দশকের পর দশক ধরে সুরের জাদু ছড়িয়ে গেছেন আশা ভোঁসলে

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
- Author, রূপসা সেনগুপ্ত
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
ভারতীয় কিংবদন্তী সঙ্গীত শিল্পী আশা ভোঁসলের প্রয়াণ হয়েছে। রোববার মুম্বাইয়ের ব্রিজ ক্যান্ডি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।
শনিবার তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যাও ছিল। মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন তার মাল্টি অর্গান ফেলিওর হওয়ায় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। রোববার দুপুরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
হিন্দি, বাংলা, ভোজপুরিসহ ২০টিরও বেশি ভাষায় গান গেয়েছেন আশা ভোঁসলে। ভূষিত হয়েছেন দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, পদ্মবিভূষণ, বঙ্গ বিভূষণস-সহ একাধিক সম্মানে।
২০২২ সালে তার বোন আরেক কিংবদন্তী সংগীত শিল্পী লতা মঙ্গেশকারের মৃত্যু হয়।
আশা ভোঁসলের প্রয়াণের সঙ্গে ভারতীয় সঙ্গীত জগতের একটা অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীসহ রাজনীতি, সঙ্গীত ও চলচ্চিত্র জগতের ব্যক্তিত্বরা তার প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
সুরেলা সফর
গানের জগতের সঙ্গে আশা ভোঁসলের সখ্যতা ছেলেবেলা থেকে। বাবা দীননাথ মঙ্গেশকার একজন সঙ্গীতশিল্পী এবং নাট্যকার ছিলেন, দিদি লতা মঙ্গেশকারের অবদান ভারতীয় সঙ্গীত জগতে অপরিসীম। যে সময় আশা ভোঁসলে সঙ্গীত জগতে পদার্পণ করেন তখন তিনি নাবালিকা।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
প্রথম গান ছিল মারাঠিতে। তার আগেই অবশ্য তার দিদি লতা মঙ্গেশকার ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে সঙ্গীতশিল্পী হিসাবে পদার্পণ করেছেন।
ছেলেবেলায় বাবাকে হারানোর ফলে জীবন যুদ্ধের সঙ্গে তার পরিচয় শৈশবেই। পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে দিদি লতা মঙ্গেশকার সংসারের হাল ধরতে কাজ শুরু করেন, সঙ্গীতকেই বেছে নেন এই যুদ্ধে সঙ্গী হিসাবে।
সেই সময়ে সিনেমা জগতে প্রবেশ করা এবং নিজে পরিচিতি তৈরি করা সহজ ছিল না। ক্রমে আশা ভোঁসলেও দিদির পথে হাঁটেন। কিন্তু সেই পথও বন্ধুর ছিল।
সেই সময়ে গীতা দত্ত, শামশাদ বেগমের মতো সঙ্গীতশিল্পীরা ইতিমধ্যে হিন্দি ছায়াছবির জগতে রাজ করছেন। দিদি লতা মঙ্গেশকারও নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন।
প্রথমদিকে স্বল্প বাজেটের ছায়াছবিতে প্লেব্যাক করেন আশা ভোঁসলে। দিদি লতা মঙ্গেশকারের সঙ্গে তুলনাসহ নানা বিষয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু হার মানেননি তিনি।
তার অদম্য জেদ এবং মেধার উপর ভিত্তি করে যে সুরের সফর শুরু করেছিলেন তিনি, সেখানে ২০টিরও বেশি ভাষায় গান গেয়ে রেকর্ড গড়েছেন, সম্মান পেয়েছেন এবং বলিউড তো বটেই আপামর জনসাধারণের মনেও রাজ করেছেন।
দুই বোনের অনুরাগী সীমান্ত পেরিয়ে অন্যান্য দেশেও রয়েছে। ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে লতা মঙ্গেশকার এবং আশা ভোঁসলে ব্যাপক জনপ্রিয়।
বিমল রায়ের 'পরিণীতা' এবং রাজ কাপুরের 'বুট পলিশ' ছবির গান গাওয়ার সুযোগ তার ক্যারিয়ারে ক্যারিয়ারে 'সুরেলা মোমেন্টাম ' এনে দেয়। সুরকার ওপি নায়ারের সঙ্গে সাক্ষাৎ তার ক্যারিয়ারে এক অন্য অধ্যায় শুরু করে।
লতা মঙ্গেশকারকে ছাড়াই অনুরাগীদের 'সুপারহিট' গান উপহার দিতে চেয়েছিলেন মি. নায়ার।
গোড়ার দিকে তার প্রথম পছন্দ ছিলেন গীতা দত্ত, কিন্তু 'সিআইডি' ছবির পর তার গানে জায়গা তৈরি করে নেন আশা ভোঁসলে। 'নয়া দৌর'- সিনেমায় তারই সুরে মোহাম্মদ রফির সঙ্গে 'উড়ে জব জব জুলফে তেরি ', 'মাঙকে সাথে তেরা'-র মতো গান আশা ভোঁসলেকে অন্য পরিচিতি দেয়।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, AFP
এস. ডি. বর্মণ এবং লতা মঙ্গেশকরের মধ্যেকার 'দূরত্ব' তৈরি হওয়ার কারণে সে বছর সুরকার আশা ভোঁসলের জন্য সাফল্যের নতুন দরজা খুলে দেয়। পরের পাঁচ বছর এস. ডি. বর্মণ লতা মঙ্গেশকারে সঙ্গে কাজ করেননি। সেই সময় এসডি বর্মনের সঙ্গে আশা ভোঁসলের জুটি একের পর এক হিট উপহার দিয়েছিল সংগীত প্রেমীদের।
এস.ডি. বর্মণ, কিশোর কুমার, আশা ভোঁসলে এবং গীতিকার মজরুহ সুলতানপুরী রোম্যান্টিক এবং কৌতুকপূর্ণ গানের এক নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন। 'হাল কায়সা হ্যায় জানব কা', 'আঁখোঁ মে কেয়া জি,' 'ছোড় দো আঁচল'। 'দিওয়ানা মাস্তানা হুয়া দিল'-র মতো গান আজও স্মরণীয়।
তবে এস. ডি. বর্মণ আশার কণ্ঠকে কোন এক ঘরানার গানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। 'আচ্ছা জি ম্যায় হারি পিয়া'-র মতো চঞ্চল প্রেমের গান যেমন তিনি গাওয়ার সুযোগ দিয়েছেন তেমনই 'নজর লাগি রাজা'-র মতো ঠুমরি ধাঁচের গান গাওয়ারও সুযোগ দেন।
'সুজাতা' এবং 'লাজবন্তী'-র মতো ছবিতে গুরুগম্ভীর ও মর্মস্পর্শী গান গাইয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, আশা ভোঁসলে সব ধরনের গানেই সমান পারদর্শী।
বিভিন্ন ইন্টারভিউতে নিজের জীবনের এই সমস্ত চড়াই-উতরাইয়ের কথা অকপটে বলতে শোনা গিয়েছে আশা ভোঁলেকে।
এমনই এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তাকে বলা হয়েছিল তার কন্ঠস্বর ভজন এবং ধ্রুপদী সঙ্গীতের জন্য নয়। কিন্তু সেই ধারণাকেও 'ভুল' প্রমাণ করেন তিনি।
সুরকার খৈয়ামের 'উমরাও জান'-এ তার গাওয়া 'দিল চিজ কেয়া হ্যায়'-র মতো গান তাকে ভার্সাটাইল সংগীতশিল্পী হিসাবে পরিচিতি এনে দেয়।
পাশাপাশি 'পঞ্চম (আরডি বর্মণ) ও আশা ভোঁসলের' জুটি একের পর হিট গান উপহার দেয়।
নাসির হোসেনের ছবি 'তিসরি মঞ্জিল'-এর মাধ্যমে তাদের প্রথম পেশাদারী কাজ শুরু হয়। তাদের যুগলবন্দী এক সৃজনশীল ও রোম্যান্টিক জুটি তৈরি করে যা হিন্দি চলচ্চিত্র সঙ্গীতে এক নতুন ধারার জন্ম দেয় ।
'ও মেরে সোনা রে'-র রোমান্টিক মাধুর্য হোক বা 'ও হাসিনা জুলফোঁ ওয়ালি'-র চপল ছন্দ, আশা ভোঁসলের কন্ঠের জাদু সবাইকে মুগ্ধ করেছিল।

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images
ব্যক্তিগত জীবন
বিবিসির ইয়াসির উসমান তার প্রতিবেদনে এই সঙ্গীতশিল্পীর জীবনের নানান চড়াই-উতরাইয়ের কথা লিখেছেন।
তিনি জানিয়েছেন রাজু ভরতন, যিনি আশা ভোঁসলের জীবনী লিখেছেন, তার শুরুর দিনগুলো স্মরণ করতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, "শুরুতে আশা ভোঁসলের মধ্যে কোনো আকর্ষণ ছিল না। তিনি ছিলেন কেবলই একজন সংগ্রামী। আমি তাকে কাজের জন্য সংগ্রাম করতে দেখেছি। প্রযোজকরা যদি লতাকে না পেতেন, তাহলে তাদের পরবর্তী পছন্দ ছিলেন গীতা দত্ত বা শামশাদ বেগম।"
"সেই তালিকায় আশার নাম পর্যন্ত থাকত না। তাই, তিনি যা পেতেন তাই গাইতেন। তার সমস্যা ছিল তার মারাঠি-মিশ্রিত হিন্দি এবং উচ্চারণ। লতার মতো তিনি তার উর্দু উন্নত করার জন্য ততটা পরিশ্রম করেননি। এছাড়া, তার ব্যক্তিগত এবং বিবাহিত জীবনও ছিল উত্থান-পতন ও নানা সমস্যায় ঘেরা।"
তিনি জানিয়েছেন, সেই সময় চাপ ও অস্থিরতার আশা ভোঁসলের কর্মজীবনে তেমন অগ্রগতি হয়নি, অথচ লতা মঙ্গেশকার সাফল্যের শিখরে পৌঁছে গিয়েছিলেন।
কিশোরী অবস্থায় আশা ভোঁসলে গণপত রাও কে বিয়ে করেন। তার এই সিদ্ধান্ত দিদি লতা মঙ্গেশকারসহ পরিবারের অন্যান্যদের সঙ্গে সম্পর্কে প্রভাব ফেলে। দুই বোনের মধ্যে কথা বন্ধ ছিল। পরে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলায়। তবে আশা ভোঁসলের ব্যক্তিগত জীবন কিন্তু পার পরেও চড়াও উতরাইয়ের মধ্যে দিয়েই গিয়েছে।

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images
'মেরা কুছ সামান তুমহারে পাস পড়া হ্যায়'
কোনো কালেই নিজের শৈলী ভেঙে অন্য শৈলী নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে পিছপা হননি আশা ভোঁসলে। তার কন্ঠে দিল চিজ ক্যায় হায় যেমন সঙ্গীত প্রেমীদের মনে মোচড় দিয়েছে তেমনই ইজাজত ছবিতে 'মেরা কুছ সামান তুমহারে পাশ পরা হ্যায়' গান অনেক মানুষকে আবেগী করে তুলেছিল।
পপ হোক বা জ্যাজ- যে কোনও ঘরানার সঙ্গীতে তার সমান দক্ষতা ছিল। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এলভিস প্রেসলি এবং বিল হ্যালির প্রভাবের বিষয়ে উল্লেখ করেছেন তিনি।
তার ক্যারিয়ারের ব্যপ্তি সাত দশকেরও বেশি। এই সময়ে বলিউডে গানের ধরন বদলেছে, নায়িকা বদলেছে কিন্তু বদলায়নি তার কন্ঠস্বরের জাদু। এআর হরহমানের সঙ্গে তার জুটিতে 'রঙ্গিলা' থেকে শুরু করে 'লাগানের' একের পর এক জনপ্রিয় গান আছে।
এআর রহমান তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে লিখেছেন "তিনি তার কণ্ঠ ও আভা নিয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন... কী অসাধারণ একজন শিল্পী ছিলেন।"
তার মৃত্যুতে শোকাহত অভিনেত্রী হেমা মালিনী। তিনি সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, "আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না এটা সত্যি। এ এক অপরিমেয় ক্ষতি। আমি কথা বলার মতো পরিস্থিতিতে নেই।"
তার কথা মনে করতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন সঙ্গীতশিল্পী উষা উত্থুপ। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "ওর মতো ভার্সেটাইল গায়িকা খুব কমই হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে তিনি তার কণ্ঠের জাদুতে মাতিয়ে রেখেছেন… উদ্বুদ্ধ করেছেন।"
অনেকেরই মতো ছেলেবেলা থেকে আশা ভোঁসলের গান শুনে বড় হয়েছেন কলকাতার সুরকার ও গায়ক অনুপম রায়। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "আশা ভোঁসলের গান শুনে বড় হয়েছি। কিছু বুঝে ওঠার আগে থেকেই তার কণ্ঠ মনে জায়গা করে নিয়েছে।"
"ছেলেবেলায় দূর্গা পুজো মানেই ছিল প্যান্ডেলেও আশা ভোঁসলে এবং কিশোর কুমারের গান। তার গাওয়া রবীন্দ্র সঙ্গীতের ক্যাসেটও বাজত। এখনো সেই গানই প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে বাজে। তার মৃত্যুতে একটা স্বর্ণযুগের অবসান হলো।"
কথা বলতে বলতে স্মৃতিমেদুর হয়ে ওঠেন তিনি। মি রায় বলেছেন, "তার সঙ্গে বেশ কয়েকবার দেখা হওয়ার সুযোগ হয়েছে। সেই সমস্ত স্মৃতি মনে ভাসছে।"
হাসিখুশি স্বভাবের জন্য পরিচিত ছিলেন আশা ভোঁসলে। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ছিলেন প্রিয় 'আশা তাই' ।
শুধু সঙ্গীত নয়, রান্নাতেও পটু ছিলেন। তার সঙ্গে কাটানো মুহূর্তের কথা স্মরণ করে ঊষা উত্থুপ বলেছেন, "একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন তিনি। যতবার দেখে হয়েছে, শ্রদ্ধায়, কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গয়েছে। আমি মনে করি শিল্পীর মৃত্যু হয় না কিন্তু এটাও ঠিক যে দ্বিতীয় আশা ভোঁসলে জন্মাবে না।"








