আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
এসআইআর-কে বৈধতা দিলো ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, তবে নাগরিকত্ব নিয়ে রয়ে গেলো প্রশ্ন
- Author, প্রত্যুষ রায়
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২৭শে মে, বুধবার দেওয়া রায়ে নির্বাচনী তালিকা বা ভোটার তালিকার জন্য বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ বৈধ বলে ঘোষণা করেছে। তবে সুপ্রিম কোর্ট এটাও বলেছে যে- নির্বাচন কমিশনের শুধু নাগরিকত্ব বিবেচনা করার ক্ষমতা আছে, নির্ধারণের নেই।
এই রায় এসআইআর-এর বৈধতা নিয়ে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ-সহ এসআইআর প্রক্রিয়া চলা সব রাজ্যের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে 'লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি' নিয়ে যে মামলা চলছে সেটি স্বতন্ত্র।
নাগরিকত্ব প্রশ্নে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ জানিয়েছে, ভোটার তালিকায় নাম থাকার জন্য নাগরিকত্ব একটি বিবেচ্য বিষয় এবং নির্বাচন কমিশন তা বিবেচনার আওতায় রাখতে পারে। যদিও কোনো ব্যক্তি নাগরিক কি না, তা নির্ধারণের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের নেই বলে জানানো হয়েছে।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ বলেছে, সাংবিধানিকভাবে স্বচ্ছ ও স্বাধীন নির্বাচন প্রক্রিয়া সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এসআইআর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ার প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে ভারতের নির্বাচন কমিশনের আওতাধীন এবং তাদের অধিকার ও ক্ষমতার এক্তিয়ারের মধ্যে থেকেই ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজটি করেছেন।
যদিও সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ভোটার তালিকায় নাম না থাকার অর্থ যে সেই ব্যক্তি নাগরিক নন, এমনটা নয়।
গত বছর ভারতের নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বিহারে প্রথম বার ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন করা হয়। তখন অ্যাসোসিয়েশন অফ ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস ও ন্যাশনাল ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান উইমেন-এর মতো কিছু সংস্থা এই প্রক্রিয়ার আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন ফাইল করেন।
তখন অবশ্য ভারতের শীর্ষ আদালত এই প্রক্রিয়ায় কোনো রকম স্থগিতাদেশ দেয়নি, ফলে এসআইআর প্রক্রিয়াটি চালাতে কোনো অসুবিধা হয়নি নির্বাচন কমিশনের।
বিহারের পরে পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা ও তামিলনাডুর মতো একাধিক রাজ্যেও এই প্রক্রিয়া চালানো হয়। উল্লেখ্য, এই সবকটি রাজ্যেই এসআইআর চালু হয়েছিল বিধানসভা নির্বাচনের আগে।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
কী প্রতিক্রিয়া রাজনৈতিক মহলে?
সুপ্রিম কোর্টের রায় নিয়ে শাসক ও বিরোধী পক্ষের থেকে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া উঠে এসেছে। তবে দুই পক্ষই নিজের মতো করে স্বাগত জানালেও কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছে কংগ্রেস-সহ ইন্ডিয়া জোটের সদস্য দলগুলো।
কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা অর্জুন রাম মেঘওয়াল বলেছেন, "এসআইআর নিয়ে সংসদে যখন আলোচনা হয়েছিল, তখন শাসকপক্ষ যা বলেছিল, মূলত তাকেই মান্যতা দিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। নিরপেক্ষভাবে এসআইআর প্রক্রিয়া চালানোর জন্য নির্বাচন কমিশনকে আমরা ধন্যবাদ জানাই।"
তিনি বলেন, "রাহুল গান্ধী নির্বাচন কমিশনকে অপদস্থ করার চেষ্টা করেছিলেন, তবে তার উচিত সাংবিধানিক সংস্থাগুলিকে সম্মান করা।"
একটি সাংবাদিক সম্মেলন থেকে কংগ্রেসকে কটাক্ষ করেছেন বিজেপি নেতা সুধাংশু ত্রিবেদীও। তার মতে, এই রায় কংগ্রেসের 'অপপ্রচার'-এর বিরুদ্ধে একটি উপযুক্ত জবাব।
এসআইআর ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তোলা একাধিক মামলায় সাবেক পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ নিয়ে লড়েছিলেন তৃণমূল সংসদ সদস্য কল্যাণ ব্যানার্জী। তার বক্তব্য, "সুপ্রিম কোর্ট এসআইআরকে সাংবিধানিকভাবে বৈধ ঘোষণা করেছে, এতে কোনো বিরোধ নেই।"
"কিন্তু যে যে মানুষকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে তাদের বেনাগরিক ঘোষণা করার যে কোনো অধিকার নির্বাচন কমিশনের নেই, তা স্পষ্ট জানিয়েছে আদালত," এই বলে আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি।
তবে তিনি যোগ করেন, "পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির যে মামলা, সেই মামলা এখনো বিচারাধীন। আজকের রায় পশ্চিমবঙ্গের সেই মামলা নিয়ে ছিল না।"
অন্যদিকে কংগ্রেসের সংসদ সদস্য ইমরান মাসুদ বলেন, "এসআইআর তো কখনোই অবৈধ ছিল না। প্রশ্নটা এটা নয় যে এসআইআর বৈধ না অবৈধ। তবে বিরাট সংখ্যক মানুষকে বাদ দিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া কীভাবে সুষ্ঠু বলে গণ্য হতে পারে?"
একই রকম প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন ইন্ডিয়া জোটের সদস্য আরজেডির রাজ্যসভা সদস্য মনোজ ঝা। তিনি বলেন, "আমাদের চিন্তা ছিল, পশ্চিমবঙ্গে এখনো বহু মানুষ ভোটার তালিকার বাইরে। আমরা এক্সক্লুশন নয়, ইনক্লুশনের পক্ষে সওয়াল করেছিলাম।"
"সুপ্রিম কোর্টের বিচারকে স্বাগত জানাই" উল্লেখ করে তিনি বলেন, "সংবিধান প্রণেতারা হয়তো ভাবেননি এত মানুষকে নির্বাচনী তালিকার বাইরে রেখে নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।"
"নির্বাচন কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়া করার অধিকার আছে কি না সেই নিয়ে কোনও প্রশ্নই নেই। তবে কিছু অন্য প্রশ্ন নিয়ে আমরা ফের আদালতের দ্বারস্থ হব," জানান মি. ঝা।
অবশ্য এই রায়কে পরোক্ষে সমালোচনা করেছেন এসআইআর বিরোধী আন্দোলনকারী যোগেন্দ্র যাদব। তিনি বলেন, "আসল খবর এটা নয় যে এসআইআর বৈধ, আসল খবর হলো, এবার ভোটাররা আর সরকার নির্বাচন করবে না, এবার বিজেপি সরকার ঠিক করবে কে ভোটার হবে ও কে হবে না।"
'নাগরিকত্ব' প্রশ্নে কী বলল সুপ্রিম কোর্ট?
এই মামলাটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ছিল নাগরিকত্ব নির্ধারণের প্রশ্নটি। এসআইআর-এর ফলে ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া বহু মানুষের মনে নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
যদিও আদালত আগে জানিয়েছিল, ভোটার তালিকায় নাম না থাকা মানে নাগরিকত্ব হারানো নয়, আবেদনকারীরা ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ভোটার তালিকায় ফিরে আসতে পারেন।
বুধবারের রায়ে আদালত অভিমত প্রকাশ করেছে যে, কোনো ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত কি না, কেবল এই সীমিত উদ্দেশ্যেই কমিশন নাগরিকত্বের বিষয়টি যাচাই করে দেখতে পারে।
আদালতের মতে, নির্বাচন কমিশনের দ্বারা এই ধরনের যাচাই-বাছাইকে নাগরিকত্ব নির্ধারণ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। যদি কোনো ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে, তবে তার মানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই দাঁড়াবে না যে তিনি দেশের নাগরিক নন।
আদালত বলেছে, "কমিশনের এই সিদ্ধান্ত যেহেতু কেবল নির্বাচনী উদ্দেশ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তাই নাগরিকত্বের প্রশ্নে এটিকে চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য করা যায় না। অতএব, এই যুক্তিতে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার যে কোনো পদক্ষেপ উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের বিচারিক সিদ্ধান্তের ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল থাকবে।"
অর্থাৎ এটা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা প্রয়োগ করে, নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ থাকলে তেমন ব্যক্তির নাম নির্বাচনী তালিকায় না রাখার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে নির্বাচন কমিশন।
কিন্তু সেই ব্যক্তি সত্যিই নাগরিক কি না, সেই বিষয় নির্ধারণ করার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে দেয়নি।
আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে এমন সন্দেহভাজন মানুষদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে একমাত্র 'সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ' এবং নির্বাচন কমিশনের এমন সন্দেহ তৈরি হলে তা কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
কোন প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলল?
সুপ্রিম কোর্টের আজকের বিচার মূলত তিনটি প্রশ্নের মধ্যে আবদ্ধ ছিল, সেই তিনটি প্রশ্ন হলো,
- প্রথম, নির্বাচন কমিশনের কাছে এসআইআর-এর মতো প্রক্রিয়া পরিচালন করার ক্ষমতা আছে কি না
- দ্বিতীয়, এসআইআর-এর অধীনে যে তথ্যগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে, তা কোনো বৈধ উদ্দেশ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত কি না, এবং যদি তা হয়ে থাকে, তবে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপগুলো সেই লক্ষ্য অর্জনের অনুপাতে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
- তৃতীয়, নির্বাচন কমিশন দ্বারা গৃহীত এসআইআর প্রক্রিয়ার তদন্তগুলো ১৯৫০ সালের রিপ্রেজেন্টেশন অফ পিপলস অ্যাক্ট-কে ভঙ্গ করে কি না।
আদালত যা জানিয়েছে, তার সরলীকরণ করলে দাঁড়ায়, কমিশনের কাছে, তাদের সিদ্ধান্ত মতো সংশোধনীমূলক কার্যক্রম চালানোর অধিকার রয়েছে।
এছাড়াও আদালত জানিয়েছে, এসআইআর কোনোভাবেই 'জনপ্রতিনিধিত্ব আইন' এবং তৎসংশ্লিষ্ট বিধিমালাকে অতিক্রম করে না, বরং এটি আইনের নির্ধারিত সুনির্দিষ্ট বিধিবদ্ধ সীমানার আওতাধীন থেকে সংবিধানে নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া ক্ষমতাগুলোকে পুষ্ট কর।
সবশেষে বেঞ্চের অভিমত হলো, "এটা বলা যায় না যে নির্বাচন কমিশন তার এক্তিয়ার বহির্ভূত ক্ষমতা ব্যবহার করেছে।"
আর কী জানাল আদালত?
আদালত জানিয়েছে- এসআইআরের উদ্দেশ্য হলো, দেশে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন সুনিশ্চিত করার সাংবিধানিক উদ্দেশ্যের অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা।
রায়ে কমিশন কর্তৃক নথিবদ্ধ করা কারণগুলোর বৈধতা নিশ্চিত করে বলা হয়েছে, "সর্বশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার পরে চার দশকেরও অধিক সময় অতিবাহিত হওয়া, বিগত বছরগুলোতে ব্যাপক সংযোজন ও বিয়োজন, দ্রুত নগরায়ন ও মানুষের এক জায়গা ছেড়ে অন্য জায়গায় বাসস্থান তৈরি, এই কারণগুলোর ফলে ভোটার তালিকায় নামের পুনরাবৃত্তি ও ত্রুটির সম্ভাবনা দেখা যায়। সেইসব বিচ্যুতি সংশোধনের উদ্দেশ্যেই এই প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে।"
কিন্তু এই উদ্দেশ্যগুলো পূরণের জন্য নেওয়া পদ্ধতি কি যথাযথ?
এই প্রশ্নের উত্তরে আদালতের পর্যবেক্ষণ হলো, "পদ্ধতির যৌক্তিকতা সেটির বাস্তবায়নের সাফল্যের উপর নির্ভর করেই বিচার করা উচিত।"
"যে প্রক্রিয়াটিকে প্রথমে দেখে ভেদাভেদ সৃষ্টিকারী বলে মনে হতে পারে, সেটি সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে সাংবিধানিকভাবে যথাযথ করে তোলা সম্ভব।"
"গৃহীত পদক্ষেপগুলোর সাথে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারিত উদ্দেশ্যগুলোর একটি যুক্তিসঙ্গত সম্পর্ক রয়েছে।" আদালত আরও বলে, "এগুলো স্পষ্টভাবই কোনো প্রকার বাড়াবাড়ি নয় এবং যথেচ্ছ নাম বর্জন রোধ করার জন্য এগুলোর সাথে পর্যাপ্ত পদ্ধতিগত সুরক্ষা-ব্যবস্থাও যুক্ত করা রয়েছে।"
অর্থাৎ, এসআইআর প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে গৃহীত পদ্ধতিগুলোয় কোনো ভ্রান্তি খুঁজে পায়নি আদালত।
যেসব আবেদনকারী এই প্রক্রিয়াটিকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, তারা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, যেসব ভোটারের নাম ইতোমধ্যেই ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তাদের নাগরিকত্ব বিষয়ে প্রশ্নহীনতা সুনিশ্চিত করা দরকার এবং আইন দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতি ছাড়া এই প্রশ্নহীনতাকে খণ্ডন করা যেন না যায়।
এছাড়াও আবেদনকারীরা নির্বাচন কমিশন দ্বারা বিধিভঙ্গ ও কারণ ছাড়া বহু মানুষের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তোলেন।
যদিও আবেদনকারীদের এই সব যুক্তিকেই আদালত খণ্ডন করেছে।