'মায়ের মৃতদেহ আটকে ছেলেকে কান ধরে ওঠবস', কী ঘটেছিল রংপুর মেডিকেলে

ছবির উৎস, Shahriar Meem
- Author, রাকিব হাসনাত
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৪ মিনিট
বাংলাদেশের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সাথে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলে এক নারীর মৃতদেহ আটকে তার ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করানোর ঘটনা আলোচনার ঝড় তুলেছে।
ওই ছেলের কান ধরে ওঠবসের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার জের ধরে কর্মবিরতির ডাক দেওয়া ইন্টার্ন চিকিৎসকরা আজ রবিবার দুপুর পর্যন্ত হাসপাতালের কাজে যোগ দেননি বলে জানা গেছে।
শনিবার এ নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধে হাসপাতালে জরুরি সেবা বিভাগের কার্যক্রম শনিবার অন্তত তিন ঘণ্টা বন্ধ রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেছেন, যিনি মারা গেছেন তার ছেলে চিকিৎসকদের মারধর করেছেন এবং পরে এ ঘটনায় মেডিকেল কলেজের ছাত্ররাও জড়িয়ে পড়ে।
"ভিডিও ফুটেজে আমরা দেখেছি চিকিৎসকদের মারধর করা হয়েছে। তারপরেও আমরা চেষ্টা করেছি পরিস্থিতি সামাল দিতে। নিহত নারীর ছেলে না আসায় লাশ হ্যান্ডওভার করতে দেরী হয়েছিল," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
ওদিকে যাকে কান ধরে ওঠবস করতে বাধ্য করা হয়েছে, সেই রিফাত হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "যা হবার হয়ে গেছে। আমার আর কোনো অভিযোগ নেই। তবে আমি শুধু বলতে চাই যে আমার মতো কেউ যেন আর মা না হারায়"।

ছবির উৎস, SHARIER MIM
ঘটনা কী হয়েছিল
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, চিকিৎসক ও নিহতের স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শুক্রবার গভীর রাতে রংপুরের জুম্মাপাড়া এলাকার নুরুন্নাহার বেগম হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তার ছেলে রিফাত হোসেন ও তার স্ত্রী তাকে রংপুরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে নিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই নুরুন্নাহার মারা যান। এরপরই এ নিয়ে নিহতের ছেলেসহ স্বজনদের সাথে চিকিৎসকদের উচ্চবাচ্য হয়েছিল বলে জানান হাসপাতালের পরিচালক আশিকুর রহমান।
মি. রহমান বলছেন, সিসিটিভি ফুটেজে তারা দেখেছেন যে চিকিৎসকদের মারধর করা হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন কর্মরত নার্সও।
যদিও নিহতের ছেলে রিফাত হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ঘটনার আকস্মিকতায় ডাক্তারদের সাথে তাদের উচ্চবাচ্য হয়েছে। তবে সেখানে কাউকে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
"আমার হয়তো এমন করা ঠিক হয়নি। তবে আমার মায়ের মত আর কোনো মাকে যেন হাসপাতালে এসে মরতে না হয়," বলছিলেন তিনি।
জানা গেছে, ওই নারীর মৃত্যুর পর রিফাতসহ তার স্বজনরা কর্মরত ডাক্তারদের বিরুদ্ধে রোগীকে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন না দেওয়ার অভিযোগ তোলেন।
এ নিয়ে তখন দু পক্ষ বিবাদে জড়িয়ে পড়লে দুজন ইন্টার্ন চিকিৎসককে মারধরের ঘটনা ঘটে।

ছবির উৎস, SHARIER MIM
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
রোগীর স্বজনরা বারবার অভিযোগ করতে থাকেন যে অক্সিজেন না দেওয়াতেই ওই নারীর মৃত্যু হয়েছে। তবে চিকিৎসকরা বলেছেন, রোগীর জন্য চিকিৎসার যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, কিন্তু রোগীর মৃত্যুর পর চিকিৎসকদের ওপর হামলা করা হয়েছে।
ওই ঘটনার পর সকালে হাসপাতালের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং পরে নিহত নারীর স্বজনরা তার মৃতদেহ আনতে গেলে তখন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা মৃতের ছেলে রিফাত হোসেনকে এসে ক্ষমা চাওয়ার শর্ত দেন।
এক পর্যায়ে মৃতদেহ যখন মর্গে তখন চিকিৎসকরা সেখানে অবস্থান নেন এবং রিফাতকে এসে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে বিক্ষোভ শুরু করেন তারা।
অন্যদিকে লাশ না পেয়ে নিহতদের স্বজনরা হাসপাতালের বাইরে মেডিকেল মোড়ের সড়ক অবরোধ করেন।
এক পর্যায়ে নিহতের স্বজনরা অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে মর্গের সামনে গেলেও লাশ তুলতে বাধা দেন ইন্টার্ন চিকিৎসক ও মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তালা দিলে প্রায় তিন ঘণ্টা জরুরি বিভাগের কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
পরে হাসপাতালের পরিচালক দু পক্ষের সাথে কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন।
শেষ পর্যন্ত শনিবার বেলা তিনটার দিকে নিহতের ছেলে রিফাত হোসেন হাসপাতালে গেলে তাকে একটি কক্ষে নিয়ে কান ধরে ওঠবস করানো হয়।

ছবির উৎস, SHARIER MIM
কান ধরে ওঠবস করানোর যে ভিডিওটি ব্যাপক প্রচার হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে, সেখানে তাকে গুনে গুনে কান ধরে ওঠবস করতে দেখা গেছে। ঘটনার সময় কক্ষটিতে আরও অনেকে উপস্থিত ছিল।
এরপর তার মায়ের মৃতদেহ ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন তিনি। "যা দেখেছেন তাই সত্যি। তবে এখন আমার আর কোনো অভিযোগ নেই। এ বিষয়ে আর কিছু বলতে চাই না," বিবিসি বাংলাকে রোববার বেলা তিনটায় বলেছেন তিনি।
তার ভাই মোজাম্মেল হোসেন রিন্টু বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমার ভাই কিছুটা উচ্চবাচ্য হয়তো করেছে। এটি ঠিক হয়নি। আমাদের জন্য অন্য রোগীদের সমস্যা হোক তা আমরা চাই না। তবে সাংবাদিকদের উচিত হাসপাতালে এসে পরিস্থিতি দেখা"।
যদিও হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেছেন, নিহত নারীর ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করিয়েছে মেডিকেল কলেজের একজন ছাত্র। ওই চিকিৎসক তার নাম প্রকাশ করার অনুরোধ করেছেন।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য রংপুরে ইন্টার্ন ডাক্তারদের সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সাথে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তারা সাড়া দেননি।
যদিও এই ঘটনার পর হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিরাপত্তার দাবিতে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতি চালিয়ে যাচ্ছেন এবং মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও তাদের ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে আজ ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন।
হাসপাতালের পরিচালক আশিকুর রহমান বলেছেন তারা আলোচনার মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধান করবেন।








