নরম খোলসের কাঁকড়া নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে কেন

ছবির উৎস, LightRocket via Getty Images
- Author, রাকিব হাসনাত
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
বাংলাদেশের চাষি ও কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে উৎপাদিত সফট শেল বা নরম খোলসের কাঁকড়ার চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমশ বাড়ছে, যদিও দেশের একটি জেলাতেই এই ধরনের কাঁকড়া উৎপাদনের সব কার্যক্রম বেশি চোখে পড়ছে।
খামারি ও মৎস্য কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ছাড়াও ইউরোপের অনেক দেশে ক্রমশ রফতানি বাড়ছে বাংলাদেশের নরম খোলসের কাঁকড়ার এবং এর প্রধান যোগানদাতা হলো সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলা।
ওই এলাকায় অনেকে এখন এই কাঁকড়া চাষে ঝুঁকছেন এবং সুন্দরবন ও আশপাশের নদী এলাকাগুলোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই শিল্পের আকারও ধীরে ধীরে বাড়ছে।
কাঁকড়া চাষি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদা ছাড়াও রোগ বালাইয়ে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কম ও মুনাফা দ্রুত আসার সুযোগ থাকায় অনেকে এখন চিংড়ির ঘেরের লোনা পানিতেই নরম খোলসের কাঁকড়া চাষ শুরু করছেন।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, গত অর্থবছরে তার জেলা থেকেই প্রায় সাড়ে সাতশ মেট্রিক টন 'সফট শেল ক্র্যাব' বা 'নরম খোলের কাঁকড়া' বিদেশে রফতানি হয়েছে।
"সাধারণত কাঁকড়ার চেয়ে খোলস নরম হওয়ায় এটি খেতে সুবিধা। সে কারণে দেশের মধ্যেও এর বাজার বড় হচ্ছে," বলছিলেন তিনি।
খামারি ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিশাল উপকূলীয় এলাকায় উন্নত চাষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে নরম খোলসের কাঁকড়ার চাষ বহুগুণ বাড়ানোর সুযোগ আছে বলে তারা মনে করছেন।
সরকারি হিসেবে, বৃহত্তর খুলনা অঞ্চল থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬৪৪ মেট্রিক টন নরম খোলসের কাঁকড়া রফতানি হয়েছিল, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১৬৬ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে।

ছবির উৎস, LightRocket via Getty Images
নরম খোলসের কাঁকড়া কেমন
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বাংলাদেশে এখন যে দুইভাবে কাঁকড়ার চাষ হচ্ছে তার একটি হলো-ফ্যাটেনিং বা মোটাতাজাকরণ, আর অন্যটি হলো নরম খোলসের কাঁকড়া।
ছোটো কাঁকড়া সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট নিয়মে প্রতিপালনের পর ওজন নির্দিষ্ট পরিমাণ বাড়লে সেটি হলো ফ্যাটেনিং বা মোটাতাজাকরণ।
ঘেরে চাষ করা ছাড়াও হার্ডশেল বা খোসাসহ এই কাঁকড়া বিভিন্ন নদ-নদীতেও পাওয়া যায়। সেগুলো সংগ্রহ করে বিক্রি করা হয়।
আর অন্যটি হলো বাক্সে খোসা পাল্টানোর পর যখন খোসা খুব নরম থাকে তখনই কাঁকড়া সংগ্রহ করে রফতানির জন্য প্রক্রিয়াজাত করা।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, "নরম খোলসের কাঁকড়া চাষে প্রতি তিন ঘণ্টা পর পর দিনে রাতে পর্যবেক্ষণ করে নরম এবং মৃত কাঁকড়াগুলোকে দ্রুত তুলে ফেলতে হবে। প্রতি দুই মাসে প্রতি একর পুকুর থেকে ২৫০০-২৬০০ কেজি নরম খোলসের কাঁকড়া উৎপাদন করা সম্ভব"।
এখন মূলত সুন্দরবনের নদী-খাল থেকে ছোট বা মাঝারি আকারের কাঁকড়া সংগ্রহের পর প্রতিটি কাঁকড়াকে অগভীর লোনা পানিতে ভাসমান ছোট প্লাস্টিকের বাক্সে বা খাঁচায় আলাদাভাবে রাখা হয়।
সময়তো এসব কাঁকড়াকে ছোট মাছ বা শামুক খেতে দেওয়া হয়। খোলস বদলানো শুরু হলে নতুন খোলস শক্ত হওয়ার আগেই কাঁকড়া সংগ্রহ করে পরিষ্কার বা ঠান্ডা পানিতে রাখতে হয়।
এরপর গ্রেডিং ও হিমায়িত করে বিদেশে রফতানির জন্য প্রস্তুত করা হয়।

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images)
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. লতিফুল ইসলাম বলছেন, একটি কাঁকড়া যখন খোলস পাল্টায় তখন থেকে পরবর্তী অন্তত ছয় ঘণ্টা তার বহিরাবরন বা খোলস একেবারেই নরম থাকে।
"ওই সময়েই শক্ত খোলস ছাড়া কাঁকড়াটি সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এটিই সফট শেল ক্র্যাব বা নরম খোলসের কাঁকড়া। সাধারণত ছোটো কাঁকড়াগুলো দ্রুত খোলস পাল্টায়, কখনো কখনো সাত দিন বা তার চেয়ে কম সময়ের মধ্যেও," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. ইসলাম।
খামারি, মৎস্য কর্মকর্তা ও মৎস্য বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, আগে শক্ত খোলসের কাঁকড়াই হাত পা বেঁধে রফতানি করা হতো, কিন্তু খোলস শক্ত হওয়ায় সেটি খাওয়া তুলনামূলক কঠিন।
আবার এই শক্ত খোলসের কাঁকড়া প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা থেকে রফতানি করার প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি অংশ মারাও যেত। অন্যদিকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রফতানি করতে হতো বলে অনেক সময় দর পতনের কারণে কম দামেই খামারিদের সেগুলো ছেড়ে দিতে হত।
এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ২০১৪-১৫ সালের দিকে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাত ধরে নরম খোলসের কাঁকড়া উৎপাদন করে বিদেশে রফতানি শুরু হয়।
সুন্দরবন ও আশেপাশের নদী থেকে কাঁকড়া সংগ্রহ করে সেগুলো নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় রেখে খোলস পাল্টানোর সময় আলাদা করে সংগ্রহ করে রফতানির জন্য প্রস্তুত করা হতো।
কিন্তু এক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলো, বড় কাঁকড়াগুলো লম্বা সময় বিরতিতে খোলস পাল্টায়। এর বিপরীতে দ্রুত খোলস পাল্টায় ছোট কাঁকড়া। ফলে ছোটো কাঁকড়া ধরার প্রবণতা বহুগুণ বেড়েছে।
"প্রতি মাসে, এমনকি সাত দিন বা কখনো কখনো তার চেয়ে কম সময়েও এ ধরনের কাঁকড়া খোলস পাল্টায়। ফলে খামারে সার্বক্ষণিক নজর রাখতে হয়। কারণ খোলস পাল্টানোর ছয় ঘণ্টার মধ্যে সেগুলো রফতানির জন্য সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করতে হয়," বলছিলেন ড. লতিফুল ইসলাম।
তবে এই সফট শেল বা নরম খোলসের কাঁকড়ার জন্য উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। কারণ অনেক সময় এক বা একাধিক ঘের, কাঁকড়া ধরে রাখার জন্য অনেক বাক্স, ওয়াশিং-ফ্রিজিং সুবিধা দরকার হয়।
মি. ইসলাম বলছেন, এক কার্গো বা এক কন্টেইনার নরম খোলসের কাঁকড়ার জন্য ফ্রিজিং প্ল্যান্টও দরকার হয়।
"সফট শেল মজুত করে রাখা যায়। কিন্তু হার্ড শেল মজুত রাখা যায় না। আবার হার্ড শেল কাঁকড়া মারা যায়, কিন্তু সফট শেল কাঁকড়া অবিকল থাকে," বলেন তিনি।
খামারিরা বলছেন, সুপার গ্রেড বা খুব ভালো মানের নরম খোলসের কাঁকড়া কেজি প্রতি ১৪/১৫ ডলারে বিক্রি হয়।

ছবির উৎস, LightRocket via Getty Images
সমস্যা, সংকট, সম্ভাবনা
কাঁকড়া চাষের জন্য লোনা পানির দরকার হয় এবং সে কারণে অনেকে এখন তাদের চিংড়ির ঘেরের লোনা পানিতে কাঁকড়া চাষ করছেন।
সাতক্ষীরা অনেক জায়গায় গ্রাম এলাকাগুলোতে এখন চোখে পড়ে কাঁকড়ার অসংখ্য ভাসমান প্লাস্টিকের খাঁচা। খোলস পাল্টানোর সময় ঘের থেকে কাঁকড়া সংগ্রহের পর তা পাঠানো হয় শ্যামনগরের প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোতে।
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের নরম খোলসের কাঁকড়া রফতানিকারক একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তারা এখন আমেরিকা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ায় নরম খোলসের কাঁকড়া রফতানি করছেন।
"কিন্তু সমস্যা হলো কাঁকড়া আহরণ করা যায় ৪/৫ মাস। আহরণের সময় উন্মুক্ত হলে আরও কাঁকড়া সংগ্রহ করা যাবে এবং তাতে করে রফতানিও বাড়বে। মূল উৎপাদন মৌসুমে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়া দরকার," বলছিলেন তিনি।
ড. লতিফুল ইসলাম বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে সুন্দরবন অঞ্চলে ছোট কাঁকড়া ধরার প্রবণতা বেড়ে গেছে, যে কারণে প্রাকৃতিক উৎসেই কাঁকড়া কমছে কারণ তারা প্রজনন সময় পর্যন্ত পাচ্ছে না।
"এখন শতভাগ কাঁকড়াই প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। কমার্শিয়াল পোনার হ্যাচারি না থাকায় প্রাকৃতিক উৎসই প্রধান উৎস," বলেছেন মি. ইসলাম।

ছবির উৎস, Universal Images Group via Getty Images
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম বলছেন, জেলার শ্যামনগরই নরম খোসের কাঁকড়ার মূল জায়গা, তবে আশেপাশেও কিছু এলাকায় এখন এই কাঁকড়া উৎপাদনে আগ্রহী হয়েছেন অনেক চাষী।
জেলার নয়শ'র বেশি কাঁকড়াচাষির মধ্যে ১২৬ জনই এখন নরম খোলসের কাঁকড়া উৎপাদন করছেন।
"এটি ক্রমবর্ধনশীল খাত। চিংড়ির পাশাপাশি অনেকে এখন এদিকে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাত ধরেই এটি বিকশিত হচ্ছে। আমরাও সর্বাত্মক সহযোগিতা দিচ্ছি," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
গত বছর নভেম্বরে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি কর্মসূচি বাংলাদেশ -এর উদ্যোগে সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের নরম খোলসের কাঁকড়া চাষিদের জন্য জলবায়ু সহনশীল কাঁকড়া উৎপাদন এবং কাঁকড়া সংগ্রহকারীদের প্রেরণামূলক সচেতনতা বিষয়ক প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছিল। এতে অংশ নিয়েছিল দুশোর মতো খামার কর্মী, যার মধ্যে ১৮৩জনই ছিলেন নারী।
কর্মকর্তারা বলছেন, এই খাতে সার্বক্ষণিক লোক প্রয়োজন হওয়ায় বিপুল সংখ্যক নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে। বিশেষ করে, কাঁকড়া সংগ্রহ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা ও প্রক্রিয়াজাতকরণে নারীরাই বড় ভূমিকা রাখছেন।








