১৯ বছর বয়সেই 'ফুটবলকে পূর্ণতা' দিয়েছেন লামিন ইয়ামাল

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, ফিল ম্যাকনালটি
- Role, প্রধান ফুটবল বিষয়ক লেখক, নিউ জার্সি স্টেডিয়াম থেকে
- Published
- পড়ার সময়: ৪ মিনিট
বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষে অশ্রুসিক্ত লিওনেল মেসিকে যখন স্পেনের প্রতিভাবান কিশোর লামিন ইয়ামাল জড়িয়ে ধরেন, তখন বিষয়টি দেখতে এবং অনুভব করতে প্রতীকী মনে হচ্ছিল। যেনবা মশাল এক হাত থেকে অন্য হাতে তুলে দেওয়া হলো।
৩৯ বছর বয়সী মেসি গভীর দৃষ্টিতে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে জড়ো হওয়া আর্জেন্টিনা সমর্থকদের দিকে, যারা হয়তো শেষবারের মতো ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে তাকে দেখে তার নাম ধরে গান গাইছিল সেসময়।
এবং, পুরো বিশ্বের চোখের সামনে, লামিন ইয়ামালই আর্জেন্টিনার মহান কিংবদন্তিকে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে আসেন, যার পর তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন।
বার্সেলোনার বর্তমান ১০ নম্বর জার্সিধারী জড়িয়ে ধরছেন তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে কিংবদন্তি ১০ নম্বরকে।
এটি ছিল সেই অসাধারণ ছবির সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপ, যেখানে ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি দাতব্য ক্যালেন্ডার র্যাফেলের অংশ হিসেবে ২০ বছর বয়সী মেসিকে ছয় মাস বয়সী লামিন ইয়ামালকে গোসল করাতে দেখা গিয়েছিল।
এই ম্যাচকে ঘিরে সেই ছবিটি আবারও ভাইরাল হয়েছে কয়েকদিন ধরে।
সেই শিশুটি এখন একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ, আর মেসি হয়তো তার বিশ্বকাপ যাত্রার শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
লামিন ইয়ামাল, যিনি মেসির চেয়ে দুই দশকের ছোট এবং এখনও যার ক্যারিয়ারের শুরু বলা যায়, তিনি মাত্র দুই বছর আগে ইউরো জিতে বিশ্বমঞ্চে পরিচিতি পাওয়ার পর এবার বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের বৃত্তটি যেন এক রকম পূর্ণ করে ফেললেন।
মেসির মতোই বার্সেলোনার একাডেমি থেকে উঠে আসা এই তরুণ, হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট নিয়ে কিছুটা জর্জরিত হয়ে টুর্নামেন্টে এসেছিলেন।
তবে শেষ পর্যন্ত ১৯ বছর ৬ দিন বয়সে সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ ও ইউরো - উভয় ট্রফি জেতার রেকর্ড নিয়ে মাঠ ছাড়েন গতরাতে।
এবং এই হতাশাজনক বিশ্বকাপ ফাইনালের অন্যতম প্রধান গল্পটি ছিল, কীভাবে স্পেনের সতীর্থদের নিখাদ রণকৌশল লামিন ইয়ামালের প্রভাব তৈরিতে সাহায্য করেছিল, যেখানে মেসি আর্জেন্টিনার উসকানিমূলক কৌশলের কারণে এক রকম প্রতারিত হয়েছেন।
এতে কিছুই অর্জিত হয়নি, এবং সেটাই হওয়া উচিত ছিল।
স্পেন এবং লামিন ইয়ামাল পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে নিজেদের আরও শক্তিশালী করে তুলেছে, ফলে আজ বিশ্ব তার পায়ের নিচে এবং ফুটবলের সবচেয়ে বড় দুটি শিরোপা তার ঝুলিতে।
স্বাভাবিক প্রতিভার পাশাপাশি লামিন স্পেনের সৌভাগ্যের প্রতীকও।

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের ম্যাচ নির্ধারণী গোলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের আধিপত্য আরও সুসংহত করে স্পেন।
জাতীয় দলের হয়ে খেলা ২৮টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের একটিতেও এখনও হারেননি লামিন ইয়ামাল।
বড় টুর্নামেন্টে তিনি ১৩টি ম্যাচে শুরু থেকে খেলেছেন এবং সবকটিতেই জিতেছেন। বড় টুর্নামেন্টে শুরু থেকে খেলে শতভাগ জয়ের ক্ষেত্রে এটি যে কোনো ইউরোপীয় খেলোয়াড়ের মধ্যে দীর্ঘতম রেকর্ড।
এছাড়া তিনি, স্পেনের ১৯ বছর বয়সী সতীর্থ পাও কুবারসির সঙ্গে, বিশ্বকাপ ফাইনালে শুরু থেকে খেলে জয়ী হওয়া মাত্র চতুর্থ ও পঞ্চম কিশোর খেলোয়াড়।
এর আগে এ কৃতিত্ব ছিল ১৯৫৮ সালে ব্রাজিলের পেলের, ১৯৮২ সালে ইতালির ডিফেন্ডার জিউসেপ্পে বের্গোমির এবং ২০১৮ সালে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পের।
স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ম্যাচের পরে ইয়ামালের প্রতি তার 'আন্তরিক কৃতজ্ঞতা' প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, "সে দুর্দান্ত ফুটবল খেলেছে, যা তাকে আরও পরিণত হতে এবং এখনকার চেয়েও বড় ফুটবলার হতে সাহায্য করবে।"
"সে সত্যিই দলগত স্বার্থের জন্য আত্মত্যাগ করেছে। আমার দলে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমার মতে সে একটি চমৎকার বিশ্বকাপ খেলেছে।"

ছবির উৎস, Getty Images
এবং তিনি শুধু বিশেষ প্রতিভাই নন, বিশেষ মানসিকতারও অধিকারী।
আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের স্পষ্ট ভয় দেখানোর প্রচেষ্টাকে তিনি উপেক্ষা করেছেন, বিশেষ করে নিকোলাস তালিয়াফিকোর সঙ্গে বারবার সংঘর্ষে জড়িয়েও।
ইংল্যান্ডের সাবেক গোলরক্ষক ও বিবিসি স্পোর্ট বিশ্লেষক জো হার্ট বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করেন।
তিনি বলেন, "লামিন ইয়ামাল শুধু প্রতিক্রিয়া দেখায়নি তা-ই নয়। সে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে। সে বিচলিত হয়নি এবং পিছিয়েও যায়নি। পুরো দল যেন তাকে আঘাত করার চেষ্টা করছিল।"
"সে পুরো সময় খুব শান্ত ছিল। এটি ছিল তার অসাধারণ এক পারফরম্যান্স।"
"লামিন ইয়ামালের বয়স ১৯ বছর। তার জন্য কী অসাধারণ একটি দিন! মাত্র ১৯ বছর বয়সেই সে ফুটবলকে পূর্ণতা দিয়ে ফেলেছে।"
তার সামনে প্রায় পুরো ক্যারিয়ার পড়ে আছে।
আর অধিনায়ক ও টুর্নামেন্টসেরা খেলোয়াড় রদ্রির মতো সতীর্থদের অভিজ্ঞতা ও প্রভাব নিয়ে তিনি ভবিষ্যতে আরও এমন সাফল্য অর্জন করতে পারেন।








