বাংলাদেশে হামে মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা

- Author, তাফসীর বাবু
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
ছোট্ট একটা বিছানা। তাতে সাজিয়ে রাখা আছে ছোট্ট কোল বালিশ, কাঁথা। পাশে ঘিয়ে রঙয়ের ছোট এক ফ্রক হাতে নিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন শিরীন আক্তার। বিছানাটি তার নয় মাস বয়সী একমাত্র কন্যার। শিশুটি হামের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে কয়েকদিন আগে।
গত সোমবার রাজশাহী শহরে শিরীন আক্তার বাসায় গিয়ে দেখা যায় এই চিত্র।
"মেয়ের কথা ভুলতে পারি না। মনে হয় ও ফিরে আসবে। তাই সাজিয়ে রাখা আছে সব। আমার তো বিশ্বাস হয় না আমার পাখিটা মারা গেছে। সবসময় ওর চেহারাটা চোখে ভাসে," বলেন শিরীন আক্তার।
শিরীন আক্তারের শিশুকন্যা সপ্তাহ দুয়েক আগে জ্বরে আক্রান্ত হন। স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে কয়েকদিন চিকিৎসা নেওয়ার পর একটু সুস্থ হলে তাকে বাসায় আনা হয়।
এরপর হঠাৎ আবার অসুস্থতা শুরু হলে তাকে গত ১৯শে এপ্রিল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শেষদিকে শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিলতা দেখা দেয়। শরীরের কয়েক জায়গায় হামের মতো র্যাশ ওঠে। অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নিতে বলেন চিকিৎসকরা।
কিন্তু তখন শুরু হলো আরেক যুদ্ধ।
আইসিইউর অপেক্ষায় থেকে থেকে মেয়ের মৃত্যু দেখেছেন শিরীন আক্তার, কিন্তু আইসিইউ আর পাননি।
তিনি বলেন, "আইসিইউয়ের সিরিয়াল পেলাম ৩২ নম্বর। কতজনের হাত-পা ধরলাম, আমার মেয়েটাকে একটু আইসিইউতে দেন। কিন্তু কেউ শুনলো না। সবাই বলে উপায় নেই।"
শেষপর্যন্ত গত ২৫শে এপ্রিল মারা যায় শিরীন আক্তার শিশু কন্যা। এর দু'দিন পর হাসপাতাল থেকে ফোন আসে যে, আইসিইউ'র সিট ফাঁকা হয়েছে।
"তখন আমি সিট নিয়ে কী করবো? আমার যখন দরকার তখন তো পেলাম না," বলেন শিরীন আক্তার।
হামের লক্ষণ থাকা শিশু কন্যাকে নিয়ে রাজশাহীর শিরীন আক্তারের যে অবস্থা হয়েছে, বাংলাদেশে অনেকেই একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন। দেশটিতে প্রতিদিনই সন্দেহজন হামে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, মৃত্যুও বাড়ছে। অন্যদিকে সংকটাপন্ন শিশুদের জীবন বাঁচাতে আইসিইউর জন্য হাহাকার দেখা যাচ্ছে।
যদিও সরকার বলছে, হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির কারণে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই সংক্রমণ কমে আসবে।
কিন্তু সংক্রমণ কমলেও মৃত্যুর হার বাড়ার আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

সরেজমিন রাজশাহী: রোগীর ভিড়, আইসিইউ সংকট
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, গত ১৫ই মার্চ থেকে ৩০শে এপ্রিল পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত এবং সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু ঘটেছে ২৭৬ শিশুর।
আক্রান্তের সংখ্যা ৪২ হাজার ছাড়িয়েছে। প্রতিদিন হাজারেরও বেশি নতুন রোগী পাওয়া যাচ্ছে।
এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ও মৃত্যু ঢাকা বিভাগে।
তবে ঢাকার বাইরে আবার পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ রাজশাহী বিভাগে। বিভাগটিতে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ৭০টি। এর মধ্যে শুধু রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই মৃত্যুর ঘটনা ৫৩টি।
নতুন নতুন আক্রান্ত রোগীও ভর্তি হচ্ছেন প্রতিদিন। স্থান সংকুলান না হওয়ায় এক শয্যায় তিন থেকে চার জনকেও রাখা হচ্ছে।
সাদিয়া জাহান নামে একজন বলছিলেন, শয্যা না থাকায় গাদাগাদি অবস্থায় থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, "বেডে দেখেন, তিনটা বাচ্চাকে আমরা রাখছি। কারণ জায়গা নেই। আমার বাচ্চা নাকি দুইটা অক্সিজেন পাবে। কিন্তু এখন চলছে একটা। আরেকটি পাইনি। ওর ফুসফুসে ইনফেকশন। আমি তো মা। আমার তাহলে কী রকমটা লাগছে বলেন!"
রাজশাহী মেডিকেল ঘুরে দেখা যায় সেখানে হামের জন্য আলাদা ওয়ার্ড করা হয়েছে। বেডে গাদাগাদি করে শিশুদের রাখা হয়েছে। এমনকি জায়গা না পেয়ে মেঝেতেও অসুস্থ শিশুকে নিয়ে অবস্থান করছেন অনেকে।
এদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ আবার রাজশাহী জেলার বাইরের রোগী। কেউ এসেছেন কুষ্টিয়া, কেউ পাবনা, কেউ নাটোর, নওগাঁ থেকে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন আইসিইউর অপেক্ষায়। কিন্তু মিলছে না।
হাম ওয়ার্ডের একটি বেডে দেখা গেলো ছয় মাস বয়সী একটি শিশুর হাত-পা মালিশ করছেন মা রেহানা আক্তার।
অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় আইসিইউ রেফার করেছেন চিকিৎসক। সিরিয়াল ৩৪ নম্বরে। ফলে আদৌ সেই আইসিইউ পাবেন কি না তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রেহানা। এদিকে সন্তানের অবস্থা সংকটাপন্ন।
"এখন আল্লাহর হাতে সব ছেড়ে দিয়েছি," কাঁদতে কাঁদতে বলেন রেহেনা আক্তার।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস জানান, হাসপাতালটিতে আইসিইউ আছে আঠারোটি। কিন্তু রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি।
"আশেপাশের যে বিভাগগুলো রয়েছে, সেখানে যেসব জেলা বা অন্যান্য মেডিকেল আছে, সেখানে আইসিইউ সেবা অপ্রতুল। ফলে যারা এই সেবা প্রার্থী তারা এখানে চলে আসছেন," তিনি বলেন।
মি. বিশ্বাস জানান, যেসব শিশু মৃত্যু ঘটেছে, সেসবের ক্ষেত্রে মূল কারণ টিকা না নেওয়া এবং অপুষ্টি বড় কারণ।

মৃত্যু বাড়ার আশঙ্কা কেন?
হামে প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসা সেবার ঘাটতি থাকায় রোগীরা বড় শহরে আসছেন। এর চাপ পড়ছে ঢাকাতেও।
হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে হাম আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে। যদিও এর মধ্যেই সারাদেশে হামের টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে।
ইতোমধ্যেই টার্গেটের প্রায় ৬১ শতাংশ টিকা দেওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু এরপরও হামের সংক্রমণ কমছে না, মৃত্যুও থামছে না।
এর পেছনে অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
"যদি ভালোমতো রোগীদের ম্যানেজ করা যেত, ঠিকমতো আইসোলেশন করা যেত, তাহলে দুটো কাজ হতো। একটা হলো আমরা রোগীর সংখ্যা কমাতে পারতাম। আরেকটা হলো মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে পারতাম," বলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজীর আহমেদ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মনে করছে, রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির হার এখন স্থিতিশীল। কারণ টিকা দেওয়া হচ্ছে। তবে এরকম স্থিতিশীল থাকলেই যে সংক্রমণ কমতে শুরু করবে সেরকমটা মনে করছেন না ডা. বে-নজীর আহমেদ।
"টিকা দিয়ে প্রতিরোধে তো সময় লাগে। টিকা পেলে শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে সময় লাগে। এখানে পনের দিন বা এক মাস এরকমটা সময় লাগবে," বলেন তিনি।
বাংলাদেশে সবগুলো বিভাগে হাম ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে। কিন্তু এর বিপরীতে দেশটির স্বাস্থ্যসেবায় নানা দুর্বলতা স্পষ্ট হচ্ছে।
যার ফলে টিকা কার্যক্রম চললেও সামনের দিনগুলোতে, বিশেষ করে, মৃত্যু বাড়বে বলে সতর্ক করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ।
বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, সামনের দিনগুলোতে হামের সংক্রমণ কমলেও মৃত্যু বেড়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, "মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমরা আশা করি হামের সংক্রমণ কমে যাবে। কিন্তু মৃত্যু কমতে আমাদের আরো এক মাস সময় বেশি লাগবে। কারণ ইতোমধ্যেই যারা সংক্রমিত হয়ে যাবে, যাদের মধ্যে পুষ্টি কম বা আগে থেকে অন্যান্য রোগে ভুগছে, তারা গুরুতর পর্যায়ে চলে যাবে। ফলে এখন হয়তো মৃত্যু আমরা বাড়তির দিকে দেখবো।"

সরকার কী বলছে?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মহামারি বা জরুরি অবস্থা ঘোষণা হলে সরকারের সব বিভাগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে যাবে, কাজে গতি আসবে, এমনকি দ্রুত টিকা পেতেও ভূমিকা রাখবে।
তবে সরকার সেরকম কোনো ঘোষণার ইঙ্গিত দেয়নি।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বাড়তি রোগীর চাপ সামলাতে যেরকম সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা দরকার সেটা হয়নি। স্বাস্থ্য বিভাগ হিমশিম খাচ্ছে রোগীর চাহিদা সামাল দিতে। বিশেষ করে আইসিইউ সংকটের কথা সামনে আসছে।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অবশ্য বলছে, তারা নজর বেশি দিচ্ছেন সংক্রমণ কমানোর উপর।
"রোগীর সংখ্যা যদি বেড়ে যায় তাহলে তো একটা ক্রাইসিস হবে। এখানে কোনো সন্দেহ নেই। এটাকে হাইড করারও কিছু নেই। কিন্তু ব্যাপারটা আবার এমন না যে খারাপ অবস্থা নিয়ে যত রোগী আসবে সবাইকে আমি একটা করে আইসিইউ বেড দিয়ে দিতে পারবো। এজন্য আমাদের ব্যবস্থাপনার মূল উদ্দেশ্য যেটা থাকে সেটা হচ্ছে, হামের রোগীর সংখ্যা কমিয়ে ফেলা," বলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান।
সংক্রমণ কমাতে সরকার ইতোমধ্যেই সারাদেশে বিশেষ টিকা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বুধবার নাগাদ এক কোটি দশ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে এটা মোট টার্গেটের ৬১ শতাংশ।
সামনের দিনগুলোতে বাকি টার্গেট পূরণ হবে, "এটা হলে আশা করি আগাগী আট থেকে ১৫ই মে'র মধ্যে সংক্রমণ কমা শুরু করবে। তখন হাসপাতাল, আইসিইউর উপর চাপ কমে যাবে," বলেন অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান।








