আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ইয়ামাল, রদ্রি নাকি পিভট - স্পেন বিশ্বকাপ দলের মূল শক্তি কোথায়?
- Author, সৈয়দ ফায়েজ আহমেদ
- Role, অতিথি লেখক, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৯ মিনিট
গত শতকে স্পেন ছিলো ফুটবলে আক্ষেপের এক নাম। ইউরোপের এই দেশটা সুন্দর ফুটবল খেলে, দর্শকের চিত্ত জয় করে কিন্তু শেষতক তেমন কিছু জিতে না। সেই চিত্র পালটে গেলো চলতি শতকের প্রথম দশকে।
পাসিং ফুটবল আর দলীয় সংহতির অনন্য প্রদর্শনী দেখানো স্প্যানিয়ার্ডরা ২০০৮ সালে ৪৪ বছরের খরা কাটিয়ে জিতলো নিজেদের দ্বিতীয় উয়েফা ইউরো চ্যাম্পিয়নশীপ (ইউরো)।
মহাদেশ সেরা হবার ঠিক দুই বছর পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতলো আর এর দুই বছর পর আবারও ইউরো জিতলো।
ইনিয়েস্তা, ক্যাসিয়াস, রামোস, আলোনসো, বুসকেটস, ডেভিড ভিয়াদের সোনালি প্রজন্মের পর স্পেনের এই দুরন্ত যাত্রায় কিছুটা ছেদ পড়েছে।
তবে, এক যুগ পর রদ্রি, ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস, গাভীদের দলটি আবার বিশ্বসেরা হবার জন্য প্রস্তুত। এর প্রমাণ তারা দিয়েছে ২০২৪ সালের ইউরো জিতে। যার মাধ্যমে এই মহাদেশীয় টুর্নামেন্টে ৪টি শিরোপা নিয়ে স্পেনই এখন এককভাবে সবচেয়ে সফল।
স্পেনের তরুণ তুর্কিরা একই বছর অলিম্পিকের স্বর্ণপদকও জিতে নিয়েছে। শূন্য দশকের শেষের দিকের ঘটনা মনে রাখলে যে কেউ ভাবতেই পারেন যে, স্পেন যখন জেতে তখন টানা সব বড় টুর্নামেন্ট জেতে।
স্পেনের খেলোয়াড়দের দক্ষতা, একটা দল হয়ে উঠার ক্ষমতা এবং কোচের নির্দেশনা মিলিয়ে বিশেষজ্ঞরাও ভাবছেন এই বিশ্বকাপের প্রাক ফেভারিট দল হচ্ছে স্পেন। বাজির দরেও একই কথাই বলছে।
স্পেনের রানি ইসাবেলার পৃষ্ঠপোষকতাতেই কলম্বাস আবিষ্কার করেছিলেন ইউরোপ থেকে আমেরিকা যাবার পথ। এবার কি সেই উত্তর আমেরিকাতে হওয়া বিশ্বকাপ জিতে নিবে ইসাবেলার দেশের তরুণেরা?
স্পেনের ফরমেশন
স্পেনের এই বিশ্বকাপ অভিযাত্রায় নেতৃত্ব দেবেন তাদের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে।
এক হিসেবে এই কোচের কাজটা সহজ। অন্য কোচেরা যেখানে কী ফরমেশনে খেলাবেন তা নিয়ে জেরবার হয়ে পড়েন, ফুয়েন্তের সেই চিন্তা নেই। ৪-৩-৩ এমন এক ফরমেশনে যা অতি অল্প বয়সে বার্সেলোনা, অ্যাথলেটিক ক্লাব এবং রিয়াল সোসিয়েদাদের একাডেমিতে পা রাখার মুহূর্ত থেকেই মজ্জাগত হয়ে পড়ে স্পেনীয় ফুটবলারদের।
ফুয়েন্তে ২০২২ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই এই ফরম্যাশনে খেলাচ্ছেন এবং তার ঘোষিত স্কোয়াডটিও সেই আদর্শিক প্রতিশ্রুতিরই প্রতিফলন।
দলের প্রতিটি খেলোয়াড় বল পজেশনে থাকা এবং না থাকার সময়ে নিজেদের ভূমিকা, দায়িত্ব এবং এই সিস্টেমের পজিশনাল ভাষা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত। এই দারুণ বোঝাপড়া বিশ্বকাপের অসীম চাপ সামলাতে দলটিকে এগিয়ে রাখবে।
বল দখলে থাকার সময় তাদের এই কাঠামো প্রচন্ড ফ্লুইড। দুই উইঙ্গার—ডানদিকে লামিন ইয়ামাল এবং বামদিকে নিকো উইলিয়ামস— নিজেদের ফ্ল্যাংক থেকে ভেতরের দিকে কেটে চলে আসেন, যা ফুল-ব্যাকদের ওভারল্যাপ করার এবং উইংয়ে জায়গা তৈরি করার সুযোগ দেয়। এর ফলে মাঝমাঠে খেলোয়াড় সংখ্যা বেড়ে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ নিতে সহজ হয়ে এবং একই সাথে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে আড়াআড়িভাবে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য করে।
এই সিস্টেমের দর্শন হচ্ছে তা কোনো একক খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত প্রতিভার ওপর ভিত্তি করে তৈরি নয়, বরং আটজন খেলোয়াড়ের সমন্বিত মুভমেন্টের ওপর নির্মিত। যদিও এই দলে প্রতিভারও অভাব নেই।
রদ্রি এবং পিভট: সবকিছুর মূল ভিত্তি
ইনজুরি কাটিয়ে ২০২৪ সালের ব্যালন ডি'অর জেতা রদ্রির প্রত্যাবর্তন স্পেনের বিশ্বকাপ প্রস্তুতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
এই মিডফিল্ডার ব্যাক ফোরের ঠিক সামনে অবস্থান করেন, প্রতিপক্ষের চাপ সামলান, লাইনের মাঝখান দিয়ে পাস দেওয়ার প্রচেষ্টা নস্যাৎ করেন এবং এমন এক নিখুঁত দক্ষতায় বল রিসাইকেল করেন যা বিশ্ব ফুটবলে অন্য কোনো খেলোয়াড়ের মধ্যে দেখা যায় না।
রদ্রির আরেকটি অসাধারণ ব্যাপার হচ্ছে গেম রিডিং। তিনি প্রতিনিয়ত খেলার জ্যামিতিক পরিবর্তনগুলো পড়তে পারেন।
যখন হাই-প্রেসের মাধ্যমে ওপরে বল জেতা হয়, তখন রদ্রি নিচে নেমে সেন্টার-ব্যাকদের কাছ থেকে বল নেন এবং শান্তভাবে আক্রমণ শুরু করেন। আবার কাউন্টার অ্যাটাকের মুখে স্পেন যখন বল হারায়, তিনি সাথে সাথে মাঝের লেন বন্ধ করে দেন এবং আক্রমণকে উইংয়ের দিকে ঠেলে দেন, যেখানে রক্ষণভাগ বেশি শক্তিশালী থাকে।
স্পেনের জন্য বড় স্বস্তির ব্যাপার,ইনজুরি বা অন্য কোনো কারণে রদ্রি খেলতে না পারলে আছেন প্রিমিয়ার লীগ জেতা আর্সেনালের মার্টিন জুবিমেন্ডি। তিনিও একইরকম ছাঁচে গড়া।
পেদ্রি এবং ফাবিয়ান রুইজ: পিভটের সামনের ইঞ্জিন রুম
তিন সদস্যের মিডফিল্ডের বাম দিকটা সামলান পেদ্রি, যা মূলত দলের ক্রিয়েটিভ নার্ভ সেন্টার। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের লাইনের মাঝে ফাঁকা জায়গা খুঁজে নেওয়া এবং সেখানে অবস্থান নেওয়ার ক্ষমতার জন্য মাত্র ২৩ বছর বয়সেই তার সাথে তুলনা করা হচ্ছে কিংবদন্তি ইনিয়েস্তার।
এই কিংবদন্তির মতোই পেদ্রির পাসিং এবিলিটিও অনন্য সাধারণ। তিনি প্রতিপক্ষের প্রচন্ড চাপেও বল বের করে দিতে পারেন, ছোট ছোট ত্রিভুজাকার পাসের মাধ্যেমে আক্রমণকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যান, এবং ডিফেন্ডারদের নিজের দিকে টেনে এনে ইয়ামাল বা উইলিয়ামসের পায়ে বল ঠেলে দেন।
ডানদিকের মিডফিল্ডে ফাবিয়ান রুইজ সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রোফাইল নিয়ে হাজির হন। যেখানে পেদ্রি মূলত হরাইজোন্টাল মুভমেন্ট এবং হাফ-স্পেস খুঁজে নেন, সেখানে ফাবিয়ান একটু দেরিতে প্রতিপক্ষের বক্সে প্রবেশ করেন, বল নিয়ে সোজা লাইনে সামনে এগিয়ে যান এবং নিচ থেকে গোল করার এমন এক হুমকি তৈরি করেন যা পেদ্রি সাধারণত করেন না।
পিএসজি-র হয়ে তার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ অভিযানগুলো তাকে বড় মঞ্চের জন্য পরিপক্ব করে তুলেছে।
মিডফিল্ড থেকে গোল করার এই ক্ষমতা দে লা ফুয়েন্তেকে আক্রমণের এমন একটি মাত্রা দেয় যা কেবল বল ধরে রাখা মিডফিল্ডাররা দিতে পারেন না।
রদ্রি, পেদ্রি এবং ফাবিয়ানের এই ত্রয়ী মিডফিল্ডকে তর্কাতর্কির ঊর্ধ্বে রেখে এই টুর্নামেন্টের সেরা বলা চলে।
ইয়ামাল এবং উইলিয়ামস: বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক উইং জুটি
১৮ বছর বয়সি লামিন ইয়ামাল এই মুহূর্তে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে টেকনিক্যালি প্রতিভাবান ওয়াইড ফরোয়ার্ড (উইঙ্গার)।
ডানপ্রান্ত থেকে খেলতে গিয়ে তিনি যেভাবে সরাসরি এবং অননুমেয় ভঙ্গিতে নিজের বাঁ পায়ে বল কেটে ভেতরের দিকে ঢোকেন, তা এ পর্যন্ত সামনে আসা প্রতিটি রক্ষণভাগকেই ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
আর সব যুগশ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়দের মতো তিনি জানেন কখন ড্রিবল করতে হবে, কখন ওয়ান-টু খেলতে হবে, আর কখন শট নিতে হবে।
বামপ্রান্তে নিকো উইলিয়ামস ঠিক ইয়ামালের বিপরীত ভূমিকাটিই পালন করেন, তবে ভিন্ন টেকনিক্যাল দক্ষতায়।
যেখানে ইয়ামালের মূল শক্তি হলো ভেতরের দিকে কেটে ঢোকা এবং স্ট্রাইকারের উদ্দেশ্যে পাস বাড়ানো, সেখানে উইলিয়ামস হলেন একজন ডিরেক্ট ড্রিবলার, যিনি ফুল-ব্যাকদের আইসোলেট করেন এবং তাদের পেছনে হটতে বাধ্য করেন।
বিপরীত দুই প্রান্তে এই দুজনের উপস্থিতি প্রতিপক্ষের সামনে এক অসম সমস্যা তৈরি করে, কারণ এমন কোনো রক্ষণাত্মক ব্লুপ্রিন্ট নেই যা একই সাথে এই দুজনকেই নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে।
তাদের পেছনে থাকা ফুল-ব্যাকরাও এই সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে দেয়।
ড্রিবলিং এবং ওয়ান টু ওয়ানে দুর্দান্ত লেফট ব্যাক কুকুরেয়া এবং ডানদিকের পোরো বা ইয়োরেন্তে একেবারে নিখুঁত সময়ে ওভারল্যাপ করেন, যার ফলে দুই ফরোয়ার্ড ভেতরের দিকে চলে গেলেও উইংও কখনও ফাঁকা থাকে না।
সেন্টার-ফরোয়ার্ড প্রশ্ন : অক্ষ হিসেবে ওয়ারজাবাল
দে লা ফুয়েন্তের প্রথম একাদশে আক্রমণভাগের নেতৃত্বে থাকেন মিকেল ওয়ারজাবাল এবং তার খেলার ধরনটি এই সিস্টেমের সাথে পুরোপুরি মানানসই।
তিনি প্রথাগত পেনালটি-বক্স স্ট্রাইকার নন, যাঁরা কেবল শেষ পাস এবং ফিনিশিংয়ের অপেক্ষায় থাকেন।
তিনি মূলত একজন লিংক-আপ ফরোয়ার্ড, যিনি নিচে নেমে এসে বল রিসিভ করেন, মাঝমাঠের তিন খেলোয়াড়ের সাথে ওয়ান-টু খেলেন এবং ইয়ামাল ও উইলিয়ামসের ভেতরের দিকে চলে আসার কারণে তৈরি হওয়া ফাঁকা জায়গায় আক্রমণ চালান।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ইউরো ২০২৪-এর ফাইনালে তার জয়সূচক গোলটি চরম মুহূর্তে তার ঠান্ডা মাথার পরিচায়ক ছিল।
ফেরান তোরেস অবশ্য ভিন্ন একটি বিকল্প এনে দেন। তিনি পজিশনের দিক থেকে আরও বেশি সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড, যিনি সরাসরি ডিফেন্ডারদের মাঝের ফাঁকা জায়গাগুলো ব্যবহার করতে পারেন। অন্যদিকে, নকআউট ম্যাচের শেষ মুহূর্তগুলোতে যখন বল ধরে রাখা এবং সময় কাটানোর জন্য স্পেনের একজন নির্ভরযোগ্য টার্গেট ম্যান প্রয়োজন হয়, তখন বেঞ্চ থেকে আসা আলভারো মোরাতার অভিজ্ঞতা দারুণ মূল্যবান হয়ে ওঠে।
দানি ওলমোর স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্তি আরেকটি কৌশলগত তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত। নাম্বার টেন (১০), ওয়াইড ফরোয়ার্ড বা একজন ইন্টেরিয়র মিডফিল্ডার হিসেবে খেলার ক্ষমতা থাকায় দে লা ফুয়েন্তে কোনো সাবস্টিটিউশন ছাড়াই ম্যাচের মাঝপথে পুরো দলের কৌশল বদলে ফেলার মতোও বিকল্প পাবেন।
স্পেন যদি এমন কোনো দলের মুখোমুখি হয় যারা ৪-৩-৩ এর উইংয়ের ধার নষ্ট করে দিচ্ছে, তখন ওলমো সাথে সাথে নাম্বার টেন-এর ভূমিকায় নেমে আসতে পারেন, পুরো সিস্টেমটি ৪-২-৩-১-এ রূপ নেয় এবং প্রতিপক্ষ আচমকা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সমস্যার মুখোমুখি হয়।
বল পজিশনে না থাকার সময় : হাই লাইন এবং প্রেস ট্র্যাপ
স্পেন মূলত একটি হাই ডিফেন্সিভ লাইন (রক্ষণভাগকে মাঠের ওপরের দিকে রাখা) এবং আগ্রাসী প্রেসিং কৌশলে রক্ষণভাগ সামলায়। তাদের লক্ষ্য থাকে নিজেদের অর্ধে চাপ নেওয়ার চেয়ে প্রতিপক্ষের অর্ধেই বল কেড়ে নেওয়া।
প্রতিপক্ষের গোলরক্ষক যখন ব্যাক-পাস পান কিংবা কোনো সেন্টার-ব্যাক যখন সীমিত অপশন নিয়ে চাপের মুখে পড়েন, ঠিক সেই মুহূর্তে স্পেনের এই 'প্রেস' সক্রিয় হয়ে ওঠে। তখন দুই ওয়াইড ফরোয়ার্ড প্রতিপক্ষের ফুল-ব্যাকদের চেপে ধরেন, তিন মিডফিল্ডার মাঠের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছড়িয়ে পড়েন এবং স্ট্রাইকার সেন্টার-ব্যাককে ব্লক করেন।
এই ফাঁদ প্রতিপক্ষকে হয় লম্বা শট নিতে বাধ্য করে, যা লাপোর্তে এবং কুবার্সি সহজেই পড়ে ফেলে জিতে নেন, অথবা প্রতিপক্ষকে এমন ভুল করতে বাধ্য করে যার ফলে স্পেন বিপজ্জনক অঞ্চলেই বলের দখল পেয়ে যায়।
আইমেরিক লাপোর্তে হলেন এই ডিফেন্স সিস্টেমের মূল মেরুদণ্ড। ব্যাক ফোরের একজন অভিজ্ঞ এবং পজিশনের দিক থেকে নিখুঁত এংকর হিসেবে তিনি এই হাই লাইনের টাইমিং নিয়ন্ত্রণ করেন। কখন নিচে নামতে হবে আর কখন সামনে এগোতে হবে, তা তিনিই ঠিক করেন।
তার পাশে থাকা পাউ কুবার্সির বয়স মাত্র ১৮ বছর, কিন্তু বার্সেলোনার এই তরুণের মধ্যে রয়েছে একজন অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়ের মতো ঠান্ডা মাথা এবং ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তা। লাপোর্তের অভিজ্ঞতা এবং কুবার্সির ক্ষিপ্রতা এই যুগলবন্দি স্পেনকে এমন এক সেন্টার-ব্যাক জুটি দেয়, যা তাদের মুখোমুখি হওয়া প্রায় যেকোনো প্রতিপক্ষের চেয়ে টেকনিক্যালি অনেক এগিয়ে।
স্কোয়াডের গভীরতা এবং রোটেশন: দলের ভেতরের দল
ফুয়েন্তের দলের আরেকটা শক্তি হচ্ছে গভীরতা। এই দলের ব্যাকআপ খেলোয়াড়দের সামর্থ্য আছে মূল একাদশের প্রায় কাছাকাছি মানের খেলা উপহার দেয়া। এর ফলে, ফুয়েন্তে ঘুরিয়ে ফিরিয়েও দল নির্বাচন করতে পারেন এবং পুরো স্কোয়াডকে সতেজ রাখতে পারেন।
তবে, স্পেনের একটা দুর্বলতা হতে পারে গোলকিপিং। পাসিং সক্ষমতার জন্য উনাই সিমনকে কোচ পছন্দ করেন এবং এই সিস্টেমে উনি জরুরীও। তবে, সিমন মাঝে মাঝেই দৃষ্টিকটু ভুল করে বসেন। অবশ্য, সেইক্ষেত্রেও ফুয়েন্তের হাতে দারুণ বিকল্প আছে- আর্সেনালের ডেভিড রায়া।
নকআউট পর্ব : দে লা ফুয়েন্তে কি বড় ম্যাচগুলো সামলাতে পারবেন?
স্পেনের বিশ্বকাপ জেতার পথে সবচেয়ে বড় বাঁধা হতে পারে নক আউট পর্বের চাপ সামলানো। বড় কোন অঘটন না হলে কেপ ভার্দে, সৌদি আরব এবং উরুগুয়েকে নিয়ে গঠিত গ্রুপ এইচের চ্যাম্পিয়ান হবে স্পেন।
সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় রাউন্ডে তারা খেলবে আর্জেন্টিনা, আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া এবং জর্ডানকে নিয়ে গঠিত গ্রুপ জের রানারআপের সাথে। আর্জেন্টিনা বা স্পেন কোন একটি দল গ্রুপে চ্যাম্পিয়ান হতে ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় রাউন্ডেই এদের সাক্ষাৎ হবে।
তবে, সেই বাঁধা পার হতে পারলে লা ফুয়েন্তেকে চিন্তা করতে হবে নকআউট পর্বের কৌশল কী হবে? কীভাবে তিনি তার দলকে চাপের মুখে সেরাটা দেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে পারবেন?
প্রতিটি পজিশনে স্কোয়াডের গভীরতা দেখে মনে হয় দে লা ফুয়েন্তে সেই মুহূর্তগুলোর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছেন।
স্পেন এই বিশ্বকাপে আসছে বর্তমান ইউরোপীয় এবং অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ান হিসেবে, আন্তর্জাতিক ফুটবলের সেরা তরুণ প্রজন্মের প্রতিভা সাথে নিয়ে, এক বিশ্বমানের মিডফিল্ড ট্রায়ো (ত্রয়ী) নিয়ে যারা অন্য যেকোনো দলের চেয়ে ম্যাচ ভালো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং বিশ্বের অন্যতম সেরা ও রোমাঞ্চকর দুজন ওয়াইড ফরোয়ার্ডকে সাথে নিয়ে।
প্রশ্ন এখন আর এটি নয় যে তারা যথেষ্ট ভালো কিনা; প্রশ্ন হলো— বিদেশের মাটিতে নকআউট ফুটবলের তীব্র চাপের মধ্যে বিশ্বকাপের এই মঞ্চে শেষ পর্যন্ত এই সোনালি প্রজন্ম তাদের প্রতিভার প্রতি পূর্ণ বিচার করতে পারবে কিনা।