বৃষ্টি, কালবৈশাখী, ঘূর্ণিঝড়, লঘুচাপ-মে মাসে কেমন থাকবে বাংলাদেশের আবহাওয়া?

মে মাসের কালবৈশাখী ঝড়ে বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, মে মাসের প্রথম সপ্তাহের পর থেকে স্বাভাবিকের চেয়ে তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা
    • Author, জান্নাতুল তানভী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

গত এক সপ্তাহ ধরে ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব বিভাগেই টানা বৃষ্টি ও বজ্রপাত হচ্ছে। এর ফলে ঠাণ্ডা আবহাওয়া বিরাজ করলেও বজ্রপাতে এখন পর্যন্ত সারাদেশে প্রায় ৫৬ জন মারা গেছেন।

বজ্রপাতের জন্য আগাম সতর্ক বার্তা দেওয়া হলেও কমছে না মৃত্যু।

যদিও আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্পর্কে মানুষ যে এখন বেশ উদগ্রীব সেটি গুগল সার্চেই প্রমাণ হয়।

কেননা গুগল ট্রেন্ডিং এর শীর্ষেই রয়েছে আবহাওয়া ও বৃষ্টি সম্পর্কে মানুষের নানা প্রশ্ন।

এরই মধ্যে, বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর কালবৈশাখী ঝড়, ভারী বৃষ্টিপাতসহ বেশ কয়েকটি সতর্কবার্তা দিয়েছে।

এরই মধ্যে, মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘন্টার জন্য কালবৈশাখী ঝড়ের একটি সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের দেওয়া এই সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম এবং সিলেট বিভাগের ওপর দিয়ে বিদ্যুত চমকানোসহ পশ্চিম বা উত্তরপশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যেতে পারে।

তবে আগামী দশদিনের মধ্যে আপাতত বঙ্গোপসাগরে কোনো লঘুচাপ তৈরি এবং ঘূর্ণিঝড় হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। তবে সাগরে তীব্র গতির বাতাস থাকার কারণে বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দরগুলোতে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

কিন্তু মে মাসের প্রথম সপ্তাহের পর থেকে স্বাভাবিকের চেয়ে তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন আবহাওয়াবিদ মুহাম্মাদ আবুল কালাম মল্লিক।

কালবৈশাখী ঝড়ের সময় মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হয়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কালবৈশাখী ঝড়ের সময় মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হয়

"ক্রুয়েলেস্ট মান্থ এপ্রিল এবার অনেকটাই সহনশীল"

আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, এপ্রিল মাসে সাধারণত গড় তাপমাত্রা থাকে ৩৩ দশমিক দুই ডিগ্রি।

কখনও কখনও এই তাপমাত্রা বেড়ে ৩৬ থেকে ৪২ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করে এই মাসে।

তবে এবার শুধুমাত্র একবারই ২২শে এপ্রিল রাজশাহীতে ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রা ছিল বলে জানান আবহাওয়াবিদ মি. মল্লিক।

"এরপরে এখন যে তাপমাত্রা বাংলাদেশে বিদ্যমান রয়েছে তা অনেকটাই স্বস্তিদায়ক। আপাতত তাপপ্রবাহ নাই। গরমের অনুভূতির তীব্রতাও কম" বলে জানান মি. মল্লিক।

"উচ্চ তাপমাত্রার ক্রুয়েলেস্ট এপ্রিল মাস এবার অনেকটাই সহনশীল। এবার এপ্রিল মাসের গড় তাপমাত্রা অনেকটাই সহনশীল এবং স্বস্তিদায়ক এপ্রিল মাস পেয়েছি আমরা" বলেন এই আবহাওয়াবিদ।

কালবৈশাখী ঝড় কখন, কেন ও কতগুলো হয়?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সাধারণত মার্চ, এপ্রিল, মে এই তিন মাসকে প্রি-মনসুন বা প্রাক-বর্ষা বলা হয় বলে জানান আবহাওয়াবিদ মি. মল্লিক।

এই প্রাক-বর্ষা মৌসুমে যে ৩৮ শতাংশ বজ্রঝড় হয় বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে, স্থানীয়ভাবে সেটিকে কালবৈশাখী ঝড় বলা হয়।

কিন্তু সব বজ্রঝড়ই কালবৈশাখী ঝড় নয় উল্লেখ করে মি. মল্লিক বিবিসি বাংলাকে বলেন, "তবে, জুন, জুলাই, অগাস্ট এবং সেপ্টেম্বরে যে বজ্রঝড় হয় সেটি কালবৈশাখী ঝড় নয় আমরা বজ্রঝড়ই বলি।"

এই বজ্রঝড়ের পরিমাণ প্রায় ৫১ শতাংশ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

মি. মল্লিক বলছিলেন, প্রি-মনসুন এই মৌসুমে মেঘ থেকে ভূমিতে অথবা ভূমি থেকে মেঘে বজ্রপাত বেশি হয় এবং মানুষ বেশি মারা যাচ্ছে।

কতগুলো কালবৈশাখী ঝড় এই মৌসুমে হয়ে থাকে এমন প্রশ্নে এই আবহাওয়াবিদ জানান, মার্চ মাসে গড়ে পাঁচ থেকে ছয়টি, এপ্রিল মাসে গড়ে নয়টি এবং মে মাসে ১৩টি কালবৈশাখী ঝড় হয়।

তবে, "২০২৬ সালে, এবার বজ্রমেঘ তৈরির ঘনঘটা বৃদ্ধি পেয়েছে, এখন পর্যন্ত দশটির অধিক বজ্রঝড় অলরেডি তৈরি হয়েছে। মানে স্বাভাবিক বজ্রঝড় যে নয়দিন হওয়ার কথা তার চেয়ে এবার বেশি হয়েছে" বলেন মি. মল্লিক।

৭৬ বছরের মধ্যে ২০২৪ সালেই টানা ৩৫ দিন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবার তা নেই, বজ্রঝড় বেশি হওয়ার কারণেই এবারের এপ্রিল অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক ছিল।

২০২৪ সালের এপ্রিলে কালবৈশাখী ঝড় কম হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন আবহাওয়াবিদরা।

তবে এবার এই ঝড় কেন বেশি হয়েছে এমন প্রশ্নে মি. মল্লিক জানান, "বিভিন্ন কারণে বজ্রঝড়ের ব্যত্যয় ঘটেছে। লোকাল এবং গ্লোবাল অ্যাটমসফেরিক কন্ডিশনের মধ্যে যে মিথষ্ক্রিয়া তার মধ্যে ব্যত্যয় ঘটায় এবার বজ্রমেঘ তৈরির ঘনঘটা বৃদ্ধি পেয়েছে।"

বিশেষ করে সিলেটে এবার এই কালবৈশাখী ঝড় বেশি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

"বুধবার থেকে রাজশাহী এবং খুলনা বিভাগে বজ্রমেঘ তৈরি বৃদ্ধি পেতে পারে এবং বজ্রঝড় তৈরি হতে পারে এবং ব্যাপক তান্ডব চালাতে পারে" বলেন আবহাওয়াবিদ মি. মল্লিক।

বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার নৌকা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, চারটি সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর

ভারী বৃষ্টিপাত ও সমুদ্র সংকেতের যে সতর্কবার্তা

মঙ্গলবার সকালে ৯৬ ঘণ্টার জন্য ভারী বৃষ্টিপাতের এক সতর্কবার্তা দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

এতে বলা হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরে বজ্রমেঘ তৈরি অব্যাহত থাকায় পরবর্তী ৯৬ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম এবং সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে।

আর এই ভারী বৃষ্টিপাত ২৪ ঘণ্টায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বেগে এবং অতি ভারী বৃষ্টিপাত ২৪ ঘণ্টায় ৮৮ মিলিমিটার বা এর বেশিও হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

একইসঙ্গে, ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের কারণে ওইসব এলাকার কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতাসহ চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভূমিধ্বস হতে পারে বলে সতর্ক করেছে অধিদপ্তর।

পৃথক আরেকটি আবহাওয়ার সতর্কবার্তায়, উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি এসে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।

উত্তর বঙ্গোপসাগর ও এই সংলগ্ন এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য রয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রাসহ এই চারটি সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

আগামী পাঁচদিনের আবহাওয়ার যে পূর্বাভাস দিয়েছে অধিদপ্তর

আবহাওয়া অধিদপ্তর দোসরা মে পর্যন্ত পাঁচদিনের যে পূর্বাভাসে দিয়েছে তাতে বলা হয়েছে, ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, সিলেট এবং বরিশালসহ এই পাঁচ বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।

এছাড়া, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়া বিদ্যুত চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।

এই পূর্বাভাসে দেখা যাচ্ছে, ঢাকাসহ দেশের সবকটি বিভাগেই দোসরা মে পর্যন্ত মাঝারি বা ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।

এরপরে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমতে পারে এবং তাপমাত্রা আরো বাড়তে পারে।

ঘূর্ণিঝড়ের সময় তীব্র বাতাস বয়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহের পরে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস

মে মাসে কী কোনো ঘূর্ণিঝড় হবে?

আবহাওয়াবিদরা বলছেন খুব অল্প সময়, অর্থাৎ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বজ্রঝড় তৈরি হয় বলে কয়েক দিন আগে এ সম্পর্কে ধারণা করা কঠিন।

অবশ্য কোনও অঞ্চলে ব্যাপক গরম পড়লে তখন কেউ কেউ অনুমান করেন, এ ধরনের ঝড় হতে পারে। তবে এটি নিতান্তই আবহাওয়ার অবস্থা দেখে অনুমান করা।

কালবৈশাখী কোথায় কতক্ষণ হবে সেটি আগে থেকেই জানিয়ে দেওয়ার মতো বৈজ্ঞানিক কোনও উপায় এখনো নেই।

মি. মল্লিক জানান, এপ্রিল মাসে যে কালবৈশাখী ঝড় হওয়ার কথা ইতোমধ্যেই এবার সেই সীমা পার হয়েছে।

"আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহের পরে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে। জুন মাসেও স্বাভাবিক অপেক্ষা তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে," পূর্বাভাস দিয়েছেন এই আবহাওয়াবিদ।

এর ফলে আগামী দুই মাসে মাঝে মাঝেই গরমের অনুভূতির তীব্রতা বাড়বে বলে উল্লেখ করেন মি. মল্লিক।

"কারণ বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি এবং বাতাসের গতিবেগ যদি কম থাকে তখন গরমের অনুভূতির তীব্রতা একটু বৃদ্ধি পায়" পূর্বাভাস করেছেন এই আবহাওয়াবিদ।

মে মাস এমনিতেই ঘূর্ণিঝড়প্রবণ মাস উল্লেখ করে তিনি জানান, এক থেকে দুইটি লঘুচাপ তৈরি হতে পারে।

"এর মধ্যে একটি নিম্নচাপ বা গভীর নিম্নচাপ অথবা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে" বলেন মি. মল্লিক।

তবে আপাতত দশদিনের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় বা লঘুচাপ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন এই আবহাওয়াবিদ।