে প্রবণতা হয়ে উঠতে পারে"।

রাড্ডা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল সরকার
ছবির ক্যাপশান, রাড্ডা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল সরকার

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন ইশরাককে পদত্যাগ করতে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন কি-না তা তো সরকার স্পষ্ট বলেনি।

"দলের কিছু নেতার আচরণ ও পরিমিতিবোধের অভাব খুবই দৃষ্টিকটু লাগে। যদিও ইশরাক বলেছেন, তিনি ভুল করেননি। ফলে বিএনপির ভেতরে এসব নিয়ে কী হচ্ছে তার তো একটা ধারণা পাওয়া যায়," বলছিলেন তিনি।

কেউ কেউ মনে করছেন, ফেরদৌস আহমেদ মিষ্টি ও ইশরাক হোসেনের ঘটনাটি সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার পাশাপাশি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টাও হতে পারে।

যদিও দলের ভেতরে সবার প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এসব ব্যবস্থা হচ্ছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

"ফেরদৌস আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগ করানো হলো। কিন্তু মিরপুরের একজন এমপি রাড্ডায় হামলার সাফাই গেয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন ঘটনার পর। তার বিষয়ে তো কোনো ব্যবস্থা আমরা দেখিনি। অর্থাৎ বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও কার বিষয়ে কেমন ব্যবস্থা হবে সেটাকে প্রভাবিত করে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মহিউদ্দিন আহমদ।

কামরুল আহসান বলছেন, গণপ্রত্যাশার সঙ্গে সরকারকে কানেক্ট করার ক্ষেত্রে কিছু গ্যাপ বা দূরত্ব পরিষ্কার হয়ে উঠেছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই কিছুটা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

"বিএনপি সরকার গণঅভ্যুত্থানের বেনিফিশিয়ারি। সে কারণে প্রধানমন্ত্রী গণপ্রত্যাশার সঙ্গে দল ও সরকারকে একাত্ম রাখতে চাইছেন। কিন্তু রাড্ডাকাণ্ড কিংবা এ ধরনের ঘটনাগুলো ভিন্ন বার্তা দেয়। আমার মনে হয় সে কারণেই প্রধানমন্ত্রী শক্ত পদক্ষেপ নিয়েছেন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

তার মতে, সরকার অভিভাবক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপে এই বার্তাই এসেছে যে- সীমা লঙ্ঘন করা যাবে না।

"এখন দেখার বিষয় দল হিসেবে বিএনপি ও এর নেতারা সারাদেশে তা কতটা উপলদ্ধ্বি করতে পারেন"।

সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলছেন, ইশরাক মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন সত্যি, কিন্তু অস্ত্র উঁচিয়ে যা হয়েছে তা নিয়ে হয়তো বিতর্ক হয়েছে।

"এখন প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন যে আইন সবার জন্য সমান," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।