আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তার মৃত্যু রহস্য: যেসব বিষয় তদন্ত করছে পুলিশ
- Author, সজল দাস
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
নিখোঁজ হওয়ার পরদিন তুরাগ নদ থেকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের পর পাশের বস্তি থেকে উদ্ধার হওয়া নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল, 'বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই' এবং বাসার গ্যারেজের শেষ সিসিটিভি ফুটেজ- প্রতিটি তথ্যই নতুন প্রশ্ন সামনে আনছে।
মৃত্যুর আগে সবশেষ যে 'ছোট ভাই' এর সঙ্গে মি. সাউরিকে দেখা গিয়েছিল তাকে হেফাজতে নেওয়ার পর থেকেই এই ঘটনার তদন্তে নতুন মোড় নিয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের কাছে সেদিনের নানা তথ্য দিয়েছে সেই ব্যক্তি, শাহরিয়ার রেজা দ্বীপ।
তুরাগ নদের যেখান থেকে মরদেহ উদ্ধার হয়েছিল তার কাছাকাছি এলাকা থেকেই পরিত্যাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে মি. সাউরির মোটরসাইকেলটি।
পুলিশ বলছে, নিখোঁজ হওয়ার আগে শেষ সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ওই ছোটভাইয়ের সঙ্গে মি. সাউরি কোথায় গিয়েছিলেন, কী করেছেন এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তারা।
নৌ পুলিশের পাশাপাশি ছায়া তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআই এবং গোয়েন্দা পুলিশ।
গত ২৭শে অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে বের হন বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরি। পরিবারকে তিনি বলেছিলেন, 'দ্বীপ আসছে, ওর সঙ্গে দেখা করে আসি'। এরপর আর বাড়ি ফেরেননি।
পরিবারের পক্ষ থেকে উত্তরখান থানায় সাধারণ ডায়েরি করার পর বুধবার বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ পুলিশ।
তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
বিশেষ করে, ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময় বিমানবন্দরে উড়োজাহাজে ওঠার ভিডিওটি মি. সাউরি ধারণ বা প্রচার করেছিলেন বলে আলোচনা রয়েছে। যা তার মৃত্যুকে ঘিরে নানা জল্পনা-কল্পনা তৈরি করে।
অবশ্য, গত তিন মাস আগে একটি সাক্ষাৎকারে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন তাহসিফ সাউরি।
তদন্ত কোন পথে?
মরদেহ উদ্ধারের পর তাহসিফ সাউরির বাবা জানিয়েছিলেন যে, মি. দ্বীপ এর ডাকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাসার বাইরে বের হন তাহসিফ সাউরি।
এই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত সেদিনের একাধিক সিসিটিভি ফুটেজে এই দুজনকে একসঙ্গে দেখা গেছে।
বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাসা থেকে শাহরিয়ার রেজা দ্বীপকে হেফাজতে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশ বলছে, গ্রেফতার নয়- মূলত কিছু বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যই হেফাজতে নেওয়া হয় তাকে। মি. দ্বীপ এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী রাতভর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে বলেও জানানো হয়।
শুক্রবার সকালে পিবিআই এর ইন্সপেক্টর সৈয়দ সাজেদ রহমান গণমাধ্যমকে জানান, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় আসার বিষয়টি জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে দ্বীপ।
"তারা কি জন্য এখানে এসেছিল সেটা আমাদেরকে এখনও বলে নাই। দ্বীপ বলেছে যে তাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল। কেন এখানে তারা এসেছিল সেটি আমরা তদন্ত করছি," বলেন তিনি।
মূলত দ্বীপের বক্তব্যে অসঙ্গতি আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখছে পিবিআই। কেন তিনি এতক্ষণ তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন, কখন, কীভাবে আলাদা হলেন এবং কেন তিনি পরিবারকে বা পুলিশকে দ্রুত জানাননি— এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা হচ্ছে।
পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) এর পুলিশ সুপার বিবিসি বাংলাকে জানান, "যেহেতু দ্বীপ নামের ছেলেটিকে তার (তাহসিফ সাউরি) সঙ্গে সবশেষ দেখা গেছে এ কারণে তার কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য জানতে তাকে আনা হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে সব ক্লু বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।"
পুলিশ বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে মি. দ্বীপ নানা তথ্য পিবিআইকে দিয়েছে। সব তথ্য যাচাই করে ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করছে তারা।
মি. সাউরি ও দ্বীপের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, লোকেশন ডেটা এবং ওই এলাকার আশপাশের সব সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
ময়না তদন্তের রিপোর্ট, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট এবং দ্বীপের জবানবন্দি এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখেই তদন্ত চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
মোটরসাইকেল উদ্ধার
এই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ ইতোমধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২৭শে অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটের দিকে একটি বাইক নিয়ে মি. সাউরির বাসার গ্যারেজে আসেন দ্বীপ।
এরপর সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটের দিকে দুটি আলাদা মোটরসাইকেল নিয়ে গ্যারেজ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে দেখা যায় দুজনকে।
এর একদিন পর অর্থাৎ বুধবার বিকেলে মি. সাউরির মরদেহ উদ্ধার করা হলেও নিখোঁজ ছিল তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি।
পুলিশ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে দ্বীপকে হেফাজতে নেওয়ার পর তার দেওয়া তথ্য যাচাইয়ে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়েছে পিবিআই।
তার দেওয়া তথ্য অনুসারেই, টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় অভিযান চালিয়ে, সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল, যা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল।
পিবিআই এর ইন্সপেক্টর সৈয়দ সাজেদ রহমান গণমাধ্যমকে জানান, "গাড়িটা আমরা রাতেই উদ্ধার করছি। দ্বীপের দেওয়া তথ্য অনুসারেই গাড়িটা উদ্ধার করা হয়েছে।"
উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটি মি. সাউরির বলেও নিশ্চিত হয়েছে পিবিআই।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মোটরসাইকেলটি যেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, সেখান থেকে তুরাগ নদে মি. সাউরির মরদেহ পাওয়ার স্থানের দূরত্ব খুব বেশি নয়।
প্রাথমিক আলাপে মি. দ্বীপ এই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছ বলেও জানিয়েছে পুলিশ। তবে তদন্ত চলমান থাকায় এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি তারা।
এদিকে, তুরাগ নদের যে এলাকা থেকে মি. সাউরির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, শুক্রবার দুপুরে সেখানে পরিদর্শন করেছেন পিবিআই এর তদন্তকারী দল। এছাড়া মি. দ্বীপকে সঙ্গে নিয়ে বেশ কয়েকটি স্পটে যাওয়ার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
মামলা হয়নি এখনও
মরদেহ উদ্ধারের প্রায় একদিন পরও অর্থাৎ শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত এই ঘটনায় কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি।
পুলিশ বলছে, এই ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত চালিয়ে নিচ্ছেন তারা। মামলা দায়েরের প্রক্রিয়ায়ও চলমান রয়েছে বলে জানানো হয়।
নিখোঁজ হওয়ার আগে মি. সাউরি কোথায় গিয়েছিলেন, কী করেছিলেন এই বিষয়গুলো যাচাই করে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে।
পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) এর পুলিশ সুপার বিবিসি বাংলাকে জানান, নিহতের পরিবার শোকার্ত অবস্থায় থাকায় মামলা দায়েরে তাড়াহুড়ো না করে বরং ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে কাজ করা হচ্ছে।
"আমরা ওনাদেরকে একটু সময় দিচ্ছি, মামলা হবে। যেহেতু নৌ পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করেছে, তাদের তত্ত্ববধানেই মামলা কার্যক্রম চলবে। অন্য সব সংস্থা তাদেরকে সহায়তা করবে," বলেন তিনি।
উল্লেখ্য, তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের পর সুরতহাল রিপোর্টে তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিলনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তার নাক দিয়ে রক্ত বের হতে দেখা গেছে।
পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।