প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে সমালোচনার জবাবে যা বলল সরকার

Published
পড়ার সময়: ৬ মিনিট

প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন, সমালোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এটিকে দলীয় বাজেট বলে অভিযোগ করা ঠিক নয়। তিনি দাবি করেন, সবার স্বার্থ বিবেচনায় রেখে তারা অন্তর্ভূক্তিমূলক এই বাজেট প্রস্তাব করেছেন।

জাতীয় সংসদে বিএনপি সরকারের আগামী অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের পরদিন শুক্রবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বাজেট নিয়ে সমালোচনা ও বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায়আসার চার মাসের মাথায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের প্রথম বাজেট সংসদে উপস্থাপন করেছে বৃহস্পতিবার।

বাজেট উপস্থাপনের পর থেকেই বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি,ইসলামীআন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সহ বিভিন্ন দল প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। জামায়াাত বৃহস্তিবারই সন্ধ্যায় ঢাকায় প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করেছে।

এই দলগুলো প্রস্তাবিত বাজেটকে 'গণবিরোধী' বলে অভিহিত করছে। এই বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব কি না, এমন প্রশ্নও তুলেছে দলগুলো। তারা এই বাজেটকে 'দলীয় বাজেট বলেও অভিযোগ তুলেছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি এবং বিভিন্ন সংগঠনও বাজেট বাস্তবায়নের প্রশ্ন তুলেছে।

আজ শুক্রবার দুপুরে ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি সরকারের পক্ষে অর্থমন্ত্রী সেসব সমালোচনার জবাব দিয়েছেন।

সেখানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এবারের বাজেট দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য দেওয়া হয়েছে এবং বরাদ্দ যেন সঠিকভাবে হয়, সেটিও নিশ্চিত করা হবে।

বাজেটের যে প্রসঙ্গে সমালোচনা

প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট নিয়ে সিপিডি জানিয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে করমুক্ত আয়ের যে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিম্ন আয়ের মানুষদের স্বস্তি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। বর্তমান কর কাঠামোতে সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষের ওপরই করের বোঝা অনেক বেশি পড়ছে।

সেই বিবেচনায় প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা আরও বাড়ানো প্রয়োজন ছিল বলে জানিয়েছেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানও বলেন, "মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে বাজেটে যেসব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ নয়। ফলে এর বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।"

আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার জামায়াতে ইসলামী ঢাকায় বায়তুল মোকারম মসজিদের উত্তর গেট থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে

সমাবেশে জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, "সরকার এই বাজেটে কোনো নীতিগত সংস্কারের প্রস্তাব দিতে পারে নাই। এই কারণে এটাকে গতানুগতিক বাজেট বলা হচ্ছে"।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের মতে, এই বাজেটের প্রধান দুর্বলতা হচ্ছে এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘাটতির বাজেট। একইসঙ্গে, এটি বিরাট ঋণনির্ভর বাজেট। ব্যাংক ঋণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়ায় বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাবে, কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হবে এবং অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এছাড়া, সরকার যে ছয় লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের কথা বলছে, মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির ফলে তা অর্জন করা সম্ভব নয়। সেইসাথে, সাড়ে ছয় শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার বাস্তব ভিত্তি নেই বলেও মনে করছেন তিনি।

এনসিপি এই বাজেটকে 'উচ্চাভিলাষী ও বাস্তবতা-বিবর্জিত' হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে যে সরকার যে ঘাটতির কথা বলেছে, প্রকৃত ঘাটতি সাড়ে চার লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি।

তারাও মনে করে, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অর্জন করা অসম্ভব।

বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি মনে করছে, বাজেটে সমাজের বিভিন্ন অংশকে তুষ্ট করার চেষ্টা থাকলেও বিশাল ঘাটতি বাজেটের চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়বে।

মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা নিয়ে সরকারের ভাবনা

বাজেটের যে সব দিক নিয়ে সমালোচনা করা হয়েছে, তার মাঝে অন্যতম হলো মূল্যস্ফীতি।

আজ বাজেট নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে বলেছেন, "মূল্যস্ফীতি তিন মাসের ব্যাপার নয়, এটা তিন বছর ধরে চলছে। এর সাথে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। ব্যাংকগুলোতে মূলধনের ঘাটতি রয়েছে।"

সবমিলিয়ে, আমদানিকৃত পণ্যের দাম বেড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, "আমরা সংস্কারের মাধ্যমে 'কস্ট অব ডুইং বিজনেস' কমানোর চেষ্টা করছি"।

তার মতে, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমিয়ে আনতে পারলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।

অর্থমন্ত্রী এ-ও জানান, "কমপক্ষে তিন মাসের জ্বালানি আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। আমরা তেল, গ্যাস, খাদ্য বাফার স্টক রাখতে পারলে খরচ কমে যাবে। পোর্টে দুর্নীতি কমালে খরচ কমে যাবে। সরকারি লোক দিয়ে মূল্য নিয়ন্ত্রণ হয় । এটা ম্যানেজমেন্ট, পলিসির মাধ্যমে করতে হবে"

'বেতন বাড়ালে দুর্নীতি কমবে'

চলতি বছরের পহেলা জুলাই থেকে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো কার্যকর করতে যাচ্ছে সরকার।

সংবাদ সম্মেলনে এ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, "বাড়লে তো দুর্নীতি কমার কথা। অভাব থাকলে দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতা থাকে। দুর্নীতি ছাড়াও ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মকর্তাদের কোনো পে স্কেল হয় নাই। কিন্তু এর মধ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। তাদের কস্ট অব লিভিং বেড়েছে।"

"বেসরকারি খাতে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বেতন বাড়লেও সরকারি খাতে সেই সমন্বয় হয়নি।"

এসময়, দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, "কোন খাতে কত চাকরি হবে- এটাতো নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব না। আমরাতো বিস্তারিত বলেছি।"

"আইসিটিতে, ইন্ডাস্ট্রিতে, এগ্রিকালচারে, বিদেশে, দেশে, স্বাস্থ্যখাতে, সবগুলো বলা হয়েছে। আমরা হয়তো বিপরীতে সংখ্যা দেই নাই। সংখ্যা দেওয়া সম্ভবও না। কারণ কোথাও কম হবে, কোথাও বেশি হবে। মূল বিষয় হল, আমাদের চাহিদা সৃষ্টি করতে হবে।"

সেই লক্ষ্যেই, বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিক্ষা খাতে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির ভিত্তি গড়ে তোলা হবে। তার মতে, দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারলে দেশ ও বিদেশ দুই জায়গাতেই কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।

বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ আছে?

এবারের বাজেট নিয়ে আরেকটি সমালোচনার জায়গা, 'কালো টাকা সাদা করার সুযোগ।'

এ প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, বাজেটে কালো টাকা সাদা করার কোনো সুযোগ নেই। জমি কেনাবেচার প্রকৃত মূল্য ঘোষণার বিষয়ে যে বিধান রাখা হয়েছে, সেটিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এটি মূলত করদাতাদের হয়রানি কমানোর একটি ব্যবস্থা।

আরেক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় তারা এমন একটি ব্যাংকিং খাত পেয়েছেন, যেখানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থ লোপাট হয়েছে। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রথম কাজ ছিল খাতটিকে স্থিতিশীল করা।

ইসলামী ব্যাংক ও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো নানা গুজবের বিষয়ে গভর্নর বলেন, আমানতকারীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। প্রয়োজনীয় তারল্য সহায়তা দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রস্তুত রয়েছে। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) আমানত ফেরত দেওয়ার কার্যক্রমও শিগগির শুরু হবে।

গভর্নর আরও বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সরকারের 'স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স' কাজ করছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি দেশে সম্পদ জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাধারণত এসব সম্পদ উদ্ধার করতে পাঁচ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। তারপরও আমাদের অঙ্গীকার হলো, যারা টাকা চুরি করে নিয়ে গেছে তাদের শান্তিতে থাকতে দেওয়া হবে না।

একই সঙ্গে তিনি এ-ও জানান, আগামী পহেলা জুলাই থেকে 'বাংলা কিউআর' ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হবে, যাতে সব ধরনের ডিজিটাল লেনদেন একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে করা যায়।

তার মতে, এতে নগদ অর্থের ব্যবহার কমবে এবং ডিজিটাল অর্থনীতি আরও সম্প্রসারিত হবে।

বাজেট বাস্তবায়ন করার সম্ভাবনা কতটা?

এবারের এই নয় লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।

ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

বাজেট অনুযায়ী, মোট ঘাটতি অর্থায়নের মধ্যে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা আসবে বৈদেশিক উৎস থেকে।

এর মধ্যে এক লাখ নয় হাজার ৮৫০ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ এবং ছয় হাজার ১৫০ কোটি টাকা হলো অনুদান।

অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে হলো এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ও ব্যাংক-বহির্ভূত খাত থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা।

সবমিলিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে এই বাজেটের বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।

তবে বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়ের জবাবে অর্থমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শুধু নীতিমালা ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নের ওপরও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিনিয়োগ ও ব্যবসা সহজ করতে যেসব বিধিনিষেধ শিথিল করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন তদারকির জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। পাশাপাশি অভিযোগ গ্রহণ ও তাৎক্ষণিক প্রতিকার নিশ্চিত করতে বিশেষ ওয়েবসাইট চালুরও পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, "আমরা যদি ব্যবসা ক্ষেত্রে সরকার ঘোষিত বিনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ৮০ শতাংশও বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পর্যায়ে পৌঁছে যাবে।"