'ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যাতে ভারত আর বাংলাদেশের সম্পর্ক না শোধরায়,' বললেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া

ছবির উৎস, Shib Shankar Chatterjee/ BBC

ছবির ক্যাপশান, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ ও অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি ও কলকাতা
  • পড়ার সময়: ৮ মিনিট

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের মুখ্যমন্ত্রী এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে বলছেন যে তিনি সবসময়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন যাতে ভারত আর বাংলাদেশের সম্পর্কে উন্নতি না হয়।

তার কথায়, "আমি তো সকালে সবসময়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, যে পরিস্থিতি ইউনুসের সময়ে ছিল, সেটাই যেন থাকে, সম্পর্কের উন্নতি যেন না হয়।"

ভারতের গণমাধ্যম এবিপিকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি ভারত থেকে "রাতের অন্ধকারে" কীভাবে বাংলাদেশে 'পুশ-ব্যাক' করা হয়, তারও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি।

মি. বিশ্বশর্মার কথায়, "বিএসএফ কি করে, কখনো ২০-৩০ বা ৪০ দিন, কখনো ১০ দিন মতো নিজেদের কাছে রেখে দেয় (যাদের পুশ-ব্যাক করা হবে, তাদের)। যখন বিডিআর থাকে না, সেখান দিয়ে ধাক্কা মেরে পাঠিয়ে দেয়।"

বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর নাম এখন বিজিবি হলেও পূর্বের নাম 'বিডিআর' বলেই উল্লেখ করেছেন তিনি।

রাতের অন্ধকারের সুযোগেই যে এভাবে 'পুশ-ব্যাক' করা হয়, সেটাও জানিয়েছেন তিনি।

আসামের মুখ্যমন্ত্রীর ওই সাক্ষাৎকারটি গত ১৫ই এপ্রিল সম্প্রচারিত হয়েছে, তবে তার কিছু অংশ সোমবার থেকে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিশ্লেষকরা বলছেন, আসামের মুখ্যমন্ত্রী এমন একটা সময়ে এই কথাগুলি বললেন, যখন বিজেপি নেতা ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে রাষ্ট্রদূত করে ঢাকায় পাঠানোর ঘোষণা করল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এই প্রথমবার ঢাকায় কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রদূত করে পাঠিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতির বার্তা দিতে চাইছে দিল্লি, এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা, ২০২৬এর আসাম বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে

ছবির উৎস, Anuwar Hazarika/NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা, ২০২৬ এর আসাম বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে

কেন ভারত-বাংলাদেশের সুসম্পর্ক চান না হিমন্ত?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

এবিপি নিউজের হিন্দি চ্যানেলের সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ ও সেইসব অনুপ্রবেশকারীদের 'পুশ ব্যাক' করার বিষয়ে।

সেই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে মি. বিশ্বশর্মা বলেন, "আমাদের ভাল লাগে যখন ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক ভাল থাকে না, কারণ যখন সম্পর্ক ভাল হয়ে যায়, তখন ভারত সরকারও চায় না পুশ-ব্যাক করতে। তাই আসামের মানুষের ভাল লাগে যখন ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে একটা বৈরি সম্পর্ক থাকে। ভারত আর বাংলাদেশের যখন মৈত্রী হয়ে যায়, বিএসএফ আর বিডিআর যখন করমর্দন করতে শুরু করে, তখন তা আসামের জন্য বিপজ্জনক হয়ে যায়।"

তার কথায়, "যখন সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে যায়, তখন সবকিছুই ঢিলেঢালা হয়ে যায়। তাই আমরা তো সবসময়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যাতে ভারত আর বাংলাদেশের সম্পর্ক না শোধরায়। তখন বিএসএফের কড়া প্রহরা থাকে, বন্দুক উঁচিয়ে থাকে, সেনাও চলে আসে, কেউ আসতে পারে না (কাঁটাতার পেরিয়ে)।"

এবিপি-র সাংবাদিক মেঘা প্রসাদ মন্তব্য করেন, "এটা তো ভারত-বিরোধী কথা হয়ে যাচ্ছে।"

জবাবে আসামের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "আপনি প্রশ্ন করেছেন, আমি বলেছি, আমার মনের কথা। আমি তো সকালে সবসময়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যে পরিস্থিতি ইউনুসের সময়ে যেমন ছিল, সেটাই যেন থাকে, সম্পর্কের উন্নতি যেন না হয়।"

ত্রিপুরার আখাউরায় ভারত আর বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা দীপাবলীর দিন মিষ্টি বিনিময় করছেন

ছবির উৎস, ARINDAM DEY/AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারত আর বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা করমর্দন করলে 'তা আসামের জন্য বিপজ্জনক হয়ে যায়' বলে মনে করেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা - ফাইল ছবি

আসাম থেকে কীভাবে 'পুশ-ব্যাক' করা হয়

আসামের বহুল চর্চিত 'অনুপ্রবেশ' ইস্যুতে সাংবাদিক মেঘা প্রসাদ রাজ্যের বিধানসভায় সরকারের পেশ করা কিছু তথ্য দিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করেছিলেন।

সাক্ষাৎকারের এই পর্যায়ে হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, "একজনও বাংলাদেশিকে পুশ-ব্যাক করা সহজ নয়। সীমান্তে বাংলাদেশের বাহিনী থাকে। তারা গ্রহণ করে না (পুশ-ব্যাক হওয়া ব্যক্তিদের)। ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে কোনো বন্দি বিনিময় চুক্তিও নেই।

ভারতের দিক থেকে কাউকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হলে সেটা ভারতের দিক থেকে পুশ ব্যাক আর একই ঘটনা বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে সেটা পুশ ইন।

"আমরা কী করি – অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে, যেখানে বিডিআর নেই, সেখান দিয়ে পুশ-ব্যাক করে দিই। বিএসএফ কী করে - কখনো ২০-৩০ বা ৪০ দিন, কখনো ১০ দিন মতো নিজেদের কাছে রেখে দেয় (যাদের পুশ-ব্যাক করা হবে, তাদের)। যখন বিডিআর (বিজিবি) থাকে না, সেখান দিয়ে ধাক্কা মেরে পাঠিয়ে দেয়," বলেছেন মি. বিশ্বশর্মা।

তিনি বলেন, "যদি আইনি পথে আমরা ফেরত পাঠাতে চাই, তাহলে পুরো বিষয়টা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে, তারা বাংলাদেশে পাঠাবে সেসব। এরপরে বাংলাদেশের ওপরে নির্ভর করবে কাকে মেনে নেবে, কাকে মানব না।

"বাংলাদেশ প্রমাণ চায়," মন্তব্য মুখ্যমন্ত্রীর।

তার প্রশ্ন, "এইজন্য আপনি ভারত থেকে কাউকে বাংলাদেশে পাঠাতে পারবেন না, বাংলাদেশ কাউকেই বাংলাদেশি বলে স্বীকার করে না। তাহলে আমাদের সামনে কী পথ খোলা আছে?"

"এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট একটা রায় দিয়েছে বছর খানেক আগে, যে একজন জেলাশাসকের যদি মনে হয় কোনো ব্যক্তি ভারতীয় নন, তিনি বিতাড়নের নির্দেশ জারি করতে পারেন। বিতাড়নের অর্থ কী? ভারত থেকে বিতাড়ন করে দাও," বলছিলেন মি. বিশ্বশর্মা।

এই পর্যায়ে সাংবাদিক প্রশ্ন করেন যে কোথায় বিতাড়ন করা হবে?

"আইনে বা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সেটা উল্লেখ করা নেই। ওখানে লেখা আছে যে আপনি দেশ থেকে বিতাড়ন করতে পারবেন। তাই আমরা এখন বিতাড়ন করতে শুরু করেছি বাংলাদেশ সীমান্তে। শব্দটা হল – পুশ-ব্যাক। আপনারা নিয়ে যান (বাংলাদেশে)," বলছিলেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা।

তিনি এও বলেন যে শুধু আসামে বসবাসকারী কথিত অনুপ্রবেশকারীদের নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও নিয়ে এসে পুশ-ব্যাক করা হয়েছে

গতবছর আসামের কয়েকজন বাসিন্দাকে পুশ ব্যাক করার পরে কুড়িগ্রাম সীমান্তে নো ম্যানস্ ল্যান্ডে তাদের কয়েকজনকে দেখা যায় - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Alahi Sgagria Nazim/BBC

ছবির ক্যাপশান, গতবছর আসামের কয়েকজন বাসিন্দাকে পুশ ব্যাক করার পরে কুড়িগ্রাম সীমান্তে নো ম্যানস্ ল্যান্ডে তাদের কয়েকজনকে দেখা যায় - ফাইল ছবি

কোন আইনের কথা বললেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী?

মি. বিশ্বশর্মা যে আইনটির কথা উল্লেখ করছিলেন, সেটি বহু পুরোনো একটি আইন - 'অভিবাসী (আসাম থেকে বহিষ্কার) নির্দেশ, ১৯৫০'

গতবছর যখন বড় সংখ্যায় 'পুশ-ব্যাক' করা হতে থাকে, সেই সময়েই এই পুরোনো আইনটির সম্বন্ধে জানা যায়। সেই সময়ে মি. বিশ্বশর্মা বলেছিলেন, "কোনও এক অজ্ঞাত কারণে আমাদের আইনি পরামর্শদাতারা আগে এ ব্যাপারটা আমাদের জানান নি, আমরাও এটির ব্যবহারের সম্বন্ধে জানতাম না।"

তবে আইনজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, ১৯৫০ সালে তৈরি ওই আইনটি নির্দিষ্ট কারণে আনা হয়েছিল। এই আইন দিয়ে 'পুশ ব্যাক' করা যায় না বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলেন গৌহাটি হাইকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হাফিজ রশিদ চৌধুরী।

তিনি বলেছিলেন, "বিদেশি ট্রাইব্যুনালগুলোকে এড়িয়ে এক্সিকিউটিভ অর্ডার দিয়ে মানুষগুলোকে এখান থেকে পুশ ব্যাক করারই চেষ্টা করছে সরকার। এটা করা যায় না।"

তার কথায়, "যে পুরোনো আইনটি ব্যবহার করার কথা বলা হচ্ছে, তা দিয়ে পুশ ব্যাক করাই যায় না। এটা নির্দিষ্ট ভাবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসামে আসা মানুষদের জন্য করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে যদি কারও অবস্থান ভারতের স্বার্থের পরিপন্থী হয়, তাদের মধ্যে কেউ যদি ভারত বিরোধী কাজে লিপ্ত থাকেন, তাহলেই তাকে বহিষ্কার করা যেতে পারে।"

ঢাকার মিরপুরে সাকিনা বেগমের (ডানদিকে) সঙ্গে কথা বলছিলেন বিবিসির তফসীর বাবু
ছবির ক্যাপশান, আসামের নলবাড়ির বাসিন্দা সাকিনা বেগমকে চার মাস পরে ঢাকায় খুঁজে পেয়েছিল বিবিসি বাংলা

'পুশ-ব্যাক' হওয়া মানুষদের অভিজ্ঞতাও একই

আসামের মুখ্যমন্ত্রী বাংলাদেশে 'পুশ-ব্যাক' করার যে পদ্ধতির কথা খোলাখুলি স্বীকার করেছেন, তা অনেকদিন ধরেই বিবিসি বাংলার নানা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে গত প্রায় একবছর ধরে।

গতবছর ২২শে এপ্রিল ভারত-শাসিত কাশ্মীরের পহেলগামে হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই ভারতের নানা রাজ্যে শুরু হয় 'অবৈধ বাংলাদেশি চিহ্নিত' করার এক বিশেষ অভিযান।

তারপর থেকেই বিভিন্ন রাজ্য থেকে 'অনুপ্রবেশকারী' হিসাবে দেখিয়ে অনেক মানুষকে বাংলাদেশে পুশ-ব্যাক করে দেওয়া হয়েছিল। আবার আসামের অনেক মানুষকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে পুশ-ব্যাক করে দেওয়া হয়েছিল

তাদেরই একজন ছিলেন মোরিগাঁও জেলার খন্দপুখুরি গ্রামের প্রাক্তন শিক্ষক খাইরুল ইসলাম। তাকে গত বছর মে মাসের শেষের দিকে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়ার দিন দুয়েক পরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কুড়িগ্রাম সীমান্তের 'নো ম্যানস ল্যান্ডে' দেখতে পাওয়া যায়।

আরও কয়েকজনকেও দেখা গিয়েছিল সেই ভিডিওতে।

তারা দাবি করেন যে আসামের বাসিন্দা তারা। পুলিশ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে এসে মাটিয়া ডিটেনশন ক্যাম্পে রেখেছিল। সেখান থেকে বিএসএফের মাধ্যমে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

ওই ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পরে অবশ্য সেই পর্যায়ে পুশ-ব্যাক হওয়া অনেককে ফিরিয়ে এনেছিল ভারত সরকার। তাদের মধ্যে ছিলেন মি. ইসলামও।

আবার বহুল চর্চিত সাকিনা বেগম, যাকে আসামের নলবাড়ি জেলায় তার বাড়ি থেকে পুলিশ ডেকে নিয়ে যাওয়ার অনেকদিন পরে ঢাকার মিরপুরে খুঁজে পেয়েছিল বিবিসি বাংলা, তার বর্ণনাতেও উঠে এসেছিল যে কীভাবে রাতের অন্ধকারে সীমান্তে নিয়ে গিয়ে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।

সোনালি খাতুন নামে পশ্চিমবঙ্গের এক গর্ভবতী নারীকে তার পরিবার সহ বাংলাদেশে পুশ-ব্যাক করে দেওয়া হয়েছিল।

তবে ভারত ও বাংলাদেশ – দুই দেশেরই আদালত রায় দিয়েছিল যে ওই নারী ভারতীয় নাগরিক। তাকে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

তাই যাদের 'পুশ-ব্যাক' করা হচ্ছে, তারা যে সকলেই বাংলাদেশি নাগরিক এবং ভারতে অবৈধ উপায়ে এসেছিলেন, সেই দাবি সত্য নয়।

আসামের গোয়ালপাড়া জেলার মাটিয়াতে বিদেশিদের আটক শিবির
ছবির ক্যাপশান, আসামের গোয়ালপাড়া জেলার মাটিয়াতে বিদেশিদের আটক শিবির

হিমন্ত বিশ্বশর্মা কেন এই মন্তব্য করলেন?

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এমন একটা সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং ভারত থেকে 'পুশ-ব্যাক' করার আইন-বহির্ভূত পদ্ধতির কথা প্রকাশ্যে বললেন, তখন দিল্লি দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতিসাধনের বার্তা দিতে চাইছে ঢাকাকে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়া ও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্কে যে শীতলতা এসেছিল, তা কাটিয়ে উঠতেই তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কয়েকমাসের মধ্যেই ঢাকায় নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করার ঘোষণা করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, এই প্রথমবার ঢাকায় পেশাদার কূটনীতিকের বদলে একজন রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হচ্ছে।

দীনেশ ত্রিবেদীর নাম বাংলাদেশে নতুন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে মাত্রই সোমবার।

এরকম একটা সময়ে হিমন্ত বিশ্বশর্মার মন্তব্য কিছুটা অবাক করেছে বিশ্লেষকদের।

ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ শ্রীরাধা দত্ত বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "আসামে অনুপ্রবেশের সমস্যা আছে ঠিকই। কিন্তু সমস্যাটা দুদিক থেকে দেখা দরকার।

"একদল যেমন অবৈধভাবে হয়তো আসামে প্রবেশ করছেন, তেমনই তারা ভারতে এসে যে জাতীয় পরিচয়পত্র বানিয়ে ফেলছেন, এটা ভারতের সমস্যা। কীভাবে তারা পরিচয় পত্র পাচ্ছেন?" প্রশ্ন শ্রীরাধা দত্তের।

তার কথায়, সমস্যাটা দুই দেশের, তাদের দুই পক্ষকে মিলেই সমস্যার সমাধান করতে হবে।

তবে হিমন্ত বিশ্বশর্মা যে মন্তব্য করেছেন, তা সমস্যা সমাধানের পথ প্রশস্ত করবে না বলেই তিনি মনে করেন।

"ভারত যদি গ্লোবাল সাউথের নেতা বলে নিজেদের দাবি করে, তাদের আরও পরিণত আচরণ দেখাতে হবে, দায়িত্বশীল হিসাবে তুলে ধরতে হবে। এরকম একটা মন্তব্য, যে আমরা তো এভাবে ধাক্কা দিয়ে বার করে দিই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে – এসব বলে কোনো সমস্যার সমাধান হবে না," বলছিলেন শ্রীরাধা দত্ত।

ঢাকায় ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী অবশ্য হিমন্ত বিশ্বশর্মার মন্তব্যকে 'ডিফেন্ড' করছেন না, তবে তিনি মনে করেন 'তিনি ভুল কিছু বলেননি'।

তার কথায়, "হিমন্ত বিশ্বশর্মা যা বলেছেন, তা নতুন কিছু কথা নয়। আমরা সবাই জানি যে এভাবেই পুশ-ব্যাক হয়, উনি সেটাকে সামনে এনে ফেলেছেন মাত্র।

"সেটা বলাটা ঠিক হয়েছে না ভুল, সেই তর্কে না গিয়েও আমি এটা বলতে পারি যে ভারত থেকে যে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের ধরা হয়, তাদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে একটা পদ্ধতিগত সমস্যা দীর্ঘদিন ধরেই আছে। ধৃত বাংলাদেশিদের তালিকা দেয় ভারত, তাদের ঠিকানা বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয় যাচাই করার জন্য। কিন্তু বাংলাদেশে সেটা দিনের পর দিন ঝুলিয়ে রাখে। সেজন্য কিছুটা বাধ্য হয়েই এই পুশ-ব্যাক করার পদ্ধতিটা নিয়েছে, যাতে ধৃতদের তাড়াতাড়ি ফেরত পাঠানো যায়," তিনি বলছিলেন।

তবে কিছু ঘটনায় এভাবে পুশ ব্যাক করা ব্যক্তিদের পরবর্তীতে ভারতীয় নাগরিক বলে প্রমাণ হতেও দেখা গেছে, যাদের আবার ফেরত নেওয়া হয়েছে।

হিমন্ত বিশ্বশর্মার মন্তব্যের প্রেক্ষিতে অভিজ্ঞ সাবেক এই কূটনীতিক বলছিলেন, "অনেক সময়েই অভ্যন্তরীণ রাজনীতি আর কূটনীতি আলাদাভাবে পথ চলে। তিনি হয়তো তার রাজনৈতিক স্বার্থ থেকে এই কথাগুলো বলেছেন। তার এই কথাগুলো বলাটা উচিত হয়েছে কী না, তা নিয়ে আমি মন্তব্য করব না।"